২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের ডান পাশে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম (চরমোনাই পীর)। তখন আট দল একসঙ্গে আন্দোলনে ছিল, পরে তা নির্বাচনী জোটে গড়ায়। এরপর আরও তিনটি দল যুক্ত হয় এই প্রক্রিয়ায়
২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের ডান পাশে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম (চরমোনাই পীর)। তখন আট দল একসঙ্গে আন্দোলনে ছিল, পরে তা নির্বাচনী জোটে গড়ায়। এরপর আরও তিনটি দল যুক্ত হয় এই প্রক্রিয়ায়

আসন নিয়ে অসন্তোষ

জামায়াতের জোটে চরমোনাই পীর ও মামুনুল হকের থাকা অনিশ্চয়তায়

জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং আল্লামা মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নির্বাচনী আসন সমঝোতায় থাকবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। আসন বণ্টন বিষয়ে অসন্তোষ থেকেই এই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে; যদিও বাকি ১০টি দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে আসন বণ্টনের বিষয়টি চূড়ান্ত করে আজ বুধবার বিকেলেই তা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানাতে চায় জামায়াত।

দলীয় সূত্রে ও সরেজমিন জানা গেছে, গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর পুরানা পল্টনে ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে অনেক নেতা রামপুরার একটি মাদ্রাসায় যান। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকেও গাড়ি নিয়ে অনেকে যান সেই মাদ্রাসায়। সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজের পরে সেখানে দলটির শুরা কাউন্সিলের বৈঠক হয়। বৈঠকে কেন্দ্রীয় থেকে তৃণমূলের নেতারা জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ে অসন্তুষ্টির কথা জানান।

ইসলামী আন্দোলন শতাধিক আসনে নির্বাচন করতে চেয়েছিল। তবে ধাপে ধাপে আসনের চাহিদা কমিয়েছে। সর্বশেষ তাদের দাবি ছিল ৫০টির বেশি আসন। তবে জামায়াত দলটিকে ৪০টি আসন ছাড় দিতে চায়।

রামপুরার যে মাদ্রাসায় গতকাল রাত সাড়ে ১০টার দিকে গিয়ে বৈঠক চলার খবর পাওয়া যায়, তার ৮তলা ভবনের নিচতলার গেটের সামনে দলের কয়েকজন নেতা–কর্মী অবস্থান করছিলেন, যাতে বাইরের কেউ ভবনের ওপরে উঠতে না পারে।

দলটির নেতাদের সূত্রে জানা যায়, রুদ্ধদ্বার এই বৈঠক শুরু হয় সন্ধ্যার পরে। মাঝখানে এশার নামাজের বিরতি দিয়ে পুনরায় বৈঠকে বসেন নেতারা।

রাত সোয়া ১২টা পর্যন্ত অবস্থান করে দেখা গেছে, ভবনের নিচে ইসলামী আন্দোলনের কিছু নেতা-কর্মী আলাদা আলাদা জায়গায় জটলা করে দাঁড়িয়ে আসন সমঝোতা নিয়ে আলাপ করছেন। আবার পৌনে ১২টার সময়ও অনেককে গাড়ি নিয়ে বৈঠকে যোগ দিতে দেখা গেছে। রাত একটার পরে বৈঠক শেষ হয় বলে জানা গেছে।

আজ জোহরের নামাজের পর মজলিশে আমেলার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেই বৈঠকের পর দলীয় অবস্থান জানানো হবে।
আশরাফ আলী আকন, প্রেসিডিয়াম সদস্য, ইসলামী আন্দোলন

দলীয় সূত্র বলছে, গণ–অভ্যুত্থানের পরে ইসলামী আন্দোলন প্রথম ‘ওয়ান বক্স’ পলিসি নিয়ে কাজ শুরু করে, যেখানে সমঝোতাকারী দলগুলো একটি আসনে একজন প্রার্থীই দিতে পারবে। শুরুতে ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে এই আলোচনায় যুক্ত হয় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন এবং বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি। ষষ্ঠ দল হিসেবে যোগ দেয় জামায়াত। এরপর জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) সমঝোতার আলোচনায় যুক্ত হয়।

দলগুলোর নেতারা বলছেন, এরপর জামায়াত কিছু সিদ্ধান্ত এককভাবে নিয়েছে, যা অন্য দলগুলো ভালোভাবে নেয়নি। যেমন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এবং আমার বাংলাদেশ পার্টিকে (এবি পার্টি) আসন সমঝোতায় আনার ক্ষেত্রে জামায়াত আলাদা করে তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। এসব বৈঠকের আগে অন্য দলগুলোকে কিছুই জানানো হয়নি।

এরপর আসন সংখ্যা নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের অসন্তোষ প্রকাশ পায়। দলটি শুরু থেকে শতাধিক আসনে নির্বাচন করতে চেয়েছিল। তবে আলোচনার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে আসনের চাহিদা কমিয়েছে। সর্বশেষ তাদের দাবি ছিল ৫০টির বেশি আসন। তবে জামায়াত দলটিকে ৪০টি আসন ছাড় দিতে চায়। ইসলামী আন্দোলনের অনেক নেতাই এটি মানতে নারাজ।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২৫ থেকে ৩০টি আসন চাইলেও জামায়াত সর্বোচ্চ ২০টি আসনে ছাড় দিতে পারে। কাঙ্ক্ষিত আসন না পেলে যে কয়টিতে ছাড় দেওয়া হবে না, সেখানে প্রার্থী উন্মুক্ত রাখতে চায় খেলাফত মজলিস।

ইসলামী আন্দোলন মনে করে, ১০টি দলের সঙ্গে আলোচনার মধ্যেই বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান জাতীয় সরকার গঠনের পক্ষে কথা বলেন। এটিকে ইসলামী আন্দোলনের অনেকে দ্বিচারিতা হিসেবে দেখছেন।

গতকাল মধ্যরাতে ইসলামী আন্দোলনের শুরা কাউন্সিলের বৈঠক শেষ হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার দেওয়া হয়েছে মজলিসে আমেলার (সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম) ওপর। আজ বুধবার মজলিসে আমেলার বৈঠক হতে পারে। এরপর আসন সমঝোতায় থাকা নিয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

এ বিষয়ে ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় এক নেতার সঙ্গে মঙ্গলবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে মুঠোফোনে কথা হয় প্রথম আলোর এই প্রতিবেদকের। তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আসন সমঝোতায় যুক্ত থাকা গুরুত্বপূর্ণ একটি দলের পক্ষ থেকে কিছুদিন আগে ইসলামী আন্দোলনকে জানানো হয়েছিল, শুরুতে আলোচনায় যুক্ত থাকা পাঁচ দল সমঝোতা করে নির্বাচন করবে, এটি যেন জামায়াতকে জানানো হয়। তবে এই আলোচনা পরে আর এগোয়নি।

ইসলামী আন্দোলনের ওই নেতা বলেন, আসন সমঝোতার বিষয়টি সম্পূর্ণ নির্ভর করছে দলের আমির চরমোনাই পীরের সিদ্ধান্তের ওপর। তিনি যদি সমঝোতায় থাকতে চান, তাহলে শুরা কাউন্সিল বা মজলিসে আমেলা যা-ই সুপারিশ করুক, সেগুলো আর গুরুত্ব পাবে না। আর তিনি না থাকতে চাইলে সমঝোতা হবে না।

আজ বুধবার সকালে ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য আশরাফ আলী আকন মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, আজ বাদ জোহর মজলিশে আমেলার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর দলীয় অবস্থান জানানো হবে।

এদিকে মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের একাধিক নেতা জানান, মঙ্গলবার জামায়াতের সঙ্গে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের বৈঠক হয়েছে। তবে তাদের দল ২৫ থেকে ৩০টি আসন চাইলেও জামায়াত সর্বোচ্চ ২০টি আসনে ছাড় দিতে পারে। কাঙ্ক্ষিত আসন না পেলে যে কয়টিতে ছাড় দেওয়া হবে না, সেখানে তাদের দল প্রার্থী উন্মুক্ত রাখতে চায়।

গতকাল রাত ১১টার দিকে মামুনুল হক মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, আলোচনা ভালোভাবে এগোচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত কিছু আসনে সমঝোতা না হলে সেসব আসন উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। সমঝোতার আলোকেই সেটি করা হবে।

ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে জামায়াতের কিছুটা টানাপোড়েন চলছে। যদি ইসলামী আন্দোলন জোট থেকে বেরিয়ে যায়, তাহলে আমাদেরও জোটে থাকার বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে।
জালালুদ্দীন আহমদ, মহাসচিব, খেলাফত মজলিস

তবে দলটির এক নেতা গতকাল রাতে বলেন, জামায়াতের সঙ্গে এখনো আসন সমঝোতা চূড়ান্ত হয়নি। বুধবার বৈঠক হতে পারে। সমঝোতা চূড়ান্ত না হলে জোট না–ও টিকতে পারে।

আজ সকাল ১০টার দিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার আলোচনা শেষ পর্যায়ে আছে। তারা এই জোট ভাঙতে চান না। তবে ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে জামায়াতের কিছুটা টানাপোড়েন চলছে। যদি ইসলামী আন্দোলন জোট থেকে বেরিয়ে যায়, তাহলে তাদেরও জোটে থাকার বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে।

এ বিষয়ে গতকাল রাতে জামায়াতের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা হয়েছে প্রথম আলোর। তারা শেষ পর্যন্ত আসন সমঝোতা হওয়ার এবং সব দলের থাকার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তবে আজ সকালে জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় চারজন নেতার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সেটি সম্ভব হয়নি।

তবে আজ সকালে জামায়াতের পক্ষ থেকে ১১ দলের আসন সমঝোতা বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা দিতে বিকেলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়েছে। সেখানে ১১ দলের শীর্ষ নেতারা থাকবেন বলে জানানো হয়েছে।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট আলাদা করার দাবিতে তার আগেই একসঙ্গে কর্মসূচি পালন করছিল ইসলামী আটটি দল। সেগুলো হলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি)। পরে আসন সমঝোতা করে একসঙ্গে নির্বাচনের সিদ্ধান্তও নেয় তারা। পরে সমঝোতায় যুক্ত হয় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এবং আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)।