
আওয়ামী লীগের শাসনকালে গত ১৫-১৬ বছরে দেশের প্রতিটি খাত ধ্বংস হয়ে গেছে মন্তব্য করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশ নতুনভাবে সামনে এগোতে চায়। বাংলাদেশের মানুষ ভালো পরিবর্তন চায়। যে পরিবর্তনে মানুষের সমস্যা সমাধান হবে, নিরাপত্তা বাড়বে, তরুণদের কর্মসংস্থান হবে, শিক্ষার্থীদের ন্যায্য সুযোগ তৈরি হবে।
নির্বাচনের প্রচার শুরুর দ্বিতীয় দিনে গতকাল শুক্রবার রাতে রাজধানীর ভাষানটেকের বিআরবি ময়দানে নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন তারেক রহমান। তিনি আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসনে প্রার্থী হয়েছেন। ভাষানটেক এই আসনের অন্তর্ভুক্ত।
অতীত সরকার জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ায় জনগণের সমস্যার সমাধান না হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ‘ষড়যন্ত্রের নির্বাচনে যাঁরা এমপি হয়েছিলেন, তাঁরা কি আপনাদের পাশে ছিলেন?’ জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার ছাড়া সমস্যার সমাধান অসম্ভব, বলেন তিনি।
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব তুলে ধরে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, গণতান্ত্রিক সরকার ছাড়া মানুষের সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। মানুষ যদি নিজের ভোটে প্রতিনিধি না বেছে নিতে পারে, তাহলে কার কাছে সমস্যা নিয়ে যাবে?
তারেক রহমান জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, জনপ্রতিনিধি মানে জনগণের সেবক। তাঁরা জনগণের কাছে যাবেন, সমস্যা শুনবেন, সমাধানের উদ্যোগ নেবেন-এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সরাসরি কথা বলে এলাকার সমস্যার কথা জানতে চাইলেন তারেক রহমান। তিনি বস্তিবাসীদের পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তাসহ সামগ্রিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি ধানের শীষ প্রতীকে ভোট চেয়ে বলেন, ধানের শীষেই উন্নয়ন।
তারেক রহমান বলেন, ‘আমি আপনাদেরই সন্তান। এই এলাকায় বড় হয়েছি। তাই এই এলাকার মানুষের দুঃখ-কষ্ট, প্রত্যাশা ও সমস্যার দায় আমি নিতেই চাই। সুযোগ পেলে ইনশা আল্লাহ এসব সমস্যার সমাধান করব।’
তারেক রহমানের জনসভায় অংশ নিতে দুপুরের পর থেকেই ভাষানটেক ও আশপাশের এলাকা থেকে বিএনপির নেতা-কর্মী, সমর্থকেরা বিআরবি ময়দানে জড়ো হতে থাকেন। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে তারেক রহমান মঞ্চে উঠলে উপস্থিত নেতা-কর্মীরা করতালি ও স্লোগানে তাঁকে স্বাগত জানান।
মঞ্চে উঠে বক্তব্য শুরু করার আগে দর্শকসারিতে থাকা কয়েকজনকে কাছে ডাকেন তারেক রহমান। তাঁদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা শোনার মধ্য দিয়ে তিনি এলাকার সমস্যা সম্পর্কে ভোটারদের কাছ থেকেই জানতে চান।
ভাষানটেকের ভ্যানচালক মো. জুয়েলকে সামনে এনে তারেক রহমান জানতে চান, এলাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা কী? জুয়েল বলেন, ‘আমাদের থাকার জায়গা নাই। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা চাই।’
এরপর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হেনা আক্তার বলেন, ‘আমাদের পাশেই ক্যান্টনমেন্ট এলাকা—সুশৃঙ্খল ও সুন্দর। কিন্তু ভাষানটেক খুব অনুন্নত। আমরা চাই, এই এলাকার উন্নয়ন হোক।’
লিলি নামের এক বস্তিবাসী নারী বলেন, ‘আমাদের কিছুই নাই। পুনর্বাসন চাই, ফ্যামিলি কার্ড চাই।’ শান্তা নামের আরেকজন বলেন, নারীদের কর্মসংস্থানের কোনো সুযোগ নেই।
সমস্যা ও প্রত্যাশাগুলো শুনে তারেক রহমান বলেন, ‘আপনারা যেসব সমস্যার কথা বলেছেন—পুনর্বাসন, ফ্যামিলি কার্ড, কর্মসংস্থান—ইনশা আল্লাহ, বিএনপি সরকার গঠন করলে এগুলো আমরা অগ্রাধিকার দিয়ে সমাধান করব।’
অতীতের আন্দোলন-সংগ্রামের কথা স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, স্বৈরাচারের পতন হয়েছে। এবার দেশের প্রতিটি খাতকে পুনর্গঠন করতে হবে। সে দায়িত্ব জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারই নিতে পারে।
আসছে নির্বাচনে বিএনপিকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘জনগণ যতবার ধানের শীষকে ভোট দিয়েছে, ততবারই দেশের উন্নয়ন হয়েছে। আপনারা আমাকে আপনাদের এলাকার সন্তান হিসেবে ধানের শীষে ভোট দিন। আপনাদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, যাঁরা সারা দেশে ছড়িয়ে আছেন, তাঁদের অনুরোধ করুন, ১২ তারিখে ধানের শীষকে ভোট দিতে।’
দেশের তরুণসমাজের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন, পেশাগত প্রশিক্ষণ ও বিদেশে দক্ষ কর্মী হিসেবে পাঠানোর পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘বহু তরুণ-তরুণী কর্মহীন। আমরা চাই, তাঁদের প্রশিক্ষিত করতে, যাতে তাঁরা দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেন।’
খেলাধুলার উন্নয়নেও বড় ধরনের রূপকল্পের কথা বলেন তিনি। মঞ্চে উপস্থিত সাবেক ফুটবলার ও বিএনপি নেতা আমিনুল হককে দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘সবাই তো আর ইঞ্জিনিয়ার-ডাক্তার হবে না। অনেক ছেলে-মেয়ে খেলোয়াড় হতে চায়। আমরা ক্রীড়াব্যবস্থা এমনভাবে সাজাতে চাই, যাতে তারা পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে জীবিকা অর্জন করতে পারে।’
নারীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রত্যেকটি মা-বোনের হাতে আমরা ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেব।’
গ্রাম থেকে আসা কৃষিশ্রমিক ও কৃষকদের জন্য ‘কৃষি কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, এ কার্ডের মাধ্যমে কৃষক সহজে কৃষিঋণ, কৃষি বিমা ও সার-বীজের সব ধরনের সুবিধা পাবে।
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন ভাসানটেক থানা বিএনপির আহ্বায়ক কাদের মাহবুব। বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক নজরুল ইসলাম খান, ঢাকা-১৭ আসনের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক আবদুস সালাম, যুগ্ম সমন্বয়ক ফরহাদ হালিম ডোনার, বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমিনুল হক, সদস্যসচিব মোস্তফা জামানসহ বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন।