বিএনপি সরকার গঠন করলে যখন চার কোটি পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তখন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান এক নির্বাচনী জনসভায় বলেছেন, ‘ভাই, আমাদের কাছে কোনো কার্ড নেই। আপনারা সবাই ভাইবোনেরা আমাদের কার্ড। আপনাদের বুকে আমরা একটা ভালোবাসার কার্ড চাই। আপনাদের সমর্থন, দোয়া ও ভালোবাসা দিয়ে আগামী দিনে বেকার এবং দায়-দয়ামুক্ত একটা বাংলাদেশ আমরা গড়তে চাই।’
গতকাল শুক্রবার দুপুরে পঞ্চগড়ের ঐতিহাসিক চিনিকল মাঠে ১০-দলীয় ঐক্যের নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে শফিকুর রহমান এ কথা বলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা শুরুর দ্বিতীয় দিনে পঞ্চগড়ের পর গতকাল বিকেলে দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ে আয়োজিত জনসভায় বক্তব্য দেন জামায়াতের আমির। সন্ধ্যায় তিনি যোগ দেন রংপুরের জনসভায়।
দিনাজপুরের গোর-এ-শহীদ বড় ময়দানের জনসভায় সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘বড় উচ্চ মূল্যে কেনা আজকের এই বাংলাদেশ। মেহেরবানি করে জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদদের প্রতি সম্মান দেখান সবাই। আগামী নির্বাচনে কেউ সন্ত্রাস করবেন না, নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় কেউ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চেষ্টা করবেন না।’ প্রশাসনের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘দেশের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ বিবেচনা করে মেহেরবানি করে দায়িত্ব নিরপেক্ষভাবে পালন করুন। আপনারা কারও পক্ষ নেবেন না।’
জেলা সদরে আয়োজিত এসব জনসভায় বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়ন থেকে উৎসবের আমেজ নিয়ে যোগ দেন জামায়াতসহ ১০–দলীয় ঐক্যের নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা। জনসভাগুলোতে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-তে ভোট প্রার্থনা করেন জামায়াতের আমির। পাশাপাশি প্রতিটি জেলার ১০–দলীয় ঐক্যের সংসদ সদস্য প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে তাঁদের পক্ষে ভোট চান।
পঞ্চগড়ের জনসভায় জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, ‘মানুষ আওয়াজ দেয়, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। ওই টেকনাফের উন্নয়নের জোয়ার আর আসতে পারে না তেঁতুলিয়া পর্যন্ত। আমরা এটা উল্টাইয়া দেব। বলব, তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ। এত দিন টেকনাফ থেকে উন্নয়ন হয়েছে, এখন ব্যালান্স (ভারসাম্য) হওয়া দরকার। এখন হবে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ। আপনারা মন খারাপ করবেন না তো?’
শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা এই উত্তরবঙ্গের চেহারা, মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে বলতে চাই, বদলে দেওয়ার জন্য পাঁচটি বছর যথেষ্ট হবে। এখন যেমন আপনারা আমাদের ভালোবাসা দিচ্ছেন, কখনো পাশে এসে, একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমরা যদি কাজ করি, উত্তরবঙ্গের চেহারা বদলে যাবে, ইনশা আল্লাহ। এই মাটি উর্বর, মানুষ পরিশ্রমী। এই এলাকা পেছনে থাকার প্রশ্নই ওঠে না।’
১৮ কোটি মানুষের ৬৪ জেলার কোথাও মেডিক্যাল কলেজবিহীন থাকবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেন জামায়াতের আমির। এরপর তিনি বলেন, ‘বলবেন এত টাকা কোথায় পাবেন? ওই যে চুরি করে আমাদের ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে নিয়ে গেছে, ওগুলো ওদের পেটের ভেতরে হাত ঢোকাইয়া আমরা বের করে আনব, ইনশা আল্লাহ। আর আগামী দিনে কাউকে আর চুরি করতে দেওয়া হবে না।’
জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১০–দলীয় ঐক্য সরকার গঠন করলে দেশে নারীদের অবস্থান কী হবে—সে বিষয়ে দিনাজপুরের জনসভায় কথা বলেন শফিকুর রহমান। ‘আমাদের জীবনের চেয়ে আমাদের মায়েদের সম্মানের মূল্য আমাদের কাছে অনেক বেশি’ উল্লেখ করে জামায়াতের আমির বলেন, ‘আমরা কথা দিচ্ছি, হে বাংলাদেশ, আমরা তোমাদের এমন একটা মায়ের জাতি উপহার দেব ইনশা আল্লাহ, যাঁরা ঘরে, যাতায়াতে এবং কর্মস্থলে পূর্ণ মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে দেশ গড়ার কাজে অবদান রাখবেন। সেখানে তাঁরা সম্পূর্ণ নিরাপত্তা এবং সম্পূর্ণ সম্মানের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন। আমরা তাঁদের মাথার তাজ হিসেবে মাথায় তুলে রাখব। একদল দুর্বৃত্ত বলে, আমরা যদি দেশ পরিচালনার সুযোগ পাই, সরকার গঠন করি, মা-বোনদের আমরা ঘরে বন্দী রাখব। যারা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রতি আজকের নারী সমাজের সমর্থন দেখে ভীতসন্ত্রস্ত, তারাই এসব কথা বলে।’
এই সোনার বাংলাদেশে আর কাউকে দুর্নীতি করতে দেওয়া হবে না বলে দিনাজপুরের জনসভায় হুঁশিয়ারি দেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা ঘোষণা করেছি, চাঁদা আমরা নিই না এবং কোনো চাঁদাবাজকে আমরা চাঁদা নিতে দেব না। যারা নেয় না, তারাই কথা বলতে পারবে। যারা নেয়, তারা এই কথা বলার সাহস রাখে না। আমরা বলেছি সব ধরনের দুর্নীতি বন্ধ হবে। দুর্নীতি আমরা তো করবই না, করার প্রশ্নই ওঠে না।’
জামায়াতের আমির আরও বলেন, ‘আমরা ওই বাংলাদেশ করতে চাই, যেখানে বিচার অর্থের বিনিময়ে কেনা যায় না। যেখানে বিচার গরিব, ধনী, শিক্ষিত, স্বল্পশিক্ষিত কিংবা শিক্ষার আলোবঞ্চিত সবার জন্য সমান হবে। ওই বাংলাদেশ চাই, যেখানে ধর্মে ধর্মে আর কোনো সংঘাত হবে না; বরং একই বাগানের বিভিন্ন জাতের গাছ হিসেবে আমরা পরস্পর সহাবস্থান করব সম্মান এবং ভালোবাসা নিয়ে।’
একা বাংলাদেশ গড়তে পারবেন না, ঐক্যবদ্ধ জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেই গড়তে হবে বলে ঠাকুরগাঁওয়ের জনসভায় মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা ঘোষণা করছি আল্লাহ আমাদের সফলতা দিলে, কাউকে বাদ দিব না। আমরা সকলকেই বলব, আসেন মিলেমিশে বাংলাদেশ গড়ে তুলি।’
ভোটের মাধ্যমে সরকার গঠনের সুযোগ পেলে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সবাইকে অন্তত পাঁচটা বছর এক হয়ে দেশ চালানোর আহ্বান জানাবেন বলে রংপুরের জনসভায় মন্তব্য করেন জামায়াতের আমির। তবে এ জন্য তিনি তিনটি শর্তের কথাও বলেন। তিনি প্রথম শর্ত দেন, নিজেরা কোনো দুর্নীতি করবেন না এবং কোনো দুর্নীতিবাজকে বগলের নিচে আশ্রয় দেবেন না। দ্বিতীয় শর্ত হিসেবে সমাজের সব মানুষের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কথা বলেন, যেখানে ন্যায়বিচারকে প্রভাবিত করার দুঃসাহস কেউ দেখাবেন না। রাজনৈতিক প্রভাব খাটাতে পারবেন না।
তিন নম্বর শর্তে শফিকুর রহমান ‘৫৪ বছরের বস্তাপচা’ রাজনীতির কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা ওই বস্তা পচা রাজনীতি আর চাই না। যেই রাজনীতি তার নেতা–নেত্রীকে চোর বানায়, লুটেরা বানায়, সন্ত্রাসী বানায়, ফ্যাসিস্ট বানায়, ওই রাজনীতি আর আমরা দেখতে চাই না।’
প্রতিটি জনসভাতেই উত্তরাঞ্চলের কৃষি নিয়ে কথা বলেন জামায়াতের আমির। তিনি গোটা উত্তরবঙ্গকে কৃষিভিত্তিক শিল্পের রাজধানী বানানোর প্রতিশ্রুতি দেন। এ জন্য কৃষিকে আধুনিকায়ন, উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ ও জায়গায় জায়গায় সংরক্ষণাগার তৈরিসহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দেন। উত্তরবঙ্গে আর কোনো বেকারের মুখ দেখতে চান না উল্লেখ করে তিনি সবার কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার কথাও বলেন।
আজ শনিবার সকালে জামায়াতের আমির জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করবেন। এরপর সকাল ১০টায় তিনি গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ীতে আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেবেন। এরপর তাঁর বগুড়ায় নির্বাচনী জনসভায় যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।