ত্রয়োদশ সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান
ত্রয়োদশ সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান

ফিরে দেখা: সংসদ ১ থেকে ১২

ওয়াকআউট, ধূমপান, বুড়ো আঙুলে ঘটনাবহুল সেই সব দিন

যাত্রা শুরু হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের, বাদ–প্রতিবাদ আর বিরোধী দলের ওয়াকআউটে প্রথম অধিবেশনেই ছড়াল উত্তাপ, তা নিয়ে আলোচনা থেমে নেই। কিন্তু এমন পরিস্থিতি কি এবারই প্রথম? ইতিহাসে ফিরে তাকালে দেখা যাবে, এমন ঘটনা ঘটেছে আগেও। গণপরিষদ থেকে গত ১২টি সংসদের অধিবেশনের প্রথম দিনের অনেকটি ছিল ঘটনাবহুল।

দ্বাদশ থেকে ত্রয়োদশ, মাঝে বিরতি ছিল ২ বছর ৬ দিন। অস্বাভাবিক এই বিরতির মধ্যে রয়েছে রক্ত ঝরানো জুলাই গণ–অভ্যুত্থান, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, রাজনৈতিক-সামাজিক অস্থিরতা-টানাপোড়েনসহ নানা কিছু। সব পেরিয়ে নির্বাচনের পর গতকাল বৃহস্পতিবার শুরু হয় সংসদ অধিবেশন।

পেছনের ১২টি জাতীয় সংসদের দিকে তাকালে বলা যায়, সেসব সংসদের যাত্রাকালও কম ঘটনাবহুল ছিল না। প্রথম দিন ঘিরে সরকারি ও বিরোধী দলের বিতর্ক, বাগ্‌বিতণ্ডা-হট্টগোল, ওয়াকআউট যেমন ছিল, তেমনি ছিল সংসদ অধিবেশন বর্জন, শপথ না দিয়ে নির্বাচিত সদস্যদের অধিবেশন কক্ষে (হাউস) দাঁড়িয়ে থাকা, কক্ষে প্রবেশ না করে বাইরে ‘উন্মুক্ত অধিবেশন’ তৈরি করার মতো ঘটনা। ‘বুড়ো আঙুল’ দেখানো হয়েছে অভিযোগ তুলে ওয়াকআউটও হয়েছে। অধিবেশন কক্ষে বসে ধূমপানের ঘটনাও ঘটেছে গণপরিষদে। একটি উদ্বোধনী অধিবেশন সাংবাদিকেরাও বর্জন করেছিলেন।

১৯৭২ সালের গণপরিষদ ছিল স্বাধীন দেশের সংবিধান প্রণয়নের পরিষদ। তারপর সংবিধানের আলোকে ১৯৭৩ সালে যাত্রা শুরু করে আইনসভা বা সংসদ। বিগত ১২টি সংসদের মধ্যে ৬টি সংসদ ৫ বছর মেয়াদ পূরণ করতে পেরেছিল, ৬টি সংসদ পারেনি। দেখে নেওয়া যাক, কেমন ছিল সেই সব সংসদের উদ্বোধনী দিন। এই অনুসন্ধানে সহায়ক হয়েছে সংগ্রামের নোটবুক ওয়েবসাইটের সংবাদপত্রের মহাফেজখানা।

গণপরিষদ: লুঙ্গি পরে এসেছিলেন খাজা আহমদ

গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন নিয়ে ১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রতিবেদন

স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌম গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল। ওই সভার স্পিকার ছিলেন শাহ আবদুল হামিদ, ডেপুটি স্পিকার ছিলেন মোহাম্মদ উল্লাহ। গণপরিষদ নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। উদ্বোধনী অধিবেশনের মেয়াদ ছিল মাত্র ২ দিন। ১৯৭২ সালের ১৫ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি গণপরিষদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন।

গণপরিষদের উদ্বোধন অধিবেশন নিয়ে পরের দিনের দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয় একাধিক প্রতিবেদন। ‘টুকিটাকি’ শিরোনামের একটি খবরে ছিল, ১৭০ আসন বিশিষ্ট সাবেক পূর্ব পাকিস্তান পরিষদে (বতর্মানে তেজগাঁওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়) ৪৭০ জন সদস্যের বসার ব্যবস্থা করা হয়। মাইক ছিল মাত্র ১৫০টি। এর মধ্যে বেশির ভাগই যান্ত্রিক গোলযোগের জন্য কাজ করছিল না। স্পিকারের হাতে হাতুড়ি ছিল না। ‘আপনারা বসুন’, ‘শুনুন’ বলে তিনি শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করছিলেন।

পাকিস্তান পরিষদে স্যুট–টাই পরে পোশাকের জৌলুশ দেখাতেন আইনসভা বা জাতীয় পরিষদের সদস্যরা। সে চিত্র ছিল না স্বাধীন বাংলাদেশের গণপরিষদে। নোয়াখালীর (বর্তমান ফেনী) সদস্য খাজা আহমদ লুঙ্গি-শার্ট পরে অধিবেশনে যোগ দিয়েছিলেন। নিষিদ্ধ থাকলেও সেদিন পরিষদ কক্ষে এক সদস্য ধূমপানও করছিলেন।

দুই ঘণ্টা স্থায়ী এই অধিবেশনে স্বাধীনতা সংগ্রামে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা ও বীর জনতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে প্রস্তাব পাস করা হয়। অধিবেশনে গণপরিষদ নেতা হিসেবে ভাষণ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

এ এস এম সামছুল আরেফিনের ‘বাংলাদেশের নির্বাচন ১৯৭০-২০০৮’ নামের বইটিতে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, সংবিধান প্রণয়নের জন্য বাংলাদেশ গণপরিষদের সভা বসে ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল। এর আগে ২৩ মার্চ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ নামে একটি আদেশ জারি করেন, যাতে বলা হয় স্বাধীনতাপূর্ব ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ থেকে যে সব জনপ্রতিনিধি পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ এবং পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে বিজয়ী হয়েছিলেন, তাঁদের নিয়ে গঠিত হবে গণপরিষদ।

১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় দিবসে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান। তার আগের দিন বিলুপ্ত হয় গণপরিষদ।

২০২২ সালে আসিফ নজরুল ‘সংবিধান বিতর্ক ১৯৭২: গণপরিষদের রাষ্ট্রভাবনা’ শিরোনামে তাঁর বইয়ে লিখেছেন, স্বাধীনতার প্রস্তাব সামান্য সংশোধিত আকারে গণপরিষদে সেদিনই গৃহীত হয়। সংশোধনীর বিষয়টি ছিল স্বাধীনতাযুদ্ধে কোন কোন পেশাজীবী শ্রেণির নাম কীভাবে উল্লেখ করা হবে, সে সম্পর্কে। চারটি আদর্শ বা স্তম্ভ ( জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা) নিয়ে সেদিন গণপরিষদে কোনো মতবিরোধ হয়নি। সেখানে উল্লেখ করা আদর্শগুলোই বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি এবং পরে সংবিধানের মূলনীতি হিসেবেও গ্রহণ করা হয়।

প্রথম সংসদ: টিকেছিল আড়াই বছর

প্রথম সংসদের প্রথম অধিবেশন নিয়ে ১৯৭৩ সালের ৮ এপ্রিল দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রতিবেদন

১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম সাধারণ নির্বাচন হয়। তার এক মাস পর ৭ এপ্রিল প্রথম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে। উদ্বোধনী অধিবেশন ছিল ৭ কার্যদিবসের। ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি সংসদের বিলুপ্তি ঘোষণা দেন। এই সংসদ ২ বছর ৬ মাস স্থায়ী ছিল। এর তিন মাস আগে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবার নিহত হন বঙ্গবন্ধু।

প্রথম সংসদের উদ্বোধনী দিনে স্পিকার নির্বাচিত হন মোহাম্মদ উল্লাহ। ডেপুটি স্পিকার ছিলেন মোহাম্মদ বায়তুল্লাহ। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে অভিনন্দন জানিয়ে ভাষণ দেন সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান।

সংবিধানের প্রথম চারটি সংশোধনী আনা হয় বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলে এবং দেশের প্রথম জাতীয় সংসদে। ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধী, গণহত্যাজনিত অপরাধসহ অন্যান্য গণবিরোধীদের বিচারের জন্য সংবিধানের প্রথম সংশোধনীটি সংসদে গৃহীত হয় ১৯৭৩ সালের ১৪ জুলাই।

দ্বিতীয় সংসদ: বৈধতার প্রশ্নে বাগ্‌বিতণ্ডা

দ্বিতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন নিয়ে ১৯৭৯ সালের ৩ এপ্রিল দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রতিবেদন

১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। চার বছর বিরতির পর ১৯৭৯ সালের ২ এপ্রিল বসে দ্বিতীয় সংসদ। ৬ দিনের প্রথম অধিবেশনে মোট কার্যদিবস ছিল ৫টি।

১৯৭৯ সালের ৩ এপ্রিল দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রধান শিরোনাম ছিল ‘বৈধতার প্রশ্ন উত্থাপন ও বাক-বিতন্ডার মধ্য দিয়া দ্বিতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু’। ওই সময়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট (উপ–রাষ্ট্রপতি) আবদুস সাত্তারকে সংসদের প্রথম অধিবেশনের জন্য অস্থায়ী স্পিকার হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছিল। তিনি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শপথ পাঠ করান।

তবে তাঁকে ‘অনির্বাচিত ও এপয়েন্টেড (নিযুক্ত)’ স্পিকার উল্লেখ করে বিরোধী দলের ৫৩ জন শপথ বর্জন করেন। ৫৩ জনের মধ্যে ৩৮ জন ছিলেন আওয়ামী লীগের (মালেক) ও ২ জন আওয়ামী লীগ (মিজান) থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধি। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের ৮ জন, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) একজন, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একজন, জাতীয় একতা পার্টির একজন ও একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন শপথ না নেওয়ার দলে। এ ছাড়া ওই সময়ের মুসলিম লীগ দলীয় সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীও শপথ নেননি।

আবদুস সাত্তারের পরিচালনায় অধিবেশনে স্পিকার হিসেবে বিএনপির মির্জা গোলাম হাফিজ ও ডেপুটি স্পিকার হিসেবে সুলতান আহমদ চৌধুরী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

নতুন স্পিকার অধিবেশন পরিচালনা শুরু করলে বিরোধী দলের সদস্যরা নিজ নিজ আসনে দাঁড়িয়ে থাকেন। আওয়ামী লীগের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা মুজিব কোট ও শেখ মুজিবের প্রতিকৃতি–সংবলিত ব্যাজ পরেছিলেন। বিরোধীদলীয় নেতা আসাদুজ্জামান খান তাঁদের শপথ গ্রহণ করানোর জন্য স্পিকারের প্রতি আহ্বান জানান। ওই সময় বিএনপির সংসদ সদস্যরা তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, যাঁরা শপথ নেননি, তাঁরা হাউসে (অধিবেশন কক্ষ) ঢুকতে পারেন না।

এ নিয়ে তুমুল হট্টগোল শুরু হয়। আবদুস সাত্তারের কাছে শপথ নেওয়া জাতীয় লীগের আতাউর রহমান খান বলেন, কার্যপ্রণালি বিধি অনুসারে, স্পিকার এখন বাকি সদস্যদের শপথ করাতে পারেন। কিন্তু সংসদ নেতা (প্রধানমন্ত্রী) শাহ আজিজুর রহমান বলেন, যাঁরা শপথ নেননি, তাঁরা এখানে (অধিবেশন কক্ষে) ‘অনুপ্রবেশকারী’। তুমুল হট্টগোলের একপর্যায়ে স্পিকার ৫৩ সদস্যদের হাউস থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। অধিবেশন মুলতবি করে শপথ না নেওয়া ৫৩ জন সদস্যকে স্পিকার শপথ পাঠ করান।

মুলতবির পর অধিবেশনে বিরোধীদলীয় নেতা আসাদুজ্জামান খান ‘জাতির জনক’ হিসেবে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি হাউসে পুনর্বহালের প্রস্তাব করে বলেন, সংবিধানে জাতির জনক হিসেবে এখনো স্বীকৃতি আছে। কিন্তু জাতির জনকের প্রতিকৃতির জায়গায় যা স্থাপন (জাতীয় প্রতীক শাপলা) করা হয়েছে, তা আপত্তিকর। তখন সরকারি দলের অনেক সদস্য এর প্রতিবাদ করেন। তবে স্পিকার আশ্বাস দেন, পরদিন এই প্রস্তাবের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।

ওই অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ভাষণ দেন জিয়াউর রহমান। তাঁর ভাষণে তিনি মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, ‘আমি স্মরণ করি, সেই সব মহান ব্যক্তিত্বকে, যাঁরা বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ করেছেন এ দেশের মানুষকে। তাঁদের মধ্যে আমি উল্লেখ করব মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমানের নাম।’

১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান ব্যর্থ এক সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সংসদের বিলুপ্তি ঘোষণা করেন। এই সংসদ প্রায় ৩ বছর স্থায়ী ছিল।

তৃতীয় সংসদ: ছিল না বিএনপি

তৃতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন নিয়ে ১৯৮৬ সালের ১১ জুলাই দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রতিবেদন

১৯৮৬ সালের ৭ মে তৃতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে অংশ নেওয়া না–নেওয়া নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ছিল অস্থিরতা। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে তখন মাঠে আন্দোলন করছিল আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন দল। এরশাদের অধীনে নির্বাচনে না আসার সিদ্ধান্ত ছিল দলগুলোর। তবে শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও জামায়াত নির্বাচনে অংশ নেয়। বিএনপি নির্বাচন বর্জন করেছিল।

তৃতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হয় ১৯৮৬ সালের ১০ জুলাই। সংসদে ১৫৩ আসন নিয়ে এরশাদের জাতীয় পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। ৭৬ আসন নিয়ে বিরোধী দলে আওয়ামী লীগ। বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন শেখ হাসিনা। অধিবেশন শুরু হলে বিরোধী দলের আসনে আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে জাসদের ৪ জন সদস্য ও চারজন স্বতন্ত্র সদস্যের একজন উপস্থিত ছিলেন। অধিবেশন চলার সময় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সিঁড়িতে বসে ‘উন্মুক্ত সংসদ’ পরিচালনা করে আওয়ামী লীগসহ ৮ দল। নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ করে তাঁরা জানান, সামরিক শাসন প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা সংসদের বাইরে থাকবেন।

ওই নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি। ওই দিন বিএনপিসহ সাত দল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) সামনে সমাবেশ করে। সমাবেশে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ৮ দলকে ‘অবৈধ’ সংসদে যোগ না দিয়ে জনগণের কাতারে নেমে আসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, জনগণের সঙ্গে বেঈমানি করে শহীদ ছাত্র-শ্রমিকের রক্তের অবমাননা করে ১৫ দলের ৮ দল নির্বাচনে গেছে এবং তারা ৪ বছরের সামরিক শাসনের অবৈধ কার্যকলাপ বৈধ করার জন্য সংসদে যাচ্ছে।

জামায়াতে ইসলাম ওই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। তবে জামায়াতের ১০ জন সংসদ সদস্য অধিবেশনে যোগ দেননি, তাঁরা বাংলামোটরে দলীয় মিছিলে যোগ দেন।

তৃতীয় সংসদ ১৭ মাস স্থায়ী ছিল।

চতুর্থ সংসদ: সাংবাদিকদের বর্জন

চতুর্থ সংসদের প্রথম অধিবেশন নিয়ে ১৯৮৮ সালের ২৬ এপ্রিল দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত প্রতিবেদন

১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ চতুর্থ সংসদ নির্বাচন হয়। এরশাদ সরকারের আমল তা ছিল একতরফা নির্বাচন। আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল এই নির্বাচনে অংশ নেয়নি। সংসদে জাতীয় পার্টির ছিল ২৫১ আসন। ‘সম্মিলিত বিরোধী দল’ ব্যানারে আ স ম আবদুর রব নেতৃত্বাধীন জোট পায় ১৯টি আসন।

চতুর্থ সংসদের অধিবেশন শুরু হয় ১৯৮৮ সালের ২৫ এপ্রিল। ওই দিন বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াতসহ বিরোধী দল ও জোট হরতাল ডেকেছিল। সংসদ নেতা ছিলেন প্রধানমন্ত্রী মওদুদ আহমেদ। ওই সময় উপপ্রধানমন্ত্রীর একটি পদও ছিল। এই পদে ছিলেন কাজী জাফর আহমদ। তৃতীয় সংসদের মতো এ সংসদেও শামুসল হুদা চৌধুরী ছিলেন স্পিকার। বিরোধী দলের নেতা ছিলেন আ স ম আবদুর রব।

এই সংসেদর উদ্বোধনী অধিবেশন বর্জন করেন সাংবাদিকেরা। সংবাদপত্র শিল্পের তিনটি ফেডারেশন ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের দাবি অনুযায়ী ২৪ এপ্রিলের মধ্যে বাংলার বাণীসহ সব বন্ধ পত্রিকার ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করায় সাংবাদিকেরা অধিবেশনে যোগ দেননি। সংবাদ প্রকাশ করা হয় বিএসএস, তথ্য বিবরণী ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বরাতে। এ ছাড়া সংবাদপত্র কার্যালয়গুলোয় সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টার প্রতীকী কর্মবিরতি পালন করা হয়। সংবাদপত্র শিল্পের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে জাসদের শাজাহান সিরাজসহ ৮ জন সংসদ সদস্য এক মিনিটের জন্য অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন।

চতুর্থ সংসদ ২ বছর ৭ মাস স্থায়ী ছিল। নব্বইয়ের গণ–অভ্যুত্থানের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পদত্যাগ করার আগে সংসদ বিলুপ্তির ঘোষণা দেন।

পঞ্চম সংসদ: খালেদা–হাসিনার দ্বৈরথ

পঞ্চম সংসদের প্রথম অধিবেশন নিয়ে ১৯৯১ সালের ৬ এপ্রিল দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রতিবেদন

নির্দলীয় সরকারের অধীন নির্বাচনের পর ১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদ অধিবেশন শুরু হয় ৫ এপ্রিল। ১৪০ আসনে জয়ী হয়ে জামায়াতের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি।

দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত খবরে দেখা গেছে, সংসদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সরকারি (বিএনপি) ও বিরোধী দলের (আওয়ামী লীগ) মধ্যে তিন ঘণ্টার সমঝোতা প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ঐতিহ্য ভেঙে বিভক্তি ভোটের মাধ্যমে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়। ১৮৭ ভোটে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন বিএনপির আবদুর রহমান বিশ্বাস ও শেখ আবদুর রাজ্জাক আলী। ওই দুই পদে আওয়ামী লীগের দুই প্রার্থী সালাহউদ্দিন ইউসুফ ও আসাদুজ্জামান পান ৯৭ ভোট।

বিএনপির প্রার্থীদের সমর্থন দিয়েছিলেন জামায়াত, ৩ জন স্বতন্ত্র সদস্য, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন, এনডিপির সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জাসদের শাজাহান সিরাজ। আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের সমর্থন করে ৮–দলীয় জোটের অন্য শরিকেরা। তবে ৮ দলের শরিক হলেও গণতান্ত্রিক পার্টির সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। জাতীয় পার্টির সদস্যরাও ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকেন।

এই সংসদে প্রথমবারের মতো সংসদ নেতা ও বিরোধী দলের নেতার আসনে বসেন দুই নারী। খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার দ্বৈরথ শুরু হওয়ার পর তা বিদেশি সংবাদপত্রে ‘ব্যাটলিং বেগমস’ হিসেবে পরিচিত পায়। সেবারই প্রথম সংসদে বিতর্ক টেলিভিশনে দেখার সুযোগ পান দেশের মানুষ।

ষষ্ঠ ও সপ্তম সংসদ: ‘বুড়ো আঙুল’ নিয়ে বিতর্ক

সপ্তম সংসদের প্রথম অধিবেশন নিয়ে ১৯৯৬ সালের ১৬ জুলাই দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রতিবেদন

১৯৯৬ সালে দুটো জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ওই বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি এক তরফা নির্বাচনের পর বিরোধী দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। তার মধ্যই ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ বসে, যার মেয়াদ ছিল মাত্র ১১ দিন।

ওই সংসদে সংবিধান সংশোধন করে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা যুক্ত করার পর ১২ জুন নতুন করে নির্বাচন হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন সেই নির্বাচনের পর ১৯৯৬ সালের ১৪ জুলাই সপ্তম জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসে। এই অধিবেশনে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী স্পিকার এবং মো. আবদুল হামিদ ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। সংসদ নেতা ছিলেন শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন খালেদা জিয়া।

উদ্বোধনী অধিবেশন নিয়ে ভোরের কাগজে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, নতুন স্পিকারকে অভিনন্দন জানানোর উদ্দেশ্যে দেওয়া বক্তৃতার সুযোগে সংসদ নেতা (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) ও বিরোধী দলের নেতার (খালেদা জিয়া) বিতর্ক ও রাষ্ট্রপতির ভাষণের মধ্য দিয়ে প্রথম অধিবেশন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

অধিবেশনের শুরুতে বিদায়ী শেখ রাজ্জাক আলী সপ্তম সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের কাজ শুরু করতে চান। কিন্তু বিএনপির সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এ পর্যায়ে স্পিকারকে বাধা দেন। তাঁরা মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপনের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান। কিন্তু শেখ রাজ্জাক আলী বলেন, তিনি মূলতবি প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারেন না। তাঁর কাজ কেবল স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকবার বিতর্ক চলে। একপর্যায়ে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া তাঁদের অধিকার ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে বলে ওয়াকআউট করেন।

বিরতির পর অধিবেশন শুরু হলে বিরোধী দল সংসদ কক্ষে ফিরে আসে। বক্তব্যের সময় সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে বেশ কয়েকবার উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। জাসদ সভাপতি ও নৌ পরিবহনমন্ত্রী আ স ম আবদুর রবের বক্তব্যের একপর্যায়ে আপত্তি জানিয়ে বিরোধীদলীয় হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বাধা দেন এবং রবের বিরুদ্ধে ২টি মামলা রয়েছে বলে জানান। এ সময় দুজনের মধ্যে কিছুটা বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। সে সময় বিরোধী দলের অপর হুইপ আমানউল্লাহ আমান স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে অভিযোগ করেন, আবদুর রব তাঁদের দিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছেন। বিরোধী দলের উপনেতাসহ বিএনপির সংসদ সদস্যরা সব দাঁড়িয়ে চিৎকার করে, টেবিল চাপড়ে, টেবিলে ফাইল আছড়িয়ে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে থাকেন।

তবে আবদুর রব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি বুড়ো আঙুল দেখাননি। তিনি তাঁরই এক সময়ের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা জয়নুল আবদিনের কথার পরিপ্রেক্ষিতে দুই হাতের সাত আঙুল দেখিয়ে বোঝাচ্ছিলেন যে তাঁর বিরুদ্ধে বিএনপি ৭টি মামলা দিয়েছিল। এ ব্যাপারে খোঁজখবর করে তিনি পরদিন সংসদকে তাঁর সিদ্ধান্ত জানানোর আশ্বাস দিলে বিএনপির সংসদ সদস্যরা শান্ত হন।

আবদুর রবের ছবিসহ একটি আলাদা প্রতিবেদন প্রকাশ করে ভোরের কাগজ। ছবিতে দেখা যায়, তিনি বুড়ো আঙুল নয়, এক হাতের ৫ আর আরেক হাতের ২ আঙুল তুলে দেখাচ্ছেন।

অষ্টম সংসদ: প্রথম দিনই অনুপস্থিত বিরোধী দল

অষ্টম সংসদের প্রথম অধিবেশন নিয়ে ২০০১ সালের ২৯ অক্টোবর প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন

২০০১ সালের ২৮ অক্টোবর অষ্টম সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। ক্ষমতার পালাবদলে বিএনপি–জামায়াতের চার–দলীয় জোট সরকার গঠন করে। উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ যোগ দেয়নি ছিল। তবে অন্যান্য দলের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি ছিল।

প্রথম অধিবেশনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় স্পিকার পদে মুহাম্মদ জমিরউদ্দিন সরকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে আখতার হামিদ সিদ্দিকী নির্বাচিত হন। বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে কোনো ধরনের বিতর্ক ছাড়াই শেষ হয় অধিবেশনটি।

অষ্টম সংসদের পুরোটা সময় আওয়ামী লীগ রাজপথে আন্দোলনে ছিল। সরকারের মেয়াদ শেষের দিকে পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হিসেবে বিচারপতি কে এম হাসানকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায় আওয়ামী লীগ। বিরোধপূর্ণ ওই পরিস্থিতিতে ওই সময়ের (বিএনপি মনোনীত) রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেকে প্রধান উপদেষ্টা ঘোষণা করলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে, ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা।

এমন পরিস্থিতিতে সেনা হস্তক্ষেপ ঘটে। তখন সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন মইন উ আহমেদ। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জারি করা হয় জরুরি অবস্থা। ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ প্রধান উপদেষ্টার পদ ছাড়েন। অবসরপ্রাপ্ত গভর্নর ফখরুদ্দীন আহমদকে প্রধান উপদেষ্টা করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। তার প্রায় দুই বছর পর নবম সংসদ নির্বাচন হয়।

নবম সংসদ: রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জন

নবম সংসদের প্রথম অধিবেশন নিয়ে ২০০৯ সালের ২৬ জানুয়ারি প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন

২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি শুরু হয় নবম জাতীয় সংসদের অধিবেশন। এ সংসদের সংসদ নেতা ছিলেন শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন খালেদা জিয়া। এ সংসদে আবদুল হামিদ স্পিকার ও কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) শওকত আলী ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন।

নিজেদের মনোনীত রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের বিরুদ্ধে শপথ ভঙ্গের অভিযোগ এনে তাঁর ভাষণ বর্জন করে ওয়াকআউট করে বিএনপি। স্পিকার রাষ্ট্রপতিকে ভাষণের জন্য আমন্ত্রণ জানালে বিএনপির সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ফ্লোর চান। স্পিকার তাঁকে ফ্লোর না দিলে তিনি মাইক্রোফোন ছাড়া খালি গলায় বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ সংবিধানের ৫৮ (ঘ) ধারা অনুযায়ী প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। সংবিধান অনুযায়ী তাঁর ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ নির্বাচন করার কথা ছিল। তা না করে রাষ্ট্রপতি সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। এই রাষ্ট্রপতির ভাষণ আমরা শুনতে পারি না।’

এই সংসদে ২০১১ সালের ৩০ জুন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল করা হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। তারপর দলীয় সরকারকে ক্ষমতায় রেখে নির্বাচনের ধারা চালু হয়, যার প্রতিটি নির্বাচন ছিল বিতর্কিত।

দশম সংসদ: বিরোধী দলও মুখর প্রধানমন্ত্রীর গুণগানে

দশম সংসদের প্রথম অধিবেশন নিয়ে ২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন

এর আগে প্রতিটি সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের বাদানুবাদ উত্তাপ ছড়ালেও দশম সংসদ ছিল ব্যতিক্রম। বিএনপিসহ অধিকাংশ দলের বর্জনের মধ্যে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর সংসদের যাত্রা শুরুর দিনে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরাও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গুণগানে মুখর হয়ে ওঠেন।

এই সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন জাতীয় পার্টির রওশন এরশাদ। তাঁর বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখতে একসঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে হবে। জাতীয় পার্টিকে নিয়ে অনেকে অনেক আলোচনা করছেন। সরকারে তিনজন মন্ত্রী থাকলে, বিরোধী দল কীভাবে হয়, সে প্রশ্ন তুলছেন। কিন্তু এটা আমাদের নতুন কনসেপ্ট (ধারণা)। কেয়ারটেকারও (তত্ত্বাবধায়ক সরকার) নতুন কনসেপ্ট ছিল। মন্ত্রী আছেন ঠিকই, তবে আমরা বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে চাই।’

২০১৪ সালের ২৯ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অধিবেশন শুরু হয়। স্পিকার হিসেবে শিরীন শারমিন চৌধুরী ও ডেপুটি স্পিকার হিসেবে ফজলে রাব্বি মিয়ার নাম প্রস্তাব করার পর তা ভোট দেওয়া হয়। সরকারি দলের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে বিরোধী দলও ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়। স্পিকার নির্বাচনের আগে সকালে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। তিনি রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনের উপনির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এর আগে তিনি সংরক্ষিত নারী আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত সংসদ সদস্য ছিলেন।

উদ্বোধনী অধিবেশনে সরকারি দল সংসদীয় রেওয়াজ ভাঙারও দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। দিনের কর্মসূচি অনুযায়ী স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন ও সভাপতিমণ্ডলীর মনোনয়নের পর সদ্য প্রয়াত টাঙ্গাইল-৮ আসনের সংসদ সদস্য শওকত মোমেন শাহজাহানের ওপর শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি। এর স্থলে নতুন নির্বাচিত স্পিকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে অনির্ধারিত আলোচনা শুরু হয়।

একাদশ সংসদ: ঘুরেফিরে আগের সবাই

একাদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন নিয়ে ২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন

২০১৮ সালের নির্বাচন ঘিরে বিতর্ক ছিল। এ নির্বাচনকে ‘রাতের ভোট’ বলেও বিদ্রূপ করা হয়। অভিযোগ ওঠে, নির্বাচনের আগের রাতে অনেক কেন্দ্রের ব্যালট বাক্স সরকারি দলের প্রার্থীরা নিজেদের পক্ষে ভরে ফেলেন।

প্রশ্নবিদ্ধ ওই নির্বাচনের পর ২০১৯ সালের ৩০ জানুয়ারি শুরু হয় একাদশ জাতীয় সংসদ। ওই সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তবে তিনি অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন না। নাটকীয় এক অসুস্থতা নিয়ে তিনি নির্বাচনের সময়টায় হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।

অধিবেশনের শুরুতে শিরীন শারমিন চৌধুরী ও ফজলে রাব্বি মিয়া স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে পুনর্নির্বাচিত হন। সংসদ নেতাও ছিলেন শেখ হাসিনা। রওশন এরশাদের পরিবর্তে তাঁর স্বামী, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব নেন।

ওই সময় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ছিলেন কারাগারে। তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। সেবার নির্বাচনে জয়ী হয়েও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শপথ নেননি। ওই সংসদে বিএনপির সাতজন সংসদ সদস্য ছিলেন। তবে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে তাঁরা সবাই পদত্যাগ করেন।

দ্বাদশ সংসদ: ৭ মাসেই শেষ

দ্বাদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন নিয়ে ২০২৪ সালের ৩১ জানুয়ারি প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন

একতরফা পর পর তিনটি নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি। নির্বাচনটি ‘আমি’ ও ‘ডামি’ নির্বাচন নামে পরিচিতি লাভ করে। মূল প্রার্থী ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী একই দলের, মানে আওয়ামী লীগের, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ে ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন। বেশির ভাগই দাঁড়িয়েছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী পরিচয়ে। বিএনপিসহ বিভিন্ন দল ও জোট নির্বাচন বর্জন করেছিল।

২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। এই সংসদে শিরীন শারমিন চৌধুরী টানা চতুর্থবারের মতো স্পিকার হন। সংসদ নেতা থাকেন শেখ হাসিনাই। বিরোধীদলীয় নেতা হন জাতীয় পার্টির জি এম কাদের।

এই সংসদের উদ্বোধনী দিনে রাষ্ট্রপতির ভাষণে মো. সাহাবুদ্দিন ৭ জানুয়ারি নির্বাচন বর্জন করা দলগুলোর সমালোচনা করেছিলেন। তিনি বলেন, নির্বাচন ঘিরে একটি পক্ষ সহিংসতা ও সংঘাত সৃষ্টি করেছিল। গণতন্ত্রের যাত্রাপথে বাধা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালিয়েছিল।

এ সংসদ সাত মাসও পার করতে পারেনি। এক তরফা নির্বাচনের ভয়াবহ পরিণতির নজির হয়ে থাকবে দ্বাদশ সংসদ। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে জুলাই মাসে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে যে আন্দোলন শুরু হয়, দমন–পীড়নের কারণে রক্তাক্ত এক পথ পেরিয়ে তা অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন সে দিনই সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন।