কথিত আছে, দীনবন্ধু মিত্রর নাটক ‘নীল দর্পণ’ দেখার সময় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মঞ্চের দিকে জুতা ছুড়ে মেরেছিলেন। বলা হয়, তিনি ব্রিটিশদের নৃশংসতা দেখে এমনটি করেছিলেন। আবার অনেকে বলেন, নাটকের অভিনেতা অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফি অভিনয়ের মাধ্যমে বাস্তবতাকে এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন যে নাটক জেনেও বিদ্যাসাগর রাগে জুতা ছুড়ে মেরেছিলেন এবং অভিনেতা সেটা সম্মানের প্রতীক হিসেবে মাথায় রাখতেন।
অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফি ছাড়া আর কেউ ছুড়ে মারা জুতা সম্মানের সঙ্গে মাথায় তুলে রেখেছেন—এমনটা আর শোনা যায় না; বরং উল্টোটাই ঘটে। বুদ্ধিমানেরা বিষয়টা সহজভাবে নেন। কেউ কেউ তীব্র প্রতিক্রিয়াও দেখান। তবে কোনো কিছু ছুড়ে মারা কেবল নাটক বা সিনেমায় ঘটে, এমনটা নয়; বরং বিশ্বব্যাপী রাজনীতিবিদদের দিকেই জুতা, ডিম, কেক বা সবজি ছুড়ে মারার ঘটনা ঘটে সবচেয়ে বেশি।
এত মানুষ থাকতে রাজনীতিবিদেরা কেন? ১৮৯৭ সালে প্রকাশিত ‘ড্রাকুলা’ উপন্যাসের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন আইরিশ লেখক ব্রাম স্টোকার। ‘পার্সোনাল রেমিনিসেন্সেস অব হেনরি আর্ভিং’ বইটিতে তিনি একটি মজার ঘটনার কথা লিখেছেন। সেখানে তিনি তাঁর এক রাজনীতিক বন্ধুর জনপ্রিয়তা নিয়ে আলাপচারিতা আছে। যেমন—
‘আমি খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠছি।’
বন্ধু বললেন, ‘জনপ্রিয়! গত রাতেই তো দেখলাম, লোকজন তোমার দিকে পচা ডিম ছুড়ছে।’
এবার সে সন্তুষ্টির সঙ্গে জবাব দিল, ‘ঠিক। কিন্তু আগে তারা ইট ছুড়ত।’
ব্রাম স্টোকার হয়তো রসিকতা করে লিখেছিলেন। আসলে নানা কারণে ক্ষুব্ধ জনতার একটি অংশ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রাজনীতিবিদদের প্রতি পাথর, জুতা, কেক, ডিম, টমেটো—এসব ছুড়ে এসেছে। এর উদ্দেশ্য যতটা আঘাত করা, তার চেয়ে বেশি অপমান করা। এখন পর্যন্ত যত দূর জানা যায়, রোমান সম্রাট ভেসপাসিয়ানই হচ্ছেন প্রথম ব্যক্তি, প্রতিবাদ হিসেবে তাঁর দিকেই প্রথম ছোড়া হয়েছিল কোনো বস্তু। বলা হয়, খ্রিষ্টীয় ৬৩ সালে আফ্রিকা সফরের সময় খাদ্যসংকটে ক্ষুব্ধ সাধারণ জনতা তাঁর দিকে শালগম ছুড়েছিল।
এ থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার যে সাধারণ মানুষ সেই প্রাচীনকাল থেকেই প্রতিবাদের একটি পথ খুঁজে পেয়েছিল। এর প্রায় দুই হাজার বছর পরও রাজনৈতিক প্রতিবাদে খাদ্যবস্তু ছোড়ার সেই ঐতিহ্য এখনো টিকিয়ে রেখেছে এখনকার মানুষ।
এবার দেখা যাক, প্রতিবাদকারীরা মূলত রাজনীতিকদের দিকেই কেন খাবার ছুড়েছে। এর একটা নামও দেওয়া আছে। একে বলা হয় ‘কার্নিভ্যালেস্ক’ প্রতিবাদ। কার্নিভালেস্ক প্রতিবাদ হলো এমন এক ধরনের জনরোষের প্রকাশ, যেখানে মানুষ বক্তৃতা বা সহিংসতার বদলে হাস্যরস, অপমান ও প্রতীকী নিক্ষেপকে অস্ত্র বানায়। এর মূল লক্ষ্য কিন্তু আঘাত করা নয়, বরং ক্ষমতাকে তুচ্ছ করে তোলা।
রুশ চিন্তাবিদ মিখাইল বাখতিন মধ্যযুগীয় ইউরোপের কার্নিভ্যাল বিশ্লেষণ করে কার্নিভ্যালেস্ক ধারণাটি জনপ্রিয় করেছিলেন। এ নিয়ে তিনি ‘রাবেলেস অ্যান্ড হিজ ওয়ার্ল্ড’ শিরোনামের বইটি লিখেছিলেন ১৯৪০-এর দশকে। যদিও সোভিয়েত সেন্সরশিপের কারণে এটি ১৯৬৫ সালে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি ফরাসি রেনেসাঁ ফ্রঁসোয়া রাবেলেকে কেন্দ্র করে মধ্যযুগ ও রেনেসাঁ ইউরোপের কার্নিভ্যাল সংস্কৃতি বিশ্লেষণ করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, কার্নিভ্যালের সময় সমাজের স্বাভাবিক নিয়ম উল্টে যায়। রাজা, যাজক, অভিজাত—সবাই জনতার হাসির পাত্র হয়ে ওঠে। এই সাময়িক উল্টাপাল্টাকেই তিনি বলেছেন কার্নিভ্যালেস্ক, অর্থাৎ ক্ষমতার মর্যাদা ভেঙে দেওয়ার মুহূর্ত। রাজনীতিতে ডিম বা জুতা নিক্ষেপ সেই কার্নিভ্যালেস্ক ঐতিহ্যেরই রূপান্তর। এর মাধ্যমে পচা সবজি, কেক বা ডিম ক্ষমতাবানকে নামিয়ে আনে নিচু স্তরে।
টমেটো যথেষ্ট নিরীহ সবজি। স্পেনের লা তমাতিনা উৎসবে নিয়ম আছে যে টমেটো ছোড়ার আগে চেপে নরম করে নিতে হবে, যাতে আঘাত কম লাগে। আর এই টমেটো শুরুতে রাজনীতির চেয়ে নাট্যমঞ্চের সঙ্গেই বেশি যুক্ত ছিল। জনপ্রিয় সিনেমা পর্যালোচনা রিভিউ সাইট ‘রটেন টমেটো’ নামটা এসেছে এখান থেকেই।
তবে রাজনীতিবিদেরা এ থেকে রেহাই পেয়েছেন এমনটা বলা যাবে না। যেমন ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটার এক বই স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে রিপাবলিকান দলের আলোচিত রাজনীতিবিদ সারা পেলিনের দিকে টমেটো ছোড়া হয়েছিল। যদিও তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। ২০১২ সালে মিসরে গিয়েছিলেন সে সময়ের মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। সে সময় তাঁর গাড়িবহরে টমেটো ছোড়া হয়েছিল।
শালগমের কথা আগেই বলেছি। টমেটোর বাইরে বাঁধাকপিও বিখ্যাত হয়ে আছে এক ব্যক্তির কারণে। লেখক অস্কার ওয়াইল্ডের বিখ্যাত নাটক ‘দ্য ইম্পোরট্যান্স অব বিয়িং আরনেস্ট’-এর উদ্বোধনী প্রদর্শনী চলছিল। ১৮৯৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি লন্ডনের সেন্ট জেমস থিয়েটারে অস্কার ওয়াইল্ড যখন দর্শকদের উদ্দেশে কথা বলছিলেন, তখন তাঁর দিকে ছোড়া হয় একটি পচা বাঁধাকপি। তিনি সেটি হাতে তুলে নিয়ে বলেছিলেন, ‘ধন্যবাদ, বন্ধু। যতবার এর গন্ধ পাব, ততবারই তোমার কথা মনে পড়বে।’
নাটকটি ভালো ছিল না এমন নয়। আসলে বাঁধাকপি ছুড়েছিলেন ওয়াইল্ডের প্রেমিক লর্ড আলফ্রেড ডগলাসের পিতা মারকুইস অব কুইন্সবেরি, যিনি তাঁদের সম্পর্কের ঘোর বিরোধী ছিলেন। আমরা জানি এই সম্পর্ক অস্কার ওয়াইল্ডের জীবনে কতটা সর্বনাশ ডেকে এনেছিল।
আবার কেউ কেউ লিখেছেন, নাটকটির উদ্বোধনী মঞ্চায়নের দিনে যে এই কাণ্ড হবে, তা অস্কার ওয়াইল্ড আগেভাগেই বিষয়টি জেনে যান। ফলে পুলিশ মারকুইস অব কুইন্সবেরিকে থিয়েটারে ঢুকতে দেয়নি। শেষ পর্যন্ত তিনি থিয়েটারের প্রবেশপথে পচা সবজি রেখে যান।
ডিম ছোড়া অবশ্য বহুদিনের চর্চা। আর যদি ডিমটি পচা হয়, তাহলে তো কথাই নেই। ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে ‘পিপলস কনভয়’ নামের একদল ট্রাকচালক বিক্ষোভ করেছিলেন। তাঁরা প্রথমে ২০টি ট্রাক নিয়ে গর্ভপাত অধিকার-সমর্থন বিলের প্রতিবাদ জানাতে জড়ো হয়েছিলেন এবুচি উইকস নামের এক ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতার বাড়ির সামনে। এতে চরম বিরক্ত হয়েছিলেন প্রতিবেশীরা। পরে এই ট্রাকচালকদের দল ফিরে যাওয়ার সময় সড়কে যানজটে আটকে পড়লে স্থানীয় লোকজন তাঁদের দিকে ডিম ছুড়ে মেরেছিল। এই দলে শিশুরাও ছিল।
সেদিক থেকে সরকার–সমর্থিত বাংলাদেশের ট্রাকচালকেরা যথেষ্ট ভাগ্যবান। নিশ্চয়ই মনে আছে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসের কথা। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল করে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করছিল বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো। এরই অংশ হিসেবে বিএনপি ২৯ ডিসেম্বর ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ বা গণতন্ত্রের পদযাত্রা কর্মসূচি ঘোষণা করে। তবে এই কর্মসূচিতে যাতে অংশ নিতে না পারেন, এ জন্য তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার খালেদা জিয়ার বাসভবনের গেটের সামনে বালুর ট্রাক দিয়ে একটি শক্ত বেষ্টনী তৈরি করেছিল। ফলে তিনি নিজ বাসভবন থেকে বেরই হতে পারেননি।
বাস্তব জীবনে কিন্তু বহু রাজনীতিকই ডিমের শিকার হয়েছেন। যেমন ১৯৬০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারের সময় তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট ও রিপাবলিকান প্রার্থী রিচার্ড নিক্সনের দিকে ডিম ছোড়া হয়েছিল।
২০০১ সালের ১৭ মে, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন পোল্যান্ডের ওয়ারশ শহরের পুরোনো শহর এলাকায় ঘুরে বেড়ানোর সময় বিশ্বায়নবিরোধী এক তরুণ তাঁর দিকে ডিম ছুড়ে মারেন। ডিমটি ক্লিনটনের বাহুতে আঘাত করে। পোলিশ ও মার্কিন নিরাপত্তাকর্মীরা দ্রুত সেই ১৯ বছর বয়সী প্রতিবাদকারীকে আটক করেন। ঘটনার পর ক্লিনটন তাঁর স্যুটের জ্যাকেট খুলে ফেলেন এবং আরও ১৫ মিনিট ধরে হাঁটেন, পর্যটকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় ও অটোগ্রাফ দেন। তিনি বিষয়টি হালকাভাবে নিয়ে বলেন, ‘তরুণদের কোনো বিষয়ে রাগান্বিত হওয়া ভালো।’
ডিম থেকে বাঁচতে পারেননি রাজা-রানিরাও। ২০২২ সালে ইংল্যান্ডের সদ্য অভিষিক্ত রাজা চার্লস ইংল্যান্ডের লুটন সফরের সময় ডিম নিক্ষেপের মুখে পড়েন। তিনি ও রানি-সঙ্গী প্রয়াত রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের একটি ভাস্কর্য উন্মোচন করতে গিয়েছিলেন। প্রয়াত রানি নিজেও জীবদ্দশায় একাধিকবার ডিম নিক্ষেপের শিকার হয়েছিলেন এবং সেসব ক্ষেত্রে নিশানাও ছিল বেশ নিখুঁত। বর্তমান রাজা অবশ্য ভাগ্যবান ছিলেন, ছোড়া চারটি ডিমই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। পরে ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩ বছর বয়সী এক ছাত্রকে আটক করে জনশৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়।
২০০৩ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর পদপ্রার্থী, টার্মিনেটর খ্যাত অভিনেতা আর্নল্ড শোয়ার্জেনেগারকেও ডিম ছুড়ে মারা হয়েছিল। তবে বিষয়টিকে তিনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অংশ বলে মেনে নিয়ে রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘এখন ওই লোকটার কাছে আমার বেকন পাওনা। কারণ, ডিম ছাড়া বেকন চলবে না।’ নির্বাচনে ঠিকই জিতেছিলেন আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার।
রাজনৈতিক প্রতিবাদের ইতিহাসে ডিম সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত নিক্ষেপযোগ্য বস্তু। প্রশ্ন হচ্ছে ডিম ছুড়ে মারা এত জনপ্রিয় কেন? এর কারণ ডিম সস্তা, সহজলভ্য, প্রতীকী এবং তুলনামূলকভাবে কম প্রাণঘাতী। আবার ডিম মিডিয়াবান্ধব। মিডিয়াবান্ধব হওয়ার প্রথম কারণ এর দৃশ্যগত প্রভাব। ডিম লাগার সঙ্গে সঙ্গে সাদা-হলুদ রং স্পষ্ট হয়ে ওঠে, মুখ, কোট বা শার্টে ছড়িয়ে পড়ে এবং মুহূর্তের মধ্যে একটি দৃশ্য তৈরি হয়। ছবির জন্য যা আদর্শ।
মুখে ক্রিম–পাই মারা চিরকালই ছিল কৌতুকের অংশ। এর ভেতরটা নরম বলে নিক্ষেপের পর এটা ছড়িয়ে পড়ে। সিনেমায় চার্লি চ্যাপলিন, লরেল ও হার্ডি এবং থ্রি স্টুজেস প্রায়ই অন্যের মুখে ক্রিম–পাই ছুড়তেন। কেবল সিনেমায় নয়, রাজনীতিকদের মুখেও পাই ছোড়ার অনেক উদাহরণ আছে। এই তালিকায় আছেন বিল গেটসও।
ক্ষমতাবানদের মুখে কীভাবে পাই ছুড়তে হবে—এ নিয়ে রীতিমতো বইও আছে। এ কাজে উৎসাহ দিতে যুক্তরাষ্ট্রে দুটি সংগঠনও আছে। সংগঠন দুটি হচ্ছে বায়োটিক বেকিং ব্রিগেড (বিবিবি) ও পাই কিল। এই বিবিবির প্রকাশিত বই হচ্ছে ‘পাই এনি মিনস নেসেসারি’। নামটি এসেছে কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার আন্দোলনের স্লোগান ‘বাই এনি মিনস নেসেসারি’ থেকে।
অনেকেই ভাবতে পারেন বিল গেটস কেন। ঘটনাটি ঘটে ১৯৯৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি, বেলজিয়ামের ব্রাসেলস শহরে। মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস শহরের এক ব্যস্ত এলাকায় হাঁটার সময় হঠাৎ এক ব্যক্তি তাঁর মুখে ক্রিম-পাই ছুড়ে মারেন। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল বায়োটিক বেকিং ব্রিগেড। মূলত মাইক্রোসফটের একচেটিয়া প্রভাব, করপোরেট পুঁজিবাদের আধিপত্য এবং প্রযুক্তি কোম্পানির সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্নে প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবেই বিল গেটসকে লক্ষ্য করা হয়।
২০১৯ সালে ব্রিটেন যখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার জন্য নির্বাচন করছিল, তখন মিল্কশেক ছোড়া ডানপন্থীদের বিরুদ্ধে জনপ্রিয় প্রতিবাদের মাধ্যম হয়ে ওঠে। প্রথমে মিল্কশেক ছোড়া হয় টমি রবিনসন ও কার্ল বেঞ্জামিনের দিকে, পরে নাইজেল ফ্যারাজের দিকে।
টমি রবিনসন হলেন ব্রিটিশ উগ্র ডানপন্থী একজন রাজনৈতিক নেতা। ইসলামবিরোধী আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে পরিচিত। কার্ল বেঞ্জামিন ব্রিটিশ ইউটিউবার ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার। নারীবিদ্বেষী ও অভিবাসনবিরোধী বক্তব্যের কারণে বিতর্কিত। আর নাইজেল ফ্যারাজ ব্রেক্সিট আন্দোলনের প্রধান নেতা ও ডানপন্থী রাজনীতিক।
নাইজেল ফ্যারাজের প্রতি মিল্কশেক ছোড়ার ঘটনাটি এতটাই প্রচার লাভ করে যে ফ্যারাজ যখন পরে এডিনবরায় যান, তখন স্থানীয় পুলিশ ম্যাকডোনাল্ডসকে মিল্কশেক বিক্রি না করতে পরামর্শ দিয়েছিল। অন্যদিকে বার্গার কিং তখন উল্টো ঘোষণা দিয়েছিল যে তারা মিল্কশেক বিক্রি চালু রাখবে। ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী বলে কথা।
এরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উগ্র ডানপন্থীদের বিরোধীরা দ্রুতই ডিম ও মিল্কশেককে অ্যান্টি-ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে নতুন করে ব্যবহার করতে শুরু করেন। যদিও ব্রিটেনে এভাবে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ডিম বা মিল্কশেক ছোড়ার ঐতিহ্য বহু পুরোনো। নতুন করে বিষয়টি সামনে আসে ব্রেক্সিট আন্দোলনের সময়।
মিল্কশেকের বিপক্ষে যুক্তি হলো, এর দাম বেশি, পচা সবজির চেয়ে ব্যয়বহুল। তবে এর বড় সুবিধা হলো, দৃশ্যটি ক্যামেরায় দারুণ লাগে। স্যুট পরা একজন মানুষ যখন আঠালো তরলে ভিজে যান, তা খুবই ফটোজেনিক। নিউ ক্যাসলে ফ্যারাজের দিকে যে মিল্কশেক ছোড়া হয়েছিল, সেটি নাকি ছিল কলা ও ক্যারামেলের মিল্কশেক, দাম সোয়া ৫ পাউন্ড। যিনি ছুড়েছিলেন, তিনিই গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানান।
এ নিয়ে ২০১৯ সালের ২১ মে আদিত্য চক্রবর্তী নামে একজন কলামিস্ট দ্য গার্ডিয়ানে লিখেছিলেন, ‘অন্যের দিকে কিছু ছুড়ে মারার আমি কোনো ভক্ত নই, তবে স্বীকার করতেই হবে—এখন মিল্কশেকের দাম ৫ পাউন্ড ২৫ পেনি শুনে আমি সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খেয়েছি।’
ছুড়ে মারার জন্য আম মোটেই নিরীহ ফল নয়। সেই আম ছুড়ে মারার ঘটনাও আছে। ঘটনাটি ঘটে ২০১৫ সালের আগস্টে, ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের উপকণ্ঠে এক জনসমাবেশে। সেখানে বক্তৃতা দিতে গিয়েছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো। সেখানে তাঁর দিকে একটি আম ছুড়েছিলেন মারলেনি অলিভো নামের এক নারী।
পরে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো নিজেই টেলিভিশনে জানান যে আমটির গায়ে একটি বাসস্থানের সমস্যা নিয়ে হাতে লেখা বার্তা ছিল। তাতে লেখা ছিল, ‘পারলে আমাকে ফোন করবেন।’ তিনি জানান, মারলেনি অলিভোকে একটি অ্যাপার্টমেন্ট দেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি অনলাইনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। প্রশংসা, বিদ্রূপ ও রসিকতা সবই হয়। ডলার টুডে নামে একটি ওয়েবসাইট ঠাট্টা করে লেখে, ‘একটা আম ছুড়ে যদি অ্যাপার্টমেন্ট পাওয়া যায়, তাহলে আনারস ছুড়ুন!’
ইদানীং আলোচনায় এসেছে স্যান্ডউইচ। কারণ, এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ঘটনাটি ২০২৫ সালের ১০ আগস্টের। ওই রাতে ওয়াশিংটন ডিসিতে ফেডারেল আইনপ্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের দিকে সাবওয়ে স্যান্ডউইচ ছুড়ে মারার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘অপরাধ, রক্তপাত, বিশৃঙ্খলা ও নোংরামি’ থেকে উদ্ধারের কথা বলে ওয়াশিংটন ডিসির পুলিশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। স্যান্ডউইচ ছুড়ে মারা ছিল এরই প্রতিবাদ।
আদালতের নথি অনুযায়ী, শন চার্লস ডান নামের এক ব্যক্তি মেট্রো ট্রানজিট পুলিশ ও সীমান্ত নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের গালাগাল করেন এবং ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে আখ্যা দেন। এরপর তিনি বেসবলের মতো ওভারহ্যান্ড ভঙ্গিতে স্যান্ডউইচটি এক কর্মকর্তার বুকে লক্ষ্য করে ছুড়ে মারেন। পালিয়ে গেলেও পরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁকে বিচার বিভাগীয় চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। পরে এই নিয়ে গ্রাফিতিও আঁকা হয়।
ঘটনাটি ঘটেছিল ১৬ মে ২০০১। সেদিন উত্তর ওয়েলসের রিল শহরে সাধারণ নির্বাচনের প্রচারের সময় ব্রিটিশ উপপ্রধানমন্ত্রী জন প্রেসকটের দিকে ডিম ছোড়া হয়। ডিমটি তাঁর মুখে লাগে। ডিম ছোড়ার পরপরই প্রেসকট সংযম হারান এবং বিক্ষোভকারী ক্রেইগ ইভানসকে লক্ষ্য করে একটি ঘুষি মারেন। ঘটনাটি ক্যামেরায় ধরা পড়ে এবং দ্রুতই গণমাধ্যমে ছড়িয়ে যায়। এটি পরে ‘প্রেসকট পাঞ্চ’ নামে পরিচিতি পায়।
তবে অন্য উদাহরণও আছে। যেমন, ২০০৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর নির্বাচনী প্রচারণার সময় ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ইয়ানুকোভিচের দিকে এক ছাত্র ডিম ছুড়ে মেরেছিল। এ সময় ইয়ানুকোভিচ ডিমের আঘাতে পড়ে যান এবং চিকিৎসক ডাকতে হয়। ডিমের আঘাতে পড়ে যাওয়ার এই ঘটনাটি ইউক্রেন ও আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক হাস্যরস ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল।
ঘটনাটি ঘটে ১৪ ডিসেম্বর ২০০৮, ইরাকের রাজধানী বাগদাদে। এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের দিকে দুটি জুতা ছুড়ে মারেন ইরাকি সাংবাদিক মুনতাজার আল-জাইদি। তিনি ইরাকি টেলিভিশন চ্যানেল আল-বাগদাদিয়ার প্রতিবেদক ছিলেন। জুতা ছোড়ার সময় তিনি আরবি ভাষায় চিৎকার করে বলেন, ‘দিস ইজ আ ফেয়ারওয়েল কিস ফ্রম দ্য ইরাকি পিপল, ইউ ডগ!’
প্রেসিডেন্ট বুশ দ্রুত ঝুঁকে পড়ে দুটি জুতাই এড়িয়ে যান। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী নুরি আল-মালিকি তখন তাঁর পাশেই ছিলেন। নিরাপত্তারক্ষীরা সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিককে ধরে নিয়ে যান। মুনতাজার আল-জাইদিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁর বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ আনা হয় এবং কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আরব বিশ্বে ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকের কাছে জুতা নিক্ষেপ হয়ে ওঠে ইরাক যুদ্ধ ও মার্কিন দখলের বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদ। মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতিতে জুতা ছোড়া চরম অপমানের প্রতীক, এ কারণে ঘটনাটি বিশেষ তাৎপর্য পায়।
২০২৩ সালে রয়টার্স জানায়, মুনতাজার আল-জাইদিকে ওই হামলার দায়ে ছয় মাস কারাভোগ করতে হয়েছিল। মুক্তির পর তিনি লেবাননে চলে যান, তবে ২০১৮ সালে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অঙ্গীকার নিয়ে ইরাকের সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে দেশে ফেরেন। যদিও তিনি নির্বাচিত হতে পারেননি।
২০১০ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া শহরে একটি নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন সে সময়ের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ভিড়ের মধ্য থেকে জেমস রেলি নামের এক ব্যক্তি প্রেসিডেন্ট ওবামার দিকে একটি পেপারব্যাক বই ছুড়ে মারেন। বইটি ওবামার গায়ে লাগেনি। নিরাপত্তারক্ষীরা সঙ্গে সঙ্গে ওই ব্যক্তিকে আটক করেন। পরে জানা যায়, বইটি রেলির নিজের লেখা। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ওবামার দৃষ্টি আকর্ষণ করা, যাতে প্রেসিডেন্ট বইটি পড়ে দেখেন। পরে রেলির বিরুদ্ধে অশান্তি সৃষ্টিসংক্রান্ত অভিযোগ আনা হয়।
এখন লেখকেরা এভাবে তাঁদের বই পড়াতে চাইলে তো মহাবিপদ।
এটি অবশ্য সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ নয়, বরং এক ধরনের পাল্টা প্রতিবাদ। আনতানাস মকুস ১৯৯৩ সালে কলম্বিয়ার বোগোতা শহরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব কলম্বিয়ার রেক্টর (প্রধান) ছিলেন। তিনি গণিত ও দর্শনের অধ্যাপক। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের তীব্র হট্টগোল ও বিশৃঙ্খলার মুখে পড়েন। পরিস্থিতি শান্ত করতে না পেরে তিনি হঠাৎ শ্রোতাদের দিকে পেছন ফিরে নিজের প্যান্ট নামিয়ে নিতম্ব প্রদর্শন করেন। এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, শিক্ষার্থীদের আচরণ কতটা অশোভন ও অসম্মানজনক।
ঘটনাটি সঙ্গে সঙ্গে দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একে অনুপযুক্ত আচরণ হিসেবে বিবেচনা করে, এবং পরে তিনি পদ ছাড়েন। তবে এই ঘটনার পর তিনি ব্যাপকভাবে পরিচিতি পান, রাজনীতিতে আসেন এবং ১৯৯৫ সালে বোগোতার মেয়র নির্বাচিত হন।
মেয়র হয়েই তিনি আরেকটি কাজ করেন। তখন বোগোতার বড় সমস্যা ছিল ট্রাফিক বিশৃঙ্খলা। পরিস্থিতি বদলাতে তিনি ৪২০ জন মাইম শিল্পী নিয়োগ দেন। তাঁরা শহরের ব্যস্ত মোড়ে দাঁড়িয়ে নিয়মভঙ্গকারী চালক ও পথচারীদের আচরণ নকল করে দেখাতেন এবং বিদ্রূপ করতেন। উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক লজ্জা ও মজার পরিস্থিতি তৈরি করে মানুষকে নিয়ম মানতে উৎসাহিত করা। এই উদ্যোগের পর ট্রাফিক সিগন্যাল মানার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়—একাধিক গবেষণায় ২৫–৩০ শতাংশ থেকে ৭০–৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশে কেউ কি এমনটি করবেন?
ইতালির মিলানের ক্যাথেড্রালের বাইরে জনতার সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বেরলুসকোনির দিকে ক্যাথেড্রালের একটি স্মারক মূর্তি ছোড়া হয়। এতে তাঁর নাক ভেঙে যায় এবং দুটি দাঁত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি ঘটেছিল ২০০৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর।
হামলাকারী মাস্সিমো তার্তারাগ্লিয়াকে মানসিকভাবে অস্থির এক ব্যক্তি বলে পরে পুলিশ জানায়। আদালত পরে তাঁকে মানসিক স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসাধীন রাখার নির্দেশ দেন। এই ঘটনা ইউরোপে রাজনৈতিক নেতাদের ওপর বস্তু নিক্ষেপজনিত সবচেয়ে গুরুতর হামলাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়; কারণ, এতে সরাসরি শারীরিক ক্ষতি হয়েছিল।
স্বল্প আয়ের দেশ বাংলাদেশে কোনো কিছুই সস্তায় পাওয়া যায় না। এমনকি সবজির পচা অংশ কেটেও বিক্রি করা হয়। সুতরাং নিছক ছুড়ে মারার জন্য ডিম মোটেই সস্তা কোনো খাদ্যপণ্য নয়। কথিত আছে, বাংলাদেশে ডিম রান্নাঘরের বাইরে বেশি ব্যবহার হয় পুলিশের ডিবি কার্যালয়ে। সেই ডিম রাজনীতির মঞ্চেও চলে এসেছে।
আদালতপাড়ায় ডিম ছোড়ার ঘটনা দেখা গিয়েছিল গত বছর, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হাজির হওয়ার সময়। এখন তো নির্বাচন মৌসুম। এ রকম এক সময় দুই দফায় ময়লা পানি ও ডিম নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক ও ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর। এ ঘটনায় এনসিপির ১২ জন আহত হয়েছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, হাতে-মাথায় ব্যান্ডেজ পড়া কর্মীদের ছবিও দেখা গেছে।
রাজনৈতিক নেতাদের ওপর ডিম নিক্ষেপের ঘটনা সারা বিশ্বে অসংখ্য আছে। তবে ডিমের আঘাতে ১২ জন আহত হওয়ার ঘটনা নিঃসন্দেহে বিশ্বের নতুন এক রেকর্ড। আশা করা যায়, ডিমের আঘাতে ভবিষ্যতে কেউ মূর্ছা যাবেন না। সবচেয়ে বড় কথা, গরিব এই দেশে ডিমের মতো প্রয়োজনীয় ও দামি বস্তুর অপচয় করা ঠিকও হবে না।