প্রথম আলোর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক আসিফ নজরুল
প্রথম আলোর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক আসিফ নজরুল

বিশেষ সাক্ষাৎকার: অধ্যাপক আসিফ নজরুল

ড. ইউনূসকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে প্রধান উপদেষ্টা করার চেষ্টা হয়েছিল

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন সেনা সদর ও বঙ্গভবন, রাতে কার্জন হলে ছাত্রদের সঙ্গে এবং পরদিন ৬ আগস্ট বঙ্গভবনে বৈঠক, ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সরকারপ্রধান করা, উপদেষ্টাদের তালিকা তৈরিসহ সে সময়ের অনেক ঘটনার সাক্ষী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। সেসব দিনের ঘটনা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাজীব হাসান

প্রশ্ন

দেড় দশকের আওয়ামী লীগ শাসনামলে আপনি ছিলেন অন্যতম প্রধান দৃশ্যমান সমালোচকদের একজন। সেই অবস্থান থেকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আপনার যুক্ত হওয়াটা কীভাবে ঘটল?

আসিফ নজরুল: আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আমি পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখতাম, টক শোতে যেতাম, সভা-সেমিনারে যেতাম এবং রাজপথের আন্দোলনেও অংশ নিতাম। আর আমি যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্রদের সঙ্গে সব সময় একটা যোগাযোগ ছিল। ফলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আমি থাকব—এটাই স্বাভাবিক ছিল।

প্রশ্ন

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার সরকারের পতন সম্পর্কে কতটা আশাবাদী ছিলেন?

আসিফ নজরুল: ধীরে ধীরে আশাবাদী হয়েছি। এর আগে বহু আন্দোলন হয়েছে, একটা হতাশা চলে এসেছিল। সরকারের পতন হবেই—এটা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করি, যখন আর্মিরা বলল যে তারা জনগণের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবে না। ১৭ জুলাই আমরা শিক্ষকেরা শাহবাগ থানা থেকে দুজন ছাত্রকে ছাড়িয়ে আনি। এ দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের সমাবেশও হয়, ১৯ জুলাই শাহবাগে অভিভাবকদের সমাবেশ হয়। প্রতিদিনই কোনো না কোনো সমাবেশ বা মিছিলে থাকতাম। ২ আগস্টের দ্রোহযাত্রায় ছিল সর্বস্তরের মানুষ। এসব সমাবেশে এমন মানুষদের দেখতে পাই, যাঁরা আগে কখনো শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রাস্তায় নামেননি। আর জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে এসে মনে হলো, অনেকের মধ্যেই এই বোধ সঞ্চালিত হয়েছে, যত মানুষ মারা যাক, যা কিছু হোক, রাজপথ ছেড়ে যাওয়া সম্ভব না।

আরেকটা বিষয় খুব রিমার্কেবল লেগেছিল। আমি অতীতে অনেক আন্দোলনে ছিলাম। কিন্তু খুব ডিস্টিংক্টলি বলতে পারি, এই অভ্যুত্থানের শেষ দিকে এসে লক্ষ করলাম, আমার মধ্যে কোনো মৃত্যুভয় কাজ করছে না। অসংখ্য তরুণ মারা যাচ্ছে, ছোট ছোট বাচ্চারা মাকে চিঠি লিখে রাজপথে নেমে যাচ্ছে, একটা সাধারণ মেয়ে রিকশায় দাঁড়িয়ে স্লোগান দিচ্ছে। মনে হচ্ছিল, আমার ব্যক্তিগত মৃত্যু কোনো ঘটনাই না। সম্ভবত এ জন্য ৩ আগস্ট শহীদ মিনারের সমাবেশে বলেছিলাম, মৃত্যু পর্যন্ত আমি তোমাদের সঙ্গে থাকব।

তরুণ বয়সে মুক্তিযোদ্ধাদের গল্প শুনে খুব অদ্ভুত লাগত। মানুষ মরে যেতে পারে জেনেও কীভাবে যুদ্ধে যায়! এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বুঝেছি এই ফিলিংসটা কত সত্যি এবং এটা আমার নিজের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। এটা একটা বিস্ময়কর আবিষ্কার।

এরপর ৪ আগস্ট রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে আরেকজন এসে আকুলভাবে অনুরোধ করেন, আমি যেন রাতে বাসায় না থাকি। আমাকে আর বুয়েটের অধ্যাপক হাসিব চৌধুরীকে নাকি মেরে ফেলা হবে। আমার স্ত্রী শীলা খুবই ভয় পেয়ে যায়।
প্রশ্ন

শোনা যায়, জুলাইয়ের শেষ দিকে আপনাকে সতর্ক করা হয়েছিল।

আসিফ নজরুল: জি! হঠাৎ গভীর রাতে ফুলার রোড পাড়ার গেট থেকে বলা হলো, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক এসেছেন, আমার সঙ্গে কথা বলতে চান। আমি নামলাম। একপর্যায়ে কিছুটা আড়ালে গিয়ে উনি স্বীকার করলেন, উনি ব্র্যাকের শিক্ষক নন, সেনাবাহিনীর লোক। বললেন, স্যার, আমরা খবর পেয়েছি শেখ হাসিনার পক্ষে স্নাইপাররা নেমেছে, দূর থেকে লোকজনকে গুলি করছে। আর যেকোনো সময় আপনাদের যাঁরা নেতৃস্থানীয় আছেন, তাঁদের গ্রেপ্তার করা হতে পারে। ব্যাপারটা আমি খুব সিরিয়াসলি নিইনি, কিন্তু পরে সিনিয়র দু-একজনকে এটা জানালে তারা বলল, হ্যাঁ, খুব সম্ভবত আর্মি থেকেই কেউ এসেছিল।

এরপর ৪ আগস্ট রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে আরেকজন এসে আকুলভাবে অনুরোধ করেন, আমি যেন রাতে বাসায় না থাকি। আমাকে আর বুয়েটের অধ্যাপক হাসিব চৌধুরীকে নাকি মেরে ফেলা হবে। আমার স্ত্রী শীলা খুবই ভয় পেয়ে যায়। সে রাতে আমি ফুলার রোডেই অধ্যাপক মোস্তফা আল মামুনের বাসায় থাকি।

প্রশ্ন

জুলাইয়ের শেষ দিকে সতর্ক করার ঘটনা কত তারিখের? মনে পড়ে?

আসিফ নজরুল: না; কারণ, আমি খুব বেশি গুরুত্ব দিইনি তখন। কিছু লিখেও রাখতাম না। তবে যত দূর মনে পড়ে, ২৪/২৫ জুলাই হতে পারে।

দেশ ছেড়ে পালানোর আগে হেলিকপ্টার থেকে কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটিতে নামছেন শেখ হাসিনা। সঙ্গে তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা

৫ আগস্ট সরকার পতন

প্রশ্ন

সরকার পতনের দিন ৫ আগস্ট সেনা সদরে রাজনৈতিক দলগুলোর বৈঠকে আপনি ছিলেন একমাত্র নাগরিক প্রতিনিধি। দিনটা শুরু হয়েছিল কীভাবে?

আসিফ নজরুল: ঠিক ছিল ৫ আগস্টেও সমাবেশ হবে। আমরা জানি না সেদিনই সরকারের পতন হবে; তবে মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেছি, শেখ হাসিনা আর টিকতে পারবেন না। আমি রেডি হচ্ছি, তখন একটা ফোন এল। স্ক্রিন দেখে বোঝা যাচ্ছিল, আর্মির ফোন। সালাম দিয়ে বলল, স্যার, আপনাকে একটু আর্মি হেডকোয়ার্টারে আসতে হবে। তখন বোধ হয় বেলা একটার মতো বাজে।

টেলিভিশনে ঘোষণা হয়ে গেছে, আর্মি চিফ (জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, সেনাপ্রধান) বক্তৃতা দেবেন। আমার সন্দেহ লাগল। জিজ্ঞেস করলাম পলিটিশিয়ানরা থাকবেন? মির্জা ফখরুল ভাইয়ের (মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির মহাসচিব) নাম বলল। ফোন রেখে ফখরুল ভাইকে ফোন করলাম; উনি বললেন, আমি তো অন দ্য ওয়েতে আছি। আপনি আসেন, কোনো অসুবিধা নেই। রিজওয়ানা হাসানকে (সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, বেলার প্রধান নির্বাহী; পরে অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ উপদেষ্টা) ফোন দিলাম, বলল, আপনি অবশ্যই যাবেন।

ইতিমধ্যে শীলা জেনে গেছে, সে ভীষণ কান্নাকাটি শুরু করল, তোমাকে বোধ হয় মেরে ফেলবে! তাকে ফখরুল ভাইয়ের কথা বলে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। একটু পরে আর্মি একজন মেজরকে পাঠাল আমাকে নিতে। সে নাকি আমার ডিপার্টমেন্টে কয়েক মাস পড়েছিল। গেটের কাছে সে শীলাকে বলল, ম্যাডাম, আপনি আমার ছবি তুলে রাখেন, গাড়ির ছবি তুলে রাখেন, কোনো অসুবিধা নেই। তারপর আমরা যাত্রা শুরু করলাম। সেটা ছিল একটা অসম্ভব যাত্রা!

জিগাতলা পার হয়ে ধানমন্ডি ২৭ নম্বর মোড়ের কাছে হঠাৎ দেখি অসংখ্য মানুষ। হাতে উঁচিয়ে ধরা লাঠি, শোরগোল। আর্মির গাড়ি থামল; ওরা ভাবছিল ইউ-টার্ন নেবে কি না। আমি জিজ্ঞেস করলাম এরা আওয়ামী লীগের, নাকি আন্দোলনকারী? তারা বলল, স্যার, আওয়ামী লীগ পাবেন কোথায়? এরা সব আন্দোলনকারী।

গাড়ি থেকে নেমে হাত তুলে ‘আমি আসিফ নজরুল’ বলতে বলতে এগোচ্ছিলাম। আন্দোলনকারীরা উল্লাসে ফেটে পড়ল; হঠাৎ দেখলাম তারা আমাকে চ্যাংদোলা করে ঘাড়ে তুলে নিয়েছে। চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতলে প্লেয়াররা যেমন কোচকে মাথায় নিয়ে ছোড়াছুড়ি করে, আমি একেকজনের মাথার ওপর ঘুরছি।

তারপর তারা আমাকে ছেড়ে দিলে গাড়ি জোরে চলা শুরু করল। সামনে পুরো রাজপথ খালি। জায়গায় জায়গায় আর্মির ব্যারিকেড; রাস্তায় ইটের চিহ্ন, ছেঁড়া কাপড়, জুতা, ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন। কিন্তু কোনো মানুষ নেই।

তখন ডিবেট চলছে, সংসদ ভেঙে দেওয়া হবে কি, হবে না। আর্মি চিফ ওয়াকার সাহেব আমাকে বললেন, আসিফ সাহেব, আপনি বলেন। আপনি তো টিচার। আমি বললাম, অবশ্যই সংসদ ভেঙে দিতে হবে। এটা তো কোনো সংসদ না, ভুয়া নির্বাচনে গঠিত।
শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়লে সর্বস্তরের মানুষ গণভবন অভিমুখে যাত্রা করেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বেলা সাড়ে তিনটার দিকে রাজধানীর কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউয়ে
প্রশ্ন

সেনা সদরে ঢুকে কী দেখলেন?

আসিফ নজরুল: একটা বড় রুম। সভাপতিত্বের আসনে আর্মি চিফ, সঙ্গে সম্ভবত নেভি আর এয়ারফোর্স চিফও ছিলেন, দুই পাশে সারিতে আট-নয়জন করে নেতা। ফখরুল ভাইকে দেখলাম, মির্জা আব্বাস (বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য) ছিলেন। জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান এসে পরিচিত হলেন; সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদও ছিলেন। মামুনুল হক (বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব), ইসলামী আন্দোলনের ফয়জুল করীম (নায়েবে আমির) ছিলেন; কিছুক্ষণ পর জোনায়েদ সাকি (তখন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক, বর্তমানে প্রতিমন্ত্রী) এল। জাতীয় পার্টির জি এম কাদের ও আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ওই আলোচনায় বেশ ভোকাল ছিল।

তখন ডিবেট চলছে, সংসদ ভেঙে দেওয়া হবে কি, হবে না। আর্মি চিফ ওয়াকার সাহেব আমাকে বললেন, আসিফ সাহেব, আপনি বলেন। আপনি তো টিচার। আমি বললাম, অবশ্যই সংসদ ভেঙে দিতে হবে। এটা তো কোনো সংসদ না, ভুয়া নির্বাচনে গঠিত। আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বললেন, সংসদ ভেঙে দিলে সংকট হতে পারে। তখন বিএনপি আর জামায়াতের নেতারা খুব স্ট্রংলি বললেন, না, ভেঙে দিতে হবে।

একপর্যায়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম, শেখ হাসিনার কী অবস্থা? বলা হলো উনি পদত্যাগ করবেন, উনি আর থাকবেন না। এ রকম একটা অবস্থায় একজন বলল, আমি যেন জনগণকে একটু শান্ত হতে বলি। বেলা তিনটার দিকে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলাম, আপনারা শান্ত হন, আমাদের জন্য অনেক বড় একটা গুড নিউজ আসছে।

আমার সঙ্গে যখন কথা হলো, আমি বলেছি, ওয়াকার ভাই, আপনি এটা ক্লিয়ার করেন যে শেখ হাসিনা এখন আর নেই, সবাই যেন শান্ত হয়। এখন কী হবে, এটা ছাত্ররা, রাজনীতিবিদেরা বসে ঠিক করবে। আর উনি বক্তৃতায় যে বললেন, অন্তর্বর্তী সরকার আমরা গঠন করতে যাচ্ছি, এটা নিয়ে আমার সঙ্গে সরাসরি কথা হয়নি।
প্রশ্ন

শেখ হাসিনা যে দেশ ছেড়েছেন, সেটি কীভাবে নিশ্চিত হলেন?

আসিফ নজরুল: ওয়াকার ভাইয়ের পেছনের দেয়ালে টেলিভিশন চলছিল। হঠাৎ দেখি দেখাচ্ছে, শেখ হাসিনা বিমানে করে চলে যাচ্ছেন। গিয়েছিলেন হয়তো আগেই, কিন্তু দেখাচ্ছিল যখন, তখন বোধ হয় সাড়ে তিনটা হবে। আমি বললাম, শেখ হাসিনা তো চলে যাচ্ছেন! ওয়াকার ভাই একটু বিস্মিত হয়ে পেছনে ঘুরে টেলিভিশনের দিকে তাকালেন। বললেন, চলে গেছেন! উনি মেবি জানতেন যে হাসিনা চলে যাবেন। কিন্তু ঠিক তখনই যাবেন বা তাঁকে জানিয়ে যাবেন কি না, আমি জানি না।

প্রশ্ন

জাতির উদ্দেশে দেওয়া সেনাপ্রধানের বক্তব্য সম্পর্কে বৈঠকে কি আগেই জানতেন? সেনাপ্রধান বলেছিলেন, আমরা অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করতে যাচ্ছি।

আসিফ নজরুল: রাজনীতিবিদদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন, অফিসারদেরও ইনপুট ছিল। আমার সঙ্গে যখন কথা হলো, আমি বলেছি, ওয়াকার ভাই, আপনি এটা ক্লিয়ার করেন যে শেখ হাসিনা এখন আর নেই, সবাই যেন শান্ত হয়। এখন কী হবে, এটা ছাত্ররা, রাজনীতিবিদেরা বসে ঠিক করবে। আর উনি বক্তৃতায় যে বললেন, অন্তর্বর্তী সরকার আমরা গঠন করতে যাচ্ছি, এটা নিয়ে আমার সঙ্গে সরাসরি কথা হয়নি। ফ্র্যাংকলি বলি, ওখানে রাজনীতিবিদদের সংখ্যা ছিল প্রায় ২০ জন আর আমি একমাত্র সিভিল সোসাইটির সদস্য; আমার বেশি কথা বলতে অস্বস্তি লাগছিল।

আর ৫ আগস্টের ওই দুপুরে কয়েকজন রাজনীতিক আমাকে জিজ্ঞেস করছিলেন, এখন কনস্টিটিউশনালি কী হবে? আমি বলছিলাম, আপনারা সাংবিধানিকভাবে করতে চাইলে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের মধ্যে সমস্ত অনিশ্চয়তার উত্তর আছে।
প্রশ্ন

ওই মুহূর্তে ছাত্ররা তো বাইরে, আপনারা সেনা সদরের ভেতরে...

আসিফ নজরুল: এটা মাথায় এসেছিল। কিন্তু তখন সংসদ ভাঙার প্রশ্নটাই আমার কাছে জরুরি মনে হচ্ছিল, আর সংসদ ভাঙতে পারেন রাষ্ট্রপতি। আমি কনস্টিটিউশনাল ল পড়াই, আমি ওইভাবেই ভেবেছি। বঙ্গভবনের দিকে যাওয়ার পথে আর্মিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ছাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে কি না। বলা হলো, চেষ্টা চলছে।

আরেকটা কথা বলে রাখি, শুনতে হয়তো অদ্ভুত লাগবে। এই গণ–অভ্যুত্থানকালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কোনো কেন্দ্রীয় সমন্বয়কের সঙ্গে আমার সরাসরি যোগাযোগ ছিল না; যোগাযোগ থাকত শুধু নুর (নুরুল হক নুর, গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি, ডাকসুর সাবেক ভিপি, এখন প্রতিমন্ত্রী) আর আখতারের (আখতার হোসেন, তৎকালীন গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের নেতা, বর্তমানে এনসিপির সংসদ সদস্য) সঙ্গে। ওদের প্রথমেই গ্রেপ্তার করে ফেলা হয়। আর নাহিদের (নাহিদ ইসলাম, গণ-অভ্যুত্থানের নেতা, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা, এখন এনসিপির সংসদ সদস্য) সঙ্গে আমার একবারই দেখা হয়েছিল। রাতের বেলায় হাসপাতালে, ১৫ জুলাই হতে পারে। নাহিদ চলে যাচ্ছিল, আমি ওকে ডেকে সাবধানে থাকতে বললাম। আর বললাম, বাবা, ‘আমি রাজাকার, রাজাকার’ এই স্লোগানটাই শুধু দিয়ো না, মানুষ কনফিউজড হবে। জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা এখন কী করবে? বলল, স্যার, আমরা আবার আন্দোলনের ঘোষণা দেব, আমাদের থামার কোনো সুযোগ নেই। ওকে দেখে খুব মায়া লাগছিল।

আর ৫ আগস্টের ওই দুপুরে কয়েকজন রাজনীতিক আমাকে জিজ্ঞেস করছিলেন, এখন কনস্টিটিউশনালি কী হবে? আমি বলছিলাম, আপনারা সাংবিধানিকভাবে করতে চাইলে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের মধ্যে সমস্ত অনিশ্চয়তার উত্তর আছে।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের বিজয়ের উল্লাস। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ছিল জনতার নিয়ন্ত্রণে
প্রশ্ন

সেনা সদরে ৫ আগস্ট রাজনৈতিক দলগুলোর বৈঠকে সেনাপ্রধান আর কী কী বলেছিলেন?

আসিফ নজরুল: সেনাপ্রধান প্রথম মিটিংয়ের রুমটাতে স্থির ছিলেন না। তিনি কয়েকবার বের হয়েছেন, রাজনীতিবিদেরা কেউ কেউ তাঁর সঙ্গে বাইরে গেছেন। বাইরের রুমে অনেক সেনা অফিসারও ছিল। আমি অনেকটা সময় ধরে টিভিতে বা অনলাইনে মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখছিলাম। খুব ইচ্ছে হচ্ছিল রাস্তায় আনন্দ করা মানুষের কাছে ছুটে যাই। তবে আবহাওয়া দেখে টের পাচ্ছিলাম, সংসদ ভাঙার পর সরকার কীভাবে গঠিত হবে—এটা নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছিল।

বঙ্গভবনে গিয়ে দেখলাম, অ্যাজ ইফ দে আর ইনফর্মড, আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। সেনা সদরে যেখানে ২০ জনের মতো রাজনীতিবিদ ছিলেন, এখানে প্রায় ৪০ জন।

সেনা সদর থেকে বঙ্গভবন

প্রশ্ন

৫ আগস্ট সেনা সদর থেকে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা হলো কীভাবে?

আসিফ নজরুল: রাজনীতিবিদেরা মিলে ঠিক করলেন, বঙ্গভবনে যাবেন। কারণ, সংসদ ভাঙতে পারেন প্রেসিডেন্ট; ওনার সঙ্গে আলাপ করতে হবে। কথাটা বোধ হয় জাতীয় পার্টি বেশি বলেছে, আর্মিও চাচ্ছিল।

প্রশ্ন

যাত্রাপথে কী হলো?

আসিফ নজরুল: যাত্রাটা ছিল অবিস্মরণীয়। ক্যান্টনমেন্ট ঘিরে তখন লাখো মানুষ। সবাই চাইল আমি সামনের দিকের গাড়িতে বসি; একটু পরে জোনায়েদ সাকিও এসে উঠল। হাজার হাজার লোক, গাড়ি যাবে কীভাবে? আমি কিছু বলার পর রাস্তাটা একটুখানি ছেড়ে দিল। যেন একটা পিঁপড়া যেতে পারে, ও রকম একটা পথ। গাড়ির কাচ নামিয়ে মাথা বের করে দুই হাত জোড় করে বারবার বলছিলাম, প্লিজ, রাস্তা ছাড়েন। কেউ আমার মাথা টেনে বুকের মধ্যে নিয়ে নিল, কেউ গালে হাত ছোঁয়ার চেষ্টা করল, কেউ চুলে হাত বুলাল। একজন হঠাৎ নিজের শার্টে টান দিয়ে সবগুলো বোতাম ছিঁড়ে ফেলে খুশিতে চিৎকার করে উঠল। অভাবিত দৃশ্য!

ওই যাত্রাপথে একটা বিষয় টের পেলাম। সাকিকে কে কে যেন ফোন করল। সরকারে কারা থাকবে, সেই আলাপ। আমি বললাম, সাকি, আমরা তো এখানে অথরিটি না; ছাত্রদের সঙ্গে সবাই মিলে আলোচনা করে ঠিক করবে। সাকি আমার সঙ্গে একমত হলো। কিন্তু বুঝলাম, তখনই, ওই যাত্রাপথে যারা সরকারে যাওয়ার প্রত্যাশী বা চিন্তা করছে, তারা অলরেডি কমিউনিকেশন শুরু করে দিয়েছে।

প্রথম আলোর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক আসিফ নজরুল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডের বাসভবনে। ২৩ জুলাই ২০২৬
প্রশ্ন

বঙ্গভবনে গিয়ে কী দেখলেন?

আসিফ নজরুল: বঙ্গভবনে গিয়ে দেখলাম, অ্যাজ ইফ দে আর ইনফর্মড, আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। সেনা সদরে যেখানে ২০ জনের মতো রাজনীতিবিদ ছিলেন, এখানে প্রায় ৪০ জন। মান্না ভাইসহ (মাহমুদুর রহমান মান্না, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি) গণতন্ত্র মঞ্চের সব নেতা, বিএনপি-জামায়াতের আরও কিছু নেতা; হাসনাত কাইয়ূম ভাই (হাসনাত কাইয়ূম, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি), হাসান আল মামুন (গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক), আরও অনেকে! নাগরিক প্রতিনিধি খুঁজলাম, আমি ছাড়া কেউ ছিল না সেখানেও।

তারপর চুপ্পু সাহেব (সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন) এলেন। উনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর আমি ফেসবুকে লিখেছিলাম, শেখ হাসিনার উপ-প্রেস সচিবকে জন্মদিনের বার্তা পাঠায়, এ রকম একটা লোক বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট। জবাবে উনি এক ভাষণে বলেছিলেন, আসিফ নজরুল নামে নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো এক শিক্ষক আছে, সে আমার সম্পর্কে যা তা কথা বলে; আমি এগুলোর পাত্তা দিই না। সেই উনি আমার কাছে এসে হাত মেলালেন, আরেক হাত দিয়ে আমার বাহু ধরে বললেন, এখনো মনে আছে, ‘আসিফ সাহেব, আপনিই তো ভরসা। কেমন আছেন ভাই?’ উনি বেশ নার্ভাস ছিলেন।

আলোচনায় ফখরুল ভাই যখন খালেদা জিয়ার মুক্তির কথা বললেন, প্রেসিডেন্ট বোধ হয় বলছিলেন, ঠিক আছে, ব্যবস্থা করা হবে। আমার বলার পালা এলে আমি বললাম, ব্যবস্থা করা হবে মানে কী? আজকেই ওনাকে মুক্তি দিতে হবে, এখনই! আর বললাম, অবশ্যই সংসদ ভেঙে দিতে হবে, রাজবন্দীদের মুক্তি দিতে হবে। সরকার গঠনের প্রসঙ্গে বললাম, যা সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক, ছাত্রদের কথা অনুযায়ী যেন করা হয়। ছাত্ররাই এই আন্দোলনের নেতৃত্বে।

একটাই ডিসেন্টিং ভয়েস মনে আছে। শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার যুক্তিতে জি এম কাদের সাহেব মার্শাল ল অথবা জরুরি অবস্থা জারির কথা তুলেছিলেন। তখন সবাই প্রচণ্ড প্রতিবাদ করেছিল; আমিও বলেছিলাম, কোনো অবস্থাতেই না।

প্রশ্ন

ওই বৈঠক থেকে সিদ্ধান্ত কী কী এল?

আসিফ নজরুল: রাজবন্দীদের মুক্তি দেওয়া হবে; খালেদা জিয়াকে এখনই মুক্তি দেওয়া হবে; সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা হবে; রাজনৈতিক দলের মতামতের ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হবে; সংসদ ভেঙে দেওয়া হবে; দ্রুত শান্তিশৃঙ্খলা ফেরানো হবে। আর সবাই একমত হলো, যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক, ছাত্রদের মতামতের ভিত্তিতে নেওয়া হবে।

অন্তর্বর্তী একটা সরকার হবে, এই আলোচনা হয়েছে; কে প্রধান হবেন, তা উচ্চারিত হয়নি। আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হলো ছাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ করার। সাকি আমাকে বলল, কোনো চিন্তা করবেন না, ওরা সবাই আমার খুব ক্লোজ, আমি ব্যবস্থা করে দেব, আমরা দুজন মিলে যাব।

মিটিং শেষে আমি ওয়াকার ভাইকে আলাদা করে বললাম, আখতার আমার ছাত্র, খুব সাধারণ ঘরের ছেলে; ওর ওয়াইফ এসে আমার বাসায় কান্নাকাটি করে। আপনি ওকে আজকে রাতেই জেল থেকে ছাড়ার ব্যবস্থা করবেন। উনি কথা দিয়েছিলেন এবং আখতারকে ওই রাতেই ছেড়েছে।

বিজয়ের আনন্দে সংসদ ভবনে জড়ো হওয়া হাজারো মানুষ। সংসদ ভবন, ঢাকা, ৫ আগস্ট ২০২৪
প্রশ্ন

ওই বৈঠকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক পরিচয়ে কারা এসেছিলেন—এ নিয়ে একটা আলোচিত ঘটনা আছে।

আসিফ নজরুল: হ্যাঁ, খুব বিখ্যাত ঘটনা। মিটিং প্রায় এক ঘণ্টা চলার পর হঠাৎ তিনজন ঢুকল; দুটো ছেলে, একটা মেয়ে। টেবিলের অগ্রভাগে সাড়া পড়ে গেল ‘সমন্বয়ক আসছে, সমন্বয়ক আসছে’! রাজনীতিবিদেরা দাঁড়িয়ে গেলেন, আর্মি অফিসাররা দাঁড়িয়ে গেলেন, সবাই তাদের তোয়াজ করছিল। আমি খুব অবাক, এরা কারা! পরে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলার আগে হাসনাত কাইয়ূম ভাই দৌড়ে এসে বললেন, আসিফ, আপনি কিন্তু এদের সমন্বয়ক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেবেন না। এখানে অনেক ঘটনা আছে। আমি বললাম, ঠিক আছে; আমি তো ওদের চিনিই না। সংবাদ সম্মেলনে আমি বলেছিলাম, নাহিদ, আসিফ, সারজিস (জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের নেতা নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া, সারজিস আলম) ওরা যা বলবে, সে অনুসারেই সরকার গঠন করা হবে। ওদের মতামত সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। ওদের সঙ্গে আমরা যোগাযোগের চেষ্টা করছি।

স্যার বিভিন্ন সময় বলতেন, ওনার জীবনের একমাত্র ব্লান্ডার হচ্ছে পলিটিকসে যাওয়া। সেগুলো মনে রেখে আমি যখন বললাম স্যার রাজি হবেন না, আসিফ সঙ্গে সঙ্গে হেসে দিল। বলল, রাজি হবেন স্যার, আমাদের সঙ্গে কথা হয়েছে, মোটামুটি কনফার্ম। আমি চিৎকার করে উঠলাম, বলো কী তোমরা! ওয়ান্ডারফুল!

৫ আগস্ট রাত: কার্জন হল

প্রশ্ন

সেই ৫ আগস্ট রাতেই তো কার্জন হলে ছাত্রদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছিল।

আসিফ নজরুল: হ্যাঁ, অনেক কষ্ট করে। নাহিদের পক্ষ থেকে যে ছেলেটা আগে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল, তাকে ফোন করা হলো। কিছুক্ষণ পর জানাল, আসিফ স্যার, নাহিদ ভাই বলেছেন, তাঁরা শুধু আপনার সঙ্গে কথা বলবেন, আর কারও সঙ্গে না। পাশে সাকি দাঁড়ানো; আমি বললাম, সাকি, কিছু মনে করবেন না। সাকি বলল, না না, কোনো অসুবিধা নাই, আপনি যান। গাড়িবহর নিয়ে গেলাম সমকাল-চ্যানেল ২৪-এর অফিসে। আর্মি অফিসাররা জিজ্ঞেস করলেন—স্যার, আমরা থাকব, না চলে যাব? আমি বললাম—আপনারা চলে যান; আমার কোনো বিপদ হবে না। ওনারা চলে গেলেন, সাকিও গেল—আমি একা।

ছাত্ররা আমাকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নিয়ে গেল। কোথায় যাচ্ছি বলবে না; মনে হলো কমিউনিস্ট পার্টির লোকজন যেমন গুপ্ত জায়গায় থাকে, ও রকম ব্যাপার! তখন রাত একটা বেজে গেছে, আমি প্রচণ্ড টায়ার্ড। শেষে কার্জন হলের একটা বিল্ডিংয়ের তিন বা চারতলার রুমে বসলাম। রুমে ঢুকল নাহিদ, আসিফ, সারজিস, মাহফুজ (মাহফুজ আলম, গণ–অভ্যুত্থানের নেতা, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা), নাসীর (নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, গণ–অভ্যুত্থানের নেতা, বর্তমানে এনসিপির নেতা)। বিধ্বস্ত কণ্ঠে বললাম, বাবা, তোমরা যা করলে, জাতি তোমাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে।

তখন সরকার গঠনের প্রসঙ্গটা তারা তুলল। নাহিদ বলল, এক্স্যাক্ট যেমন মনে আছে, স্যার, আমাদের যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হবে, এই সরকারের প্রধান কে হবেন? আমি সালেহউদ্দিন আহমেদ স্যার আর ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ স্যারের (যথাক্রমে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ—দুজনেই পরে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা) কথা বললাম। তখন নাহিদ বলল, স্যার, ইউনূস স্যার হলে কেমন হয়?

আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, উনি তো রাজি হবেন না। ইউনূস স্যার এর আগে আদালতে ছোটাছুটি করতেন, আমি স্যারের সঙ্গে থাকতাম। স্যার বিভিন্ন সময় বলতেন, ওনার জীবনের একমাত্র ব্লান্ডার হচ্ছে পলিটিকসে যাওয়া। সেগুলো মনে রেখে আমি যখন বললাম স্যার রাজি হবেন না, আসিফ সঙ্গে সঙ্গে হেসে দিল। বলল, রাজি হবেন স্যার, আমাদের সঙ্গে কথা হয়েছে, মোটামুটি কনফার্ম। আমি চিৎকার করে উঠলাম, বলো কী তোমরা! ওয়ান্ডারফুল! এটা হলে তো এর চেয়ে ভালো আর কিছুই হতে পারে না!

নাহিদ হঠাৎ বলল, স্যার, আমরা কেউ থাকব না সরকারে? আমি বললাম, অবশ্যই, থাকতে চাইলে থাকবে না কেন? দশজনের সরকার হলে অন্তত একজন। আসিফ হেসে বলল, মাত্র টেন পার্সেন্ট! আমি বললাম, তাহলে দুজন থাকো। কেউ একজন চারজনের কথা বলল। বললাম, আমি তো ঠিক করার কেউ না; তোমরা রাজনীতিবিদদের সঙ্গে কথা বোলো।

তারপর বললাম, তোমাদের সঙ্গে আর্মি কথা বলতে চায়। ওরা প্রথমে বলল, স্যার, ওনাদের সঙ্গে কী কথা বলব? আমি বললাম, ওনারা তোমাদের অভ্যুত্থানে সমর্থন দিয়েছেন; বসে দেখো কী বলেন; পছন্দ না হলে এক্সেপ্ট কোরো না। ওরা রুমের বাইরে গিয়ে কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে জানাল, দেখা করবে, বঙ্গভবনে যাওয়ার জন্য পরদিনের একটা সময় দিল। রাত দেড়টার দিকে বাসায় ফিরলাম, যে স্ত্রী আমাকে কেঁদেকেটে বিদায় দিয়েছিল, তার সঙ্গে দেখা হলো অবশেষে।

উনি দুটো আপত্তির কথা বললেন। এক. ইউনূস স্যার অলরেডি শ্রম আইনের মামলায় কনভিক্টেড। দুই. ওনার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ আছে। আমি বোঝালাম, দেখেন, আমি আইনের শিক্ষক। আপনার প্রতি রাগ হলে আপনাকেও রুলিং পার্টি কোনো মামলায় কনভিক্টেড করিয়ে ফেলতে পারবে। বাংলাদেশে এটা করা সম্ভব।

৬ আগস্ট: ড. ইউনূস প্রশ্নে টানাপোড়েন

প্রশ্ন

৬ আগস্ট সকালে সেনাপ্রধানের সঙ্গে আপনার আলাদা একটা বৈঠকের কথা জানা যায়।

আসিফ নজরুল: সেনা সদরেই, সকালবেলা। তাদের ডাকে গিয়েছিলাম। ওয়াকার ভাই ছাত্রদের ভূমিকার প্রশংসা করলেন, সংস্কারের পক্ষে জোরালোভাবে বললেন। তারপর একদম ফ্র্যাংকলি বললেন, এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান কে হবে, এটা নিয়ে কথা বলতে চান। আমি জানালাম, ছাত্রদের সিদ্ধান্ত ইউনূস স্যার হবেন; আমি মনে করি এটাই বেস্ট চয়েস।

উনি দুটো আপত্তির কথা বললেন। এক. ইউনূস স্যার অলরেডি শ্রম আইনের মামলায় কনভিক্টেড। দুই. ওনার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ আছে। আমি বোঝালাম, দেখেন, আমি আইনের শিক্ষক। আপনার প্রতি রাগ হলে আপনাকেও রুলিং পার্টি কোনো মামলায় কনভিক্টেড করিয়ে ফেলতে পারবে। বাংলাদেশে এটা করা সম্ভব। এগুলো আওয়ামী লীগ সরকারের প্রোপাগান্ডা। ড. ইউনূস ন্যাশনালি-ইন্টারন্যাশনালি প্রচণ্ড রেসপেক্টেড মানুষ; ওনার কোনো বিকল্প নেই।

উনি বেশ কিছুক্ষণ কথা বললেন। আমি ওনাকে কিছু বর্ণনা দিলাম। ক্লিনটনের (সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট) সঙ্গে স্যারের সম্পর্ক, জো বাইডেনের (সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট) সঙ্গে সম্পর্ক, স্পেনের রানি ওনাকে দেখে কীভাবে দৌড়ে আসেন, জাতিসংঘ কীভাবে ট্রিট করে। এগুলো তো আমার নিজের চোখে দেখা। উনি মন দিয়ে শুনলেন। তারপর একটু হেসে বললেন, আমাকে কী করতে বলেন? আমি বললাম, গিভ হিম আ কল। উনি বললেন, আমি ওনাকে ফোন দেব? আমি বললাম, কেন দেবেন না? উনি আপনার বাবার সমান বয়সী, একজন নোবেল লরিয়েট। তারপর উনি ওনার দুই বন্ধু এয়ারফোর্স চিফ আর নেভি চিফকে রুমে ডাকলেন। ওনারা দুজনেই বললেন, হ্যাঁ, দাও, সমস্যা কী? তখন উনি বললেন যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. ইউনূস হচ্ছেন। আমার মনে হয়েছিল, ওয়াকার ভাই তখন কনভিন্সড।

কিন্তু আমার ধারণা, এরপর সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের বৈঠকের আগের মাঝখানের সময়টায় ওয়াকার ভাইকে কেউ প্রেশারাইজ করেছে, বা ওনার কাছে অন্য কোনো ইনফরমেশন এসেছে। কারণ, বঙ্গভবনের বৈঠকে অন্য রকম একটা ঘটনা ঘটে।

৬ আগস্ট রাতের মিটিংয়ে ছাত্ররা যে ১০-১৫ জনের একটা প্রাথমিক তালিকা দিচ্ছে, এটাই আমি জানতাম না। এই তালিকা তৈরিতে আমার সঙ্গে কোনো কথা হয়নি। তবে আমি পরে যতটা জেনেছি, ছাত্ররা প্রথমে চেয়েছিল রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় সরকার করতে।
প্রশ্ন

৬ আগস্ট সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের সেই বৈঠকে ছাত্ররা সরাসরি ছিল।

আসিফ নজরুল: মিটিং শুরুর আগে আমরা বসলাম বঙ্গভবনের একটা অভ্যর্থনাকক্ষে। সেখানে সবাই ছিল। নাহিদ, আসিফ, মাহফুজ, নাসীর, হাসনাত (হাসনাত আবদুল্লাহ; জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের নেতা, বর্তমানে এনসিপির সংসদ সদস্য), সারজিস, বাকের(আবু বাকের মজুমদার, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের নেতা), নুসরাত (নুসরাত তাবাসসুম, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের নেতা, জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে এনসিপির সংসদ সদস্য); অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক) এবং আমি। রাষ্ট্রপতি ও তিন বাহিনীর প্রধান এলে হঠাৎ ওয়াকার ভাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আসিফ সাহেব, আপনার সঙ্গে তো কথা হয়েছে; আমরা একটু ছাত্রদের সঙ্গে বসি। ইট কেম অ্যাজ আ সারপ্রাইজ। বোঝা যাচ্ছে, ওনাদের আলাদা বৈঠক করার পরিকল্পনা আছে। ছাত্রদের আমি আগেই সকালের মিটিংয়ের কথা জানিয়েছিলাম। বলেছিলাম, তোমরা কিন্তু ইউনূস স্যার ছাড়া কারও ব্যাপারে রাজি হবে না। তারা আমার চেয়েও বেশি স্ট্রং এই পজিশনে। তারা বলেছিল, স্যার, এটা নিয়ে আপনি কোনো চিন্তা করবেন না।

নাহিদরা মিটিং করতে বের হয়ে গেল। আমরা, অন্যরা বসে আছি তো বসেই আছি অনন্তকাল। মনে হচ্ছিল চার-পাঁচ ঘণ্টা। মিটিং শেষ হলে নাহিদ, আসিফরা এল। আমি বললাম, নাহিদ, তোমরা কি এটা করতে পেরেছ? বলল, জি স্যার, কোনো চিন্তা করবেন না, ইউনূস স্যারই হবেন। আমি ওদের জড়িয়ে ধরলাম। এত খুশি লাগছিল! পরে আমি যে বর্ণনা শুনলাম, পুরো মিটিংয়ের মূল পারপাসই ছিল ইউনূস স্যার বাদে অন্য কাউকে সরকারপ্রধান হিসেবে নেওয়ার। এমনকি ছাত্রদেরও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তোমরা কেউ দায়িত্ব নাও। ওরা অনড় ছিল। শেষে ওয়াকার ভাই নাকি বলেছেন, আচ্ছা ঠিক আছে, আপনারা যেটা ভালো বোঝেন, সেটাই করেন।

পরে রাষ্ট্রপতিসহ ১০-১৫ মিনিটের একটা আনুষ্ঠানিক পর্ব ছিল। ওনারা স্বীকার করলেন যে ওনারা ইউনূস স্যার ছাড়া অন্য কারও কথা বুঝিয়েছেন, কিন্তু ছাত্ররা অনড় ছিল এবং এখন মোটামুটি সবাই একমত, ইউনূস স্যারই হবেন। ওনাদের চেহারা দেখে মনে হলো, রিলাকট্যান্টলি হলেও এটা মেনে নিয়েছেন।

উপদেষ্টাদের তালিকা ও শপথ

প্রশ্ন

উপদেষ্টাদের তালিকা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়াটা বলুন। আপনি তো এর ভেতরেই ছিলেন।

আসিফ নজরুল: ৬ আগস্ট রাতের মিটিংয়ে ছাত্ররা যে ১০-১৫ জনের একটা প্রাথমিক তালিকা দিচ্ছে, এটাই আমি জানতাম না। এই তালিকা তৈরিতে আমার সঙ্গে কোনো কথা হয়নি। তবে আমি পরে যতটা জেনেছি, ছাত্ররা প্রথমে চেয়েছিল রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় সরকার করতে। বিএনপি এতে রাজি না হওয়ায় অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়ে সরকার গঠনের চিন্তাটা আসে। এমন ব্যক্তিদের নিয়ে প্রথম তালিকা খুব সম্ভবত বিএনপি আর জামায়াতের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করা হয়।

প্রশ্ন

উপদেষ্টাদের তালিকা নিয়ে আপনার সঙ্গে কখন আলোচনা হয়?

আসিফ নজরুল: ৭ আগস্ট রাত ১০টার দিকে নাহিদরা ফুলার রোডে আমার বাসায় এল। আসিফ-নাহিদ ছিল, মাহফুজ, নাসীর আর সারজিসও ছিল, হাসনাতও হয়তো। তারা বলল, স্যার, উপদেষ্টামণ্ডলীতে কারা কারা থাকতে পারেন? আমি রিজওয়ানার কথা বললাম; বলল, স্যার, এটা অলরেডি আমাদের তালিকায় আছে। সালেহউদ্দিন আহমেদ স্যারের নাম বললাম; বলল, এটাও আছে। বোঝা গেল, ওরা অলরেডি একটা তালিকা তৈরি করে ফেলেছে। আর্মির পক্ষ থেকে আমাকে একটাই নাম কমিউনিকেট করা হয়েছিল। লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাহফুজুর রহমানকে যেন বিবেচনা করা হয়। আমি ছাত্রদের বলেছিলাম; তারা হ্যাঁ বা না কিছু বলেনি।

আমার কথায় বোধ হয় একজনকেই নিয়েছিল তারা। ওরা জিজ্ঞেস করল, স্যার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাকে বানানো যায়? আমি তৌহিদ ভাইয়ের (মো. তৌহিদ হোসেন, সাবেক পররাষ্ট্রসচিব; পরে অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা) নাম বললাম। ওনাকে আমি চিনতামও না। শুধু লেখা পড়তাম, খুব প্রাজ্ঞ মনে হতো। ওরা সঙ্গে সঙ্গে পাশের রুমে গিয়ে কাকে কাকে যেন ফোন করল। এসে বলল, তৌহিদ ভাই ঠিক আছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে কাকে দেওয়া যায়, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে কাকে দেওয়া যায়—এগুলোও জিজ্ঞেস করেছিল।

আমি পরে শুনেছি, তারা বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী ঐক্যজোট, গণতন্ত্র মঞ্চ—এদের সঙ্গে কথা বলে তালিকা ফাইনাল করেছে। সম্ভবত মাহমুদুর রহমানের (সম্পাদক, আমার দেশ) মতো দু-একজন আস্থাভাজন ব্যক্তির সঙ্গেও বিভিন্ন সময়ে কথা বলেছে। তালিকা ফাইনাল করার ব্যাপারে ড. ইউনূস স্যারের গ্রিন সিগন্যালও ছিল। তবে ফাইনাল তালিকার কারও কারও বিষয়ে আমি আগে জানতাম না। ৮ আগস্ট তারিখে শপথ নিতে গিয়ে দু–একজনকে দেখে বরং একটু অবাক হয়েছি।

প্রশ্ন

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস উপদেষ্টাদের তালিকায় নিজে কোনো নাম যুক্ত করেছেন?

আসিফ নজরুল: সেটা আমি জানি না। তবে ৭ আগস্ট রাতে বা ৮ আগস্ট সকালে ইউনূস স্যার আমাকে কয়েকজন নারীর নাম পাঠান। আমি মতামত জানিয়েছিলাম; উনি ওনার বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিছুদিন পরে যখন আরও চারজন নতুন উপদেষ্টাকে যুক্ত করা হয়, স্যার আমাদের কয়েকজনের সঙ্গে আলোচনা করে সেটা ঠিক করেন। তিনি আরও একজনকে (বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ) নিতে চেয়েছিলেন। আমাকে বললেন ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলতে। ছাত্ররা আপত্তি করায় নেননি।

ফ্রান্স থেকে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কেরা তাঁর পাশে ছিলেন। ৮ আগস্ট ২০২৪
প্রশ্ন

৮ আগস্ট সকালে আপনি অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন। সেখানে কি আর কোনো আলোচনা হয়েছিল উপদেষ্টা পরিষদ নিয়ে?

আসিফ নজরুল: বিমানবন্দরে ভিভিআইপি টার্মিনালের ওপর তলায় গিয়ে দেখি বিভিন্ন বাহিনীর লোকজন, গ্রামীণের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনেকে। আর ছাত্রদের নিচে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। আমি রেগে গেলাম, তাদের ওপরে নিয়ে এলাম। নাহিদ, আসিফ আর উমামা(উমামা ফাতেমা, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের নেতা)। এমন জায়গায় দাঁড় করালাম যাতে স্যার লাউঞ্জে ঢুকেই তাদের দেখেন। স্যার তাদের বুকে জড়িয়ে ধরলেন, আমাকেও। নিচে গিয়ে একটা রুমে স্যার নাহিদ, আর্মি চিফ এবং আরও দু-একজনকে নিয়ে ঢোকেন। একটু পর স্যার আমাকে ডেকে জানতে চাইলেন, কীভাবে সরকার গঠন করা যায়, সংবিধানে সমস্যা হবে কি না। আমি বললাম, আমরা যদি চাই, সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের অধীনে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত নিয়ে এই সরকার গঠনের সুযোগ আছে। স্যার এটাই করার নির্দেশ দিলেন।

বিমানবন্দরে স্যার নাহিদদের সঙ্গে কথা বলেন। সম্ভবত সেখানে উপদেষ্টাদের চূড়ান্ত তালিকায় স্যারের সম্মতি নেওয়া হয়। পরে স্যার আরেকটা রুমে এসে সমবেত আরও অনেক ছাত্রনেতা, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। স্যারের চারপাশে ফ্যাসিস্ট শাসককে তাড়ানো অকুতোভয় ছাত্রনেতারা। খুব ভালো লাগছিল এই দৃশ্যটা তখন। বিমানবন্দরেই জেনেছি সন্ধ্যার দিকে নতুন সরকারের শপথ হতে পারে।

বিমানবন্দর থেকে ফেরার পথে জানলাম, ইউনূস স্যার আমাকে খুঁজছেন। গুলশানে স্যারের বাসায় মিনিট তিরিশের একটা মিটিং হয়; স্যার পোর্টফোলিওর ব্যাপারে একটা কাগজ দিয়ে আমার মতামত চাইলেন। ওনাকে খুব ক্লান্ত লাগছিল। ওনার সঙ্গে এর আগেরবার দেখা হয়েছিল আদালতে, আসামির জন্য বানানো লোহার খাঁচার ভেতর। আর আজ কিছুক্ষণ পর তিনি দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন! আমার খুব ইমোশনাল লাগল ওনার দিকে তাকিয়ে। কোনো দিন আমি ভাবিনি এমন হতে পারে কখনো!

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শপথ গ্রহণ। ৮ আগস্ট ২০২৪

অন্তর্বর্তী সরকার কেমন ছিল, সামনে কী

প্রশ্ন

আপনি ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারে ছিলেন। ভেতর থেকে দেখা, এই সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য কী, ব্যর্থতা কী?

আসিফ নজরুল: বহু বছর পর মানুষ ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে, তাদের সত্যিকারের প্রতিনিধিরা সংসদ ও সরকার গঠন করেছে—এটা বড় সাফল্য। কিছু সংস্কার হয়েছে; জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত আর আহতদের জন্য কিছু করা গেছে; গুম-খুনের বিচার অবশেষে হচ্ছে; আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা এসেছে, জুলাই জাদুঘর ও ডকুমেন্টারির মাধ্যমে ফ্যাসিজমবিরোধী শক্ত বয়ান তৈরি হয়েছে। প্রধানত ইউনূস স্যারের কারণে গণ–অভ্যুত্থানবিরোধী আন্তর্জাতিক প্রচারণা বন্ধ করা গেছে। আর ব্যর্থতাও রয়েছে। মব নিয়ন্ত্রণ, মামলায় ভুয়া আসামি রাখার সংস্কৃতি, প্রথম আলো-ডেইলি স্টার–এ আক্রমণ—এগুলো আমরা অ্যাড্রেস করতে পারিনি। ৩২ নম্বর ভাঙা রোধেও আমাদের ব্যর্থতা ছিল। হামের টিকা নিয়ে আমাদের এরর অব জাজমেন্ট প্রচণ্ড পীড়াদায়ক, যদিও এই সংকট মূলত আওয়ামী লীগ আমলে তৈরি হয়েছিল।

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে শপথবাক্য পাঠ করছেন (বাঁ থেকে) আদিলুর রহমান খান, নূর জাহান বেগম, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, আ ফ ম খালিদ হাসান, তৌহিদ হোসেন, ফরিদা আখতার, শারমিন মুরশিদ, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, নাহিদ ইসলাম, অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, এ এফ হাসান আরিফ ও সালেহউদ্দিন আহমেদ। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট
প্রশ্ন

যে ছাত্রনেতৃত্ব অভ্যুত্থানের মুখ ছিল, তাদের রাজনৈতিক দল এনসিপিকে আজ কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

আসিফ নজরুল: তারা খারাপ করছে না। সংসদে নাহিদ, আখতার আর হাসনাত খুব ভালো ভূমিকা রাখছে। তাদের দল তৃতীয় ধারার রাজনীতি গড়ে তুলতে চেষ্টা করছে, একটা আশাবাদ তৈরি করতে পেরেছে। দেখা যাক।

প্রশ্ন

দুই বছর পর সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা কতটা ঠিকানা পেল? আর অভ্যুত্থানের কৃতিত্ব নিয়েও বিভিন্নমুখী আলাপ চলছে। আপনার মূল্যায়ন কী?

আসিফ নজরুল: প্রথম আকাঙ্ক্ষা ছিল হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন, সেটা হয়েছে। ভোটাধিকার এসেছে, গুম বন্ধ হয়েছে, গায়েবি মামলা ও নির্যাতন বন্ধ হয়েছে। ছাত্রদের জন্য পীড়াদায়ক কোটাব্যবস্থা আর বিশ্ববিদ্যালয়ে গণরুমে টর্চার বন্ধ হয়েছে; শ্রমিকদের জন্য ভালো শ্রম আইন হয়েছে। তবে এসব অর্জনকে স্থায়ী করতে হবে এবং প্রান্তিক মানুষের জন্য আরও পদক্ষেপ নিতে হবে। গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষের বাঁধভাঙা প্রত্যাশা থাকে; তা পুরোটা পূরণ হয় না, মানুষ খুব ধৈর্যশীলও থাকতে পারে না। এটা সব জায়গায় হয়।

আর অভ্যুত্থানের বা কোনো কৃতিত্বের মালিকানা নিয়ে কাড়াকাড়ি আমাদের মজ্জাগত অভ্যাস। শেখ হাসিনা তাঁর শাসনামলে এটা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করে দিয়ে গেছেন। আমরা বোধ হয় তার প্রভাব থেকে পুরোপুরি বের হতে পারিনি।

প্রশ্ন

সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

আসিফ নজরুল: আপনাকেও ধন্যবাদ।