ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে কয়েকটি আসনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে তার প্রতিবাদে ৬ মার্চ রাজধানীতে বিক্ষোভ সমাবেশ করে জামায়াতে ইসলামী
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে কয়েকটি আসনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে তার প্রতিবাদে ৬ মার্চ রাজধানীতে বিক্ষোভ সমাবেশ করে জামায়াতে ইসলামী

নির্বাচন–বিতর্ক জিইয়ে রেখে বিএনপির ওপর চাপ তৈরির চেষ্টায় জামায়াত

নির্বাচন–পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপি সরকারকে চাপে রাখতে বিভিন্ন কৌশল নিয়েছে সংসদে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য ৩২টি আসনে ভোট পুনর্গণনার দাবি তুলে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আবেদন করেছে। এর মধ্যে অন্তত ১৩টি আসনের ফলাফল চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন ঐক্যভুক্ত দলগুলোর প্রার্থীরা।

একই সঙ্গে নির্বাচন ঘিরে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক দুই উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও খলিলুর রহমানের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে জামায়াত। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ ও বিচারের দাবি জানিয়ে বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কে তুলে ধরার চেষ্টা করছে দলটি। পাশাপাশি এসব বিষয়ে সংসদেও সোচ্চার থাকার চিন্তা জামায়াতের। দৃশ্যত এর মধ্য দিয়েই রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করার কৌশল নিয়েছে দলটি।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। দলটি এককভাবে ২০৯টি এবং জোটগতভাবে ২১২টি আসনে জয়লাভ করেছে। অন্যদিকে জামায়াত এককভাবে ৬৮টি এবং জোটগতভাবে ৭৭টি আসনে জয়লাভ করেছে।

নির্বাচনের দুই দিন পর গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ৩২টি আসনে ভোট পুনর্গণনার দাবি জানিয়ে ইসিতে আবেদন করে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য। এসব আসনের মধ্যে ২৫টিতে জামায়াত, ৩টিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ২টি আসনে খেলাফত মজলিস এবং ১টি করে আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রার্থী ছিলেন। এসব আসনে ভোটের ব্যবধান ছিল ১ হাজার ২৬ থেকে ১৩ হাজার ৬৩২।

১১ মার্চ বিরোধী দলের সংসদীয় দলের বৈঠকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের সংসদ সদস্যরা

জামায়াতের অভিযোগ, এসব আসনে অল্প ব্যবধানে জামায়াত জোটের প্রার্থীদের হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন অনিয়ম হয়েছে। অনিয়মের মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত দেরি, পোলিং এজেন্টের স্বাক্ষর ছাড়া ফলাফল প্রকাশ, ভুয়া পোলিং এজেন্টের স্বাক্ষরে ফলাফল প্রকাশ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে পেনসিল দিয়ে ফলাফল লেখার মতো ঘটনা।

জামায়াতের প্রার্থীরা ইসিতে অভিযোগ জানানোর পরই নির্বাচনের ফলাফল চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যাওয়া শুরু করেন। ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে শুরু করে গত সপ্তাহ পর্যন্ত জামায়াতের ১২ জন প্রার্থী আদালতে গিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন খুলনা-৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও দলের সেক্রেটারি জেনারেল ম‌িয়া গোলাম পরওয়ারও।

এ ছাড়া ঢাকা-৬, ঢাকা-৭, ঢাকা-১০, গাইবান্ধা-৪, নারায়ণগঞ্জ-২, নারায়ণগঞ্জ-৩, লালমনিরহাট-১, লালমনিরহাট-২, বরগুনা-২, পিরোজপুর-২ ও কক্সবাজার-৪ আসনের প্রার্থীরা আদালতে নির্বাচনের ফল চ্যালেঞ্জ করে আবেদন করেছেন। এর বাইরে আদালতে গিয়েছেন ঢাকা-১৩ আসনে ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মো. মামুনুল হক।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। দলটি এককভাবে ২০৯টি এবং জোটগতভাবে ২১২টি আসনে জয়লাভ করেছে। অন্যদিকে জামায়াত এককভাবে ৬৮টি এবং জোটগতভাবে ৭৭টি আসনে জয়লাভ করেছে।

এদিকে যে ৩২টি আসনে ভোট পুনর্গণনার দাবি জানানো হয়েছিল, তার মধ্যে ঢাকা-৬, নারায়ণগঞ্জ-২ ও নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের উল্লেখ ছিল না। এই আসনগুলোয় জয়ী ও বিজিতের ভোটের ব্যবধানও তুলনামূলক বেশি। ঢাকা-৬ আসনে ব্যবধান ২৩ হাজারের বেশি। নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে ব্যবধান ৪২ হাজারের বেশি এবং নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে ব্যবধান সাড়ে ২০ হাজার। এর ফলে ভোট নিয়ে অভিযোগ শেষ পর্যন্ত ৩২ আসনে সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, সে আলোচনা শুরু হয়েছে।

জামায়াত নেতারা বলছেন, যেসব আসনে ভোটের তথ্য-উপাত্তে গরমিল পাওয়া যাচ্ছে, সেসব আসনের প্রার্থীরাই আদালতে যাচ্ছেন। ৩২টি আসনের বাইরেও যদি একই ধরনের তথ্য পাওয়া যায়, তবে সেসব আসনের প্রার্থীরাও আদালতে যেতে পারেন। এতে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা আসনের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

আপাতত সাবেক দুই উপদেষ্টার বিচারের দাবি করছি, সময়ের প্রয়োজনে বাকিদের বিষয়ে কথা বলব।
মিয়া গোলাম পরওয়ার, সেক্রেটারি জেনারেল, জামায়াতে ইসলামী

দলটির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৩২টি আসনে পুনর্গণনার দাবি মূলত একটি রাজনৈতিক বার্তা দিতেই করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন জিইয়ে রাখা এবং সরকারকে রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখাই মূল লক্ষ্য। একই সঙ্গে সংসদের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন ইস্যুতে শক্ত অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছে জামায়াত।

নির্বাচন–পরবর্তী জামায়াতের রাজনৈতিক কৌশল বিষয়ে জানতে প্রথম আলো কথা বলেছে দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের দুজন এবং সংসদ নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একজন সদস্যের সঙ্গে। তাঁরা জানান, নির্বাচনের ইস্যু সক্রিয় রাখতে তাঁরা আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে চান।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচন কমিশনে যেসব আসনের বিষয়ে অভিযোগ করা হয়েছে, তার বাইরেও যদি পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়, তবে প্রার্থীরা আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে ফল চ্যালেঞ্জ করা আসনের সংখ্যা বাড়তে পারে।

দুই সাবেক উপদেষ্টাকে নিয়ে বিতর্ক তৈরি

নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক জোরালো করতে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক দুই উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও খলিলুর রহমানের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে জামায়াত। একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ করেছে দলটি। একই সঙ্গে উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করে আসা খলিলুর রহমানকে বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী করার বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ বলে উল্লেখ করছে তারা।

জামায়াতের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিএনপিকে সুবিধা দেওয়ার ‘পুরস্কার’ হিসেবেই খলিলুর রহমানকে মন্ত্রিসভায় নেওয়া হয়েছে।

৫ মার্চ জামায়াত সংবাদ সম্মেলন করে সাবেক দুই উপদেষ্টাকে আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ ও বিচারের দাবি জানায়। তাঁদের বিরুদ্ধে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ অভিযোগও তোলে দলটি। এরপর একাধিকবার একই প্রসঙ্গে বক্তব্য দিয়েছেন জামায়াতের নেতারা।

মার্চ রাজধানীতে বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে নির্বাচনে অনিয়মের পাশাপাশি দুই উপদেষ্টার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলে জামায়াতে ইসলামী

তবে এ বিষয়ে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান প্রথম কথা বলেন ৯ মার্চ। রাজধানীতে এক ইফতার অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের আগে আমরা বড় গলায় বলেছি, আমরা কোনো দলের বিজয় চাই না। আমার দলের নাম ধরেই বলেছিলাম যে এই দলের বিজয় চাই না। আমরা চাই ১৮ কোটি মানুষের বিজয়। ওই বিজয় অর্জিত হয়নি। ভোটের অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। সবকিছু এখন স্পষ্ট দিবালোকে এসে গেছে। আবার সাক্ষীও পাওয়া যাচ্ছে। বিচার এখন জনতার আদালতে এবং সেই বিচারের রায় জনতার পক্ষেই আসবে, ইনশা আল্লাহ।’

নির্বাচনের দুই দিন পর গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ৩২টি আসনে ভোট পুনর্গণনার দাবি জানিয়ে ইসিতে আবেদন করে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য। এসব আসনের মধ্যে ২৫টিতে জামায়াত, ৩টিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ২টি আসনে খেলাফত মজলিস এবং ১টি করে আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রার্থী ছিলেন।

বিষয়টি নিয়ে জামায়াতের অন্তত তিনজন কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁরা বলেছেন, দুজন সাবেক উপদেষ্টার বিচারের দাবি জানিয়ে নির্বাচনে তাঁদের ভূমিকা বিতর্কিত ছিল—এমন আলোচনা জোরালো রাখতে চায় জামায়াত। তবে তাঁরা সাবেক দুই উপদেষ্টার প্রসঙ্গ টেনে অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো উপদেষ্টা পরিষদকে দোষারোপ করতে চায় না।

তাঁদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো অংশের নয়, বরং কারও কারও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। সেই সংখ্যা দুইয়ের অধিক। তবে অন্যদের নাম এখনই প্রকাশ করতে চান না জামায়াত নেতারা।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ৬ মার্চ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা আপাতত সাবেক দুই উপদেষ্টার বিচারের দাবি করেছেন। সময়ের প্রয়োজনে অন্যদের বিষয়ে কথা বলবেন।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদের দাবি তো আমরা করছি। এটা এ কারণে, এই অভিযোগের তদন্তের প্রয়োজনে তো জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। এ কাজ সরকার করবে, না জুডিশিয়ারি তদন্তের মাধ্যেম করা হবে, সেটা সরকার উইল ডিসাইড। কিন্তু আমরা দাবিটা করতেছি। আপাতত এই পর্যায়ে আমরা আছি।’

জামায়াত নেতারা মনে করেন, সংসদ নির্বাচনে কিছু কারচুপি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি হয়েছে ভোট গণনায়। এসব বিষয়ে তাঁরা নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে প্রতিবাদ জানিয়ে যাচ্ছেন। তবে এখনই মাঠে শক্ত অবস্থানে যাওয়ার চিন্তা করছেন না।