হামিদুর রহমান আযাদ
হামিদুর রহমান আযাদ

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে মতভিন্নতা

নামে মাত্র সংস্কার হলে হবে না, দিতে হবে আইনি ভিত্তি

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভিন্নতা কাটছে না। গত বৃহস্পতিবার জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে দলগুলোর সর্বশেষ আলোচনায়ও ভিন্নমত উঠে এসেছে। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদের বক্তব্য ঈষৎ সংক্ষিপ্ত আকারে এখানে তুলে ধরা হলো।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, নামে মাত্র একটা সংস্কার হলে হবে না। সংস্কারের আইনি ভিত্তি তৈরি অপরিহার্য বিষয়। যার ভিত্তিতে আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন যেন হয় এবং সেটি নিশ্চিতভাবে এই সময়ে যদি করতে হয়, তাহলে এটার আইনি ভিত্তি দিতে হবে।

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনায় হামিদুর রহমান এ কথা বলেন।

হামিদুর রহমান আযাদের ঈষৎ সংক্ষেপিত বক্তব্য

আসলে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় আমরা কোনটাকে প্রাধান্য দিচ্ছি? আমরা কি সংসদকে প্রাধান্য দিচ্ছি? না জনগণের যে অভ্যুত্থানটা হয়েছে, আবার বিপ্লব-অভ্যুত্থান বিতর্ক চলছেই, এটাও মীমাংসা হয়নি। শব্দ যেটাই থাকুক না কেন, আমাদের প্রাধান্য কোনটা পাচ্ছে? আমি প্রশ্ন করতে চাই, যে সংসদকে প্রাধান্য দিয়ে আমরা আলোচনা করছি যে সংসদ ছাড়া কিছুই হবে না। অবশ্যই হবে না। যদি সংসদ থাকত, যদি সংসদের ডিরেকশন, নির্দেশনা, উদ্যোগে গণবিপ্লবটা হতো বা অভ্যুত্থানটা হতো। সংসদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কি অভ্যুত্থান হয়েছে? নো, এটা জনগণের অভ্যুত্থান হয়েছে, ছাত্র–জনতার আন্দোলন, বিপ্লব, অভ্যুত্থান হয়েছে। তাহলে এটা একটা পার্ট। অভ্যুত্থান একটা পর্ব। নাটকের যেমন বিভিন্ন পর্ব থাকে। রাইটাররা বই লেখে, পর্ব থাকে। সংবিধানের বিভিন্ন অধ্যায় আছে, এ রকম একটা পর্ব। কমপ্লিট কোর্স এটা হয়নি এখন পর্যন্ত। কারণ হলো যে লক্ষ্য নিয়ে, যে উদ্দেশ্য নিয়ে অভ্যুত্থানটা হয়েছে, সেটার সমাপ্তি ঘটে নাই।

সে উদ্দেশ্য, লক্ষ্য, অ্যাচিভমেন্ট সে জায়গায় আমরা পৌঁছাতে পারিনি। তাহলে বিপ্লব, সংস্কার চলমান প্রক্রিয়া। সবকিছুই হচ্ছে একটা আরেকটার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। একেকটি পার্ট। টোটাল মিলেই হচ্ছে একটা কমপ্লিট বুক বা কমপ্লিট একটা আমরা রেভল্যুশন বলতে পারি অথবা অভ্যুত্থান বলতে পারি।

জুলাই সনদ

আজকে যে ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়েছে, এটা কি পার্লামেন্টে হয়েছে? এটা কি অন্য কোনো ফোরামে হয়েছে? হ্যাঁ, হয়েছে। এটা রাষ্ট্র, সরকার, ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট করেছে। কেন করেছে? ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট করেছে সংস্কারের উদ্দেশ্যে। সেসব সংস্কার যদি বাস্তবায়ন প্রপারলি (যথাযথভাবে) না হয়, তাহলে এই উদ্দেশ্যটা তো ব্যাহত হবে। সেই কারণে আমরা সংসদকে প্রাধান্য দেব না গণ-অভ্যুত্থান, গণ অভিপ্রায়?

যদি অভ্যুত্থানকে পরিপূর্ণতা দিতে হয়, তাহলে অবশ্যই এ সংস্কারের মাধ্যমে যে সনদ, সেই সনদের ভিত্তিতেই আমাদের সামনে অগ্রসর হতে হবে। যদি আমরা মনে করি যে এখানে সংসদ নাই, আবার আমরা সংসদ পরবর্তী সংসদকে দিয়েই একটা প্রাধান্য দিয়ে এগোতে চাই, তাহলে ইগনোর (বাদ দেওয়া) করা হবে জুলাই বিপ্লব, জুলাই অভ্যুত্থানকে। তার স্পিরিট আমরা কি ধারণ করি না? তাহলে আমাদের কাছে কি সংশয় হচ্ছে যে আসলে অভ্যুত্থান হয়েছিল কী জন্য? কী উদ্দেশ্যে? সরকারের কমিটমেন্ট (অঙ্গীকার) কী ছিল?

দায়িত্ব গ্রহণের পরেই সরকার বলে সংস্কার, বিচার, নির্বাচন। এই তিনটি কথার ভেতরে সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। সুতরাং আমরা মনে করি, নামে মাত্র একটা সংস্কার হলে হবে না। সংস্কারের আইনি ভিত্তি রচনাটা অপরিহার্য বিষয় হবে। যার ভিত্তিতে আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন যেন হয়, সে নির্বাচনটা নিশ্চিতভাবে এই টাইমলাইনে (সময়সীমা) যদি করতে হয়, তাহলে এটাকে আইনি ভিত্তি দিতে হবে। আমরা লিখিতভাবে প্রস্তাব সংস্কার কমিশনের কাছে দিয়েছি। প্রক্রিয়াটা একেবারে সুস্পষ্ট।

আমরা মনে করি, এই আলোচনার সমাপ্তিতে বিশেষ যে সাংবিধানিক অর্ডার বলা হচ্ছে, স্পেশাল কনস্টিটিউশন অর্ডার, সে অর্ডারটাই অতীতে যে প্রিসিডেন্সগুলো আমাদের দেশে আছে, ইতিমধ্যে হাউসে এগুলো প্লেস হয়েছে, ১৯৭০–এর এলএফও, এটার বড় রেফারেন্স, যেটার ভিত্তিতে সত্তরের নির্বাচন হয়েছে, যেটার ভিত্তিতে নির্বাচিত গণপরিষদে ১৯৭২ সালে সংবিধান হয়েছে এবং পরবর্তীকালে যে ’৭৫–পরবর্তী পরিস্থিতিতে, ১৯৭৭–এর এই রেফারেন্সটা এখানে এসেছে, গণভোটও হয়েছে সেখানে এবং অধ্যাদেশও জারি হয়েছে অনেকগুলো। আবার অর্ডারও একটা আছে, যেগুলো আপনারা আলোচনা করেছেন।

এত রেফারেন্স থাকার পরও একটা গণ-অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে যে গঠিত সরকার এবং আগামী দিনে নির্বাচন এবং সংস্কারের ভিত্তিতে নির্বাচন, সে জায়গায় কেন আমরা গণ-অভ্যুত্থানকে প্রাধান্য না দিয়ে আবার দুই বছর পর গঠিত নির্বাচিত সংসদে গিয়ে এগুলো হবে? তাহলে এখানে অবিচার করা হবে, ইনজাস্টিস হবে গণ-অভ্যুত্থানের প্রতি।

সেই কারণে আমরা আমাদের দলের পক্ষ থেকে সুস্পষ্টভাবে বলেছি, যে স্পেশাল অর্ডারটা বলা হচ্ছে, সেটা রাষ্ট্রপতির বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগের মধ্য দিয়ে হতে পারে, গণভোটের মাধ্যমেও হতে পারে। গণভোটটা অনেক বেশি টেকসই এবং পর্যায়ক্রমিকও হতে পারে। আমরা যদি প্রভিশনাল করি স্পেশাল অর্ডারটা, তাহলে আর এটাকে চূড়ান্ত রূপে যদি আমরা গণভোটে চলে যাই, সেটাও হতে পারে। ফার্স্ট টাইম স্পেশাল কনস্টিটিউশনাল অর্ডারটা আসুক, তারপরই আমরা গণভোটের প্রয়োজন, প্রেক্ষিতে যেতে পারব।

তাহলে কী হবে? আইনি ভিত্তিও রচিত হবে জুডিশিয়ারির কাছেও, পার্লামেন্টের কাছেও। এটা একটা আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করবে, যদি স্পেশাল কনস্টিটিউশন অর্ডার হয়। এটা অনেক বেশি শক্তিশালী হবে আমরা মনে করি। যদি আগামী নির্বাচন আমরা করতে চাই, সংবিধানের মূল কাঠামো যদি সুরক্ষা দিতে চাই, তাহলে বর্তমান যে প্রশ্নগুলো আছে, এই সরকারের আইনি ভিত্তি, ১০৬–এর ব্যাপারে যে বলা হচ্ছে, এটা আমিও নিজে মনে করি সঠিক পদ্ধতি হয়েছে, এটা আমরা মনে করি না।

তবে জনগণের অভিপ্রায়টা হলো বড় শক্তিশালী বিষয়, যেটা পরে হাইকোর্টের রিটে বলা হয়েছে, জনগণ মেনে নিয়েছে, এটাই ভিত্তি হতে পারে। জন অভিপ্রায়ে হয়েছে, এটাই হতে পারে। কিন্তু একটা দুর্বল বা পক্ষে–বিপক্ষে মত থেকে এমতাবস্থায় একটি সরকার এত বড় একটা নির্বাচন করতে যাবে, তাকে কোনো আইনি প্রটেকশন (সুরক্ষা) দেওয়া হবে না? সরকারেরও নাই, আবার জুলাই সনদেরও নাই আইনি ভিত্তি। আবার দুই বছর পরে সংসদের অপেক্ষা? তাহলে আমরা এটা কী করলাম এত দিন? সবকিছু তো অর্থহীন হয়ে যাবে। সবকিছু বিফলে যাবে। বিপ্লবটাই ধ্বংস হয়ে যাবে।

তাহলে আমরা কি এই লাইনে হাঁটছি যে এই বিপ্লবটা শেষ করে দিয়ে আমরা আবার সেই পুরোনো ধারায় চলে যাব? এটা অনেকগুলো ইন্টারেস্ট তৈরি হবে, অনেকেরই। সেই জায়গায় রাষ্ট্র বিপদের মধ্যে পড়বে, নির্বাচনটা ঝুঁকিতে পড়ে যাবে। সবকিছু একটা আনসার্টেন (অনিশ্চত) হয়ে এমন একটা জায়গার দিকে রাষ্ট্র চলে যেতে পারে, এটা অন্ধকারের দিকে ধাবিত হওয়ার মতো নামান্তর হবে।

আমার মনে হয় রাজনৈতিকভাবে যাঁরা দেশ নিয়ে ভাবি, দায়িত্বশীলতার জায়গা থেকে আমরা যদি একটু ব্রড সেন্সে (সার্বিক দিক বিবেচনায়) চিন্তা করি, আমাদের আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ে (বোঝাপড়ায়) এ জায়গাটা একটু বাড়াতে পারি, এটা দেশের জন্য অনেক বেশি কল্যাণকর হবে, জনগণের কল্যাণ হবে। এ জন্য আমি আবার রিপিট করছি যে যদি স্পেশাল কনস্টিটিউশনাল অর্ডার এবং পরে গণভোট, তার ভিত্তিতে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের যে টাইমলাইন ঘোষণা হয়েছে, এর মধ্যে যদি হয়, তাহলে জাতি মুক্তি পাবে।