নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় পাঁচ দফা দাবিতে নারী সংহতির সমাবেশ। স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ২৮ আগস্ট ২০২৬
নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় পাঁচ দফা দাবিতে নারী সংহতির সমাবেশ। স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ২৮ আগস্ট ২০২৬

ঘর থেকে সংসদ পর্যন্ত নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় পাঁচ দফা দাবি নারী সংহতির

ঘর থেকে সংসদ পর্যন্ত নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় জাতীয় সংসদে ৩৩ শতাংশ নারী আইনপ্রণেতা নিশ্চিত করাসহ পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে নারী সংহতি। সংগঠনটির নেতারা বলেছেন, জুলাই অভ্যুত্থানে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকলেও রাজনীতি ও রাষ্ট্র সংস্কারে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাঁদের অংশগ্রহণ এখনো নিশ্চিত হয়নি।

আজ শুক্রবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বরে আয়োজিত এক সমাবেশে এ কথা বলা হয়।

নারী সংহতির পাঁচ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে জাতীয় সংসদে ৩৩ শতাংশ নারী আইনপ্রণেতা নিশ্চিত করা; ২০৩০ সালের মধ্যে সারা দেশে ডে-কেয়ার সেন্টারের চাহিদা পূরণ করা; সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে ৬০ শতাংশ নারী শিক্ষক নেওয়ার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা; ‘বাল্ক প্রকিউরমেন্ট মডেলের’ মাধ্যমে সব বিদ্যালয়ে অর্ধেক দামে স্যানিটারি প্যাড সরবরাহ করা এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংসদে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ আইন পাস করা।

সমাবেশে সূচনা বক্তব্যে নারী সংহতির সভাপতি শ্যামলী শীল বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের পতনে এ দেশের ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে নারীদের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, জুলাই-পরবর্তী রাজনীতি ও রাষ্ট্র সংস্কারে নারীদের এই অসামান্য অবদানের প্রতিফলন এখনো ঘটেনি।

শ্যামলী শীল বলেন, ‘আমরা সংসদে নারীদের জন্য সরাসরি নির্বাচন এবং রাজনৈতিক দলগুলোতে ৩৩ শতাংশ মনোনয়ন নিশ্চিত করার যে দাবি তুলেছিলাম, তা এখনো উপেক্ষিত রয়ে গেছে।’

বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আখতার বলেন, নারী সংহতির মূল দাবি হলো ঘর থেকে সংসদ পর্যন্ত সর্বত্র নারীর নাগরিক অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা। সমাজ ও রাষ্ট্র নারীকে শুধু মা বা বোন হিসেবে পরিচিত করে, কিন্তু নাগরিক হিসেবে নারীর প্রকৃত পরিচয় শুরু হওয়া উচিত ঘরের ভেতর থেকেই।

তাসলিমা আখতার বলেন, দেশের ৫১ শতাংশ ভোটার নারী হলেও সংসদে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব অত্যন্ত কম। নারীরা কোনো রাজনৈতিক দলের ‘অনুগ্রহ’ বা ‘করুণা’ চান না; নাগরিক হিসেবে তাঁরা ন্যায্য মনোনয়ন ও আসন দাবি করেন। নারীদের এই বিশাল ভোটব্যাংককে নিজেদের অধিকার আদায়ে সংগঠিত হতে হবে।

‘ডে-কেয়ারের অভাবে চাকরি ছাড়ছেন নারীরা’

নারী সংহতির সহসাধারণ সম্পাদক রেবেকা নীলা বলেন, বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারিভাবে যে ডে-কেয়ার সুবিধা রয়েছে, তা চাহিদার তুলনায় মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ। প্রতিটি ওয়ার্ডে ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করা সরকারের পক্ষে অসম্ভব কিছু নয়; প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছার।

রেবেকা নীলা বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, সন্তান লালন-পালনের জায়গার অভাবে প্রায় ৭৩ শতাংশ কর্মজীবী নারীকে চাকরি ছেড়ে দিতে হয়। অনেক মধ্যবিত্ত নারী বাধ্য হয়ে শিশুকে ঘরে একা তালাবদ্ধ রেখে অফিসে যান। আবার অনেক শ্রমিক তাঁদের সন্তানদের গ্রামে আত্মীয়দের কাছে রেখে আসেন। এই নিরবচ্ছিন্ন দুশ্চিন্তা নারীর কাজের পরিবেশ ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।

গবেষক মাহিন সুলতান সমাবেশে সংহতি জানিয়ে বলেন, ‘স্বাধীনতার প্রায় ৬০ বছর পার হতে চলেছে, অথচ আমরা এখনো ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণের দাবিতে আটকে আছি। এখন সময় এসেছে দাবি বদলানোর। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিকভাবে এখন সমতার দাবি উঠছে। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ৩৩ শতাংশ নয়, বরং রাষ্ট্রের সব পর্যায়ে ৫০ শতাংশ বা সমান সমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ফারহানা মুনা অভিযোগ করে বলেন, জুলাই আন্দোলনে যেসব নারী অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন, তাঁদের সুপরিকল্পিতভাবে নীতিনির্ধারণী জায়গা থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া বা নতুন ক্ষমতায়ন কাঠামোতে নারীদের অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা হয়নি।