
স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্য অনুযায়ী নির্বাচিতদের মধ্যে বিএনপির কোটিপতি ১৮৯ জন আর জামায়াতে ইসলামীর ৩৮ জন।
শুধু অস্থাবর সম্পদের হিসাবে নির্বাচিতদের মধ্যে কোটিপতি ১৮৪ জন আর স্থাবর সম্পদের মূল্য অনুযায়ী কোটিপতি ১৬৭ জন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ৭৯ দশমিক ৪৬ শতাংশই কোটিপতি। স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্য অনুযায়ী, নির্বাচিত কোটিপতি সংসদ সদস্যের সংখ্যা ২৩৬। তাঁদের মধ্যে শতকোটিপতি রয়েছেন ১৩ জন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
গতকাল সোমবার সকালে রাজধানীর ধানমন্ডির টিআইবি কার্যালয়ে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ও হলফনামাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে টিআইবি। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে থাকা প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পেয়েছে টিআইবি।
টিআইবির প্রতিবেদন বলছে, স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্য অনুযায়ী নির্বাচিতদের মধ্যে বিএনপির কোটিপতি ১৮৯ জন আর জামায়াতে ইসলামীর ৩৮ জন। শুধু অস্থাবর সম্পদের হিসাবে নির্বাচিতদের মধ্যে কোটিপতি ১৮৪ জন আর স্থাবর সম্পদের মূল্য অনুযায়ী কোটিপতি ১৬৭ জন।
টিআইবির তথ্য বলছে, নির্বাচিতদের গড় অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৯ কোটি টাকা। যদিও দ্বাদশ সংসদের চেয়ে এবারের নির্বাচনে নির্বাচিতদের গড় অস্থাবর সম্পদ কমেছে। গত সংসদে নির্বাচিতদের গড় অস্থাবর সম্পদ ছিল প্রায় ২৩ কোটি টাকা। নির্বাচিতদের ২০০ জনই বছরে ১০ লাখ টাকার বেশি আয় করেন। অন্যদিকে কোটি টাকার বেশি বার্ষিক আয় ৪৮ জনের।
কমেছে রাজনীতিবিদদের সংখ্যা
টিআইবির গবেষণা বলছে, এবারের নির্বাচনে নির্বাচিতদের ৬০ শতাংশেরই পেশা ব্যবসা। অন্যদিকে আইন পেশায় রয়েছেন ১১ দশমিক ৮ শতাংশ এবং শিক্ষকতায় রয়েছেন ৮ শতাংশ। টিআইবি বলছে, দ্বাদশ সংসদের তুলনায় এবারের সংসদে ব্যবসায়ীদের সংখ্যা ৫ শতাংশ কমেছে। আর বিগত চারটি সংসদের তুলনায় এবারই সবচেয়ে বেশি শিক্ষক সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। তবে পেশায় রাজনীতিবিদদের সংখ্যা কমেছে।
নির্বাচিত কোটিপতি সংসদ সদস্যের সংখ্যা ২৩৬। তাঁদের মধ্যে শতকোটিপতি রয়েছেন ১৩ জন।
অর্ধেকের বেশি ঋণগ্রস্ত
টিআইবির প্রতিবেদন বলছে, নির্বাচিতদের অর্ধেকেরই ঋণ বা দায় রয়েছে। তাঁদের সম্মিলিত ঋণের মোট পরিমাণ ১১ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা, যা বিগত চারটি সংসদের তুলনায় সর্বোচ্চ। প্রতিবেদনে টিআইবি জানায়, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের মোট দায় বা ঋণ ছিল ১ হাজার ১০৭ কোটি টাকা। দশম সংসদে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা, একাদশ সংসদে ৬ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা এবং দ্বাদশ সংসদে ১০ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। গত চারটি সংসদের চেয়ে এবারই এই সংখ্যা সর্বোচ্চ। দল হিসেবে বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে ৬২ শতাংশ ঋণগ্রস্ত এবং জামায়াতে ইসলামীর ১৬ শতাংশ।
গড় বয়স ৫৯
টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের নির্বাচনে জয়ীদের মধ্যে ২০৯ জনই নতুন, যা মোট আসনের দুই–তৃতীয়াংশ। সম্ভাব্য সংসদ নেতা এবং বিরোধীদলীয় নেতার দুজনই প্রথমবারের মতো সংসদে যাচ্ছেন। আর নির্বাচিতদের গড় বয়স ৫৯ বছর। নির্বাচিতদের মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশই স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও উচ্চ ডিগ্রিধারী। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত।
টিআইবি বলছে, নির্বাচনে বেশিসংখ্যক দলের অংশগ্রহণ দেখানোর প্রচেষ্টা করা হলেও সংসদে নির্বাচিত হয়ে আসা রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ২০০৮ সালের পর থেকে কখনো ৯–এর বেশি ছিল না। এবারও সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবে ৯টি রাজনৈতিক দল। অন্যদিকে কমেছে নারী প্রতিনিধির সংখ্যা। এবারের সংসদে মাত্র ৭ জন নারী প্রতিনিধিত্ব করবেন।
নির্বাচনে অনিয়ম
প্রার্থীদের হলফনামার পাশাপাশি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনেও সার্বিক অনিয়মের বিষয়টিও টিআইবির গবেষণায় উঠে এসেছে। ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে প্রতিনিধিত্বশীল নমুনায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করে দৈবচয়নের ভিত্তিতে ৭০টি আসন বেছে নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছে তারা।
তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ৯৯ শতাংশ প্রার্থীই ৫৮টি আচরণবিধির কোনো না কোনোটি লঙ্ঘন করেছেন। নির্বাচনের দিনও কেন্দ্রগুলোতে স্বতন্ত্র নারী প্রার্থীর ওপর হামলা, কেন্দ্রের বাইরে ভয়ভীতি প্রদর্শন, স্বতন্ত্র প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া, কিছু কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এজেন্টদের ঢুকতে না দেওয়া, বানোয়াট নিয়মের অজুহাতে ভোটারদের হেনস্তা করা, একজনের ভোট অন্যজনের প্রদান ও ভোটের সময় টাকা বিতরণের মতো ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া ভোটার তালিকার সঙ্গে নাম ও ছবি না মেলায় অনেক ভোটার কেন্দ্রে গেলেও ভোট দিতে পারেননি।
সহিংসতা
নির্বাচন–পরবর্তী সহিংসতার বিষয়ে টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাদের পর্যবেক্ষণে থাকা ৭০ আসনে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ৪৫টি; প্রতিপক্ষের ভোটার, কর্মী ও সমর্থকদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটেছে ৩৪টি; বাড়িঘর ও অফিসে হামলা হয়েছে ১৮টি এবং একই দলের বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ১৬টি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৭০টি আসনের মধ্যে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ আসনে এক বা একাধিক জাল ভোট দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক
সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনের সার্বিক পর্যবেক্ষণে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, শুরুতে তুলনামূলক সুস্থ প্রতিযোগিতার লক্ষণ দেখা গেলেও, ক্রমে রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীরা সহিংসতাপূর্ণ নির্বাচনী কার্যক্রমের পুরোনো রাজনৈতিক চর্চা বজায় রেখেছেন। ফলে নির্বাচনে দল ও জোটের মধ্যে সংঘাত, আন্তদলীয় কোন্দল, ক্ষমতার জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং সহিংসতা ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও অব্যাহত ছিল। নির্বাচনী সহিংসতার পাশাপাশি পতিত কর্তৃত্ববাদী শক্তির ঘোষিত নির্বাচনবিরোধী তৎপরতার ফলে অস্থিতিশীলতা এবং ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ বিরাজ করেছে।
তবে ইফতেখারুজ্জামানের দৃষ্টিতে নির্বাচন গ্রহণযোগ্যমাত্রায় অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই নির্বাচনে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’–এর কোনো উপাদান দেখা যায়নি। নির্বাচন মোটামুটিভাবে গ্রহণযোগ্য, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদন তুলে ধরেন টিআইবির জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো মো. মাহফুজুল হক ও পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।