
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেছেন, জামায়াতে ইসলামীর আমিরের এক্সে পোস্ট দেওয়া এবং অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়ে যাওয়া দাবি করা নিয়ে সংগত কারণেই প্রশ্ন ওঠে, নারীবিদ্বেষী পোস্টের প্রায় ৯ ঘণ্টা পর সমালোচনার মুখে, দিবাগত রাত ১টার দিকে (১২টা ৪০ মিনিট) আইডি হ্যাকের দাবি কতটা যৌক্তিক?
আজ রোববার দুপুরে রাজধানীর গুলশানে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন এ কথা বলেন।
বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, ‘আমরা সবাই জানি, কোনো গুরুত্বপূর্ণ বা ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলে প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো দ্রুততম সময়ে জনগণকে অবহিত করা, যাতে বিভ্রান্তি না ছড়ায় এবং সবাই সতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু এখানে দেখা গেল, জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পর হঠাৎ করে হ্যাকের দাবি তোলা হয়েছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এই দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্য? এমনকি উক্ত সময়ের মধ্যে জামায়াত আমিরের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে অনেক পোস্ট করা হয়েছে, যার মধ্যে আমরা তাঁর এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার কোনো পোস্ট দেখতে পাইনি।’
মাহদী আমিন আরও বলেন, ‘পরবর্তী সময় আমরা লক্ষ করি, তাঁরা গভীর রাতে তথা রাত ৩টা ৩০ মিনিটে হাতিরঝিল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গিয়েছেন। সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে তাঁরা বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিটে অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার বিষয়টি জানতে পেরেছেন। যদি তা–ই হয়ে থাকে, তবে প্রায় ১২ ঘণ্টা পরে কেন জিডি করা হলো? এই বিলম্বের আদৌ কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা আছে কী? তা ছাড়া হ্যাক হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই অ্যাকাউন্ট ফিরে পাওয়ার দাবিটিই–বা কতটা বিশ্বাসযোগ্য?’
মাহদী আমিন বলেন, ‘আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, আমরা সর্বদা নারীদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, সম্মান ও সম–অধিকারের পক্ষে। এই ধরনের ভাষা ও মানসিকতা কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এটা প্রকাশ্যেই নারীবিদ্বেষী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ।’
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করেছি যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান, তাঁর ভেরিফায়েড এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেল থেকে নারীদের উদ্দেশ করে যে নোংরা, জঘন্য ও অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করেছেন বলে দেশব্যাপী যে আলোচনা চলছে, সেটি সঠিক হলে এর মাধ্যমে পুরো সমাজব্যবস্থাকে মধ্যযুগীয় অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার প্রচেষ্টা করা হয়েছে বলে মনে করি।’
মাহদী আমিন আরও বলেন, ‘তিনি (জামায়াত আমির) তাঁর এক্স (টুইটার) অ্যাকাউন্টের পোস্টে গতকাল তথা ৩১ জানুয়ারি বিকেল ৪টা ৩৭ মিনিটে যা লিখেছেন তার একটি অংশ অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, “আমরা বিশ্বাস করি যে যখন মহিলাদের আধুনিকতার নামে ঘর থেকে বের করা হয়, তখন তারা শোষণ, নৈতিক অবক্ষয় এবং নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হয় এটি অন্য কোনো রূপে পতিতাবৃত্তির মতোই।”’ মাহদী আমিন বলেন, ‘এর আগেও আল–জাজিরার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে নারীদের ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে জামায়াতের আমির নেতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন।’
এর আগেও জামায়াতের একজন নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বোনদের উদ্দেশ করে ঠিক একই অশালীন শব্দ ব্যবহার করেছিলেন বলে উল্লেখ করেন মাহদী। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি, এই দলের প্রধান প্রকাশ্যে নারীদের জন্য কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনার মতো পশ্চাৎপদ বক্তব্য দিয়েছেন। উল্লেখ্য যে দল মুখে মুখে ইনসাফ কায়েমের কথা বলে বেড়ায়, সেই দলটি একটি আসনেও কোনো নারীকে সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়নি। এই বিষয়টি নিশ্চয়ই নারীদের প্রতি তাদের হীন মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ।’ তিনি আরও বলেন, `জামায়াত দলের একজন সদস্য টক শোতে নারীদের সংসদে যাওয়াকে তাচ্ছিল্য করে ‘ট্রফির’ সঙ্গে তুলনা করেছেন।'
মাহদী আমিন প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘আমরা দেখলাম, এই দলটি প্রকাশ্যে বারবার ঘোষণা দিয়েছে, তাদের দলের প্রধান পদে কোনো নারী কখনোই আসতে পারবে না। অথচ তাদের নারীরাই বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষের এনআইডি কার্ড ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করছে। এটাই কি তাদের তথাকথিত ইনসাফ?’
তারেক রহমানের এই উপদেষ্টা বলেন, এই দলের সঙ্গে নির্বাচনী জোটে যুক্ত থাকার কারণেই জোটভুক্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বহু নারী নেত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকেই প্রকাশ্যে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। বিভিন্ন আসনে বিএনপির নারী প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারে নামলে তাঁদের অনলাইন, অফলাইনে নানাভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মাহদী আমিন বলেন, `বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নারী সদস্যরা, বিশেষ করে আমাদের ছাত্রদলের বোনেরা, সাইবার স্পেসে যে সীমাহীন, বর্বর ও মধ্যযুগীয় বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন, তা যেকোনো সচেতন মানুষকে আতঙ্কিত করবে। এসব অপপ্রচারে জড়িত আইডিগুলোর দিকে তাকালেই স্পষ্ট বোঝা যায়, এগুলো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর পরিকল্পিত কর্মকাণ্ড।'
মাহদী আমিন পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা তুলে ধরেন। মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় নারীদের ভূমিকা তুলে ধরেন তিনি। তিনি আরও বলেন, ‘স্কুলে যে নারী শিশুদের শিক্ষা দিচ্ছেন, হাসপাতালে যে নারী ডাক্তার ও নার্স হিসেবে মানুষের জীবন বাঁচাচ্ছেন, পুলিশ হিসেবে যে নারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করছেন, আইনজীবী হিসেবে যে নারী বিপন্ন মানুষকে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন, যে নারী বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিজেদের নিয়োজিত রাখছেন, যে নারী প্রশাসনে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আছেন, যে নারী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন, যে নারী সাংবাদিক হিসেবে গণমাধ্যমে কাজ করছেন, কিংবা যে নারীরা বিভিন্ন খেলাধুলায় দেশের হয়ে লড়ছেন, ভাবা যায়, এই সব কর্মজীবী নারীদের বিষয়ে জামায়াতের কী অপমানজনক অবস্থান!’
মাহদী আমিন বলেন, মায়ের মতোই দেশ কিংবা দেশই তো আমাদের মা। তাঁদের ওপরে আর কোনো অন্যায়,অবিচার, নিপীড়ন, নির্যাতন বিএনপি মেনে নেবে না।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না, স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সিনিয়র সহসভাপতি ইয়াসীন আলী প্রমুখ।