
প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বৈধ বা অবৈধ ঘোষণার ক্ষেত্রে ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) পক্ষপাতিত্ব করছে বলে অভিযোগ করেছে জামায়াতে ইসলামী।
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে জামায়াতের প্রতিনিধিদলের বৈঠক শেষে আজ রোববার রাত আটটার দিকে সংবাদ ব্রিফিংয়ে এই অভিযোগ করে জামায়াত।
ব্রিফিংয়ে জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বৈধ বা অবৈধ ঘোষণার ক্ষেত্রে ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব—এ দুটি প্রধান বিষয়কে বিবেচনায় নিয়েছে ইসি। তবে একই ধরনের ঘটনায় কারও মনোনয়নপত্র বাতিল করা হচ্ছে আর কারও বৈধ ঘোষণা করা হচ্ছে। এটি ইসির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
এর আগে সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে দলটির একটি প্রতিনিধি দল প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করে। প্রতিনিধি দলে আরও ছিলেন জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান।
এ সময় উপদেষ্টাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত, শিল্প, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ এবং সড়ক ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান।
বৈঠকের বিষয়ে ব্রিফিংয়ে আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে বলে আশা করে জামায়াত। তবে এরই মধ্যে কিছু ভিন্ন চিত্র দেখা যাওয়ায় প্রতিকারের জন্য প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে জামায়াত।
আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ঋণখেলাপিদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু কিছু জায়গায় নির্বাচন কমিশনের ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। আর দ্বৈত নাগরিকত্বের ব্যাপারেও একই জায়গায় প্রাথমিক বাছাইয়ে কাউকে বৈধ, কাউকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
কোনো দলের নাম না নিয়ে জামায়াতের এই নায়েবে আমির বলেন, ‘আমরা শুনতে পাচ্ছি কোনো একটি দলের পক্ষ থেকে ইলেকশন কমিশনে গিয়ে চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। যাতে করে এ সমস্ত ত্রুটির কারণে যাদের নমিনেশন (মনোনয়নপত্র) বাতিল হিসেবে গণ্য হওয়ার কথা, সেটা যেন করা না হয়। আমরা খুব স্পষ্টভাবে আজ বলতে চাই যে, কোনো ধরনের চাপে নতি স্বীকার না করে যে দলেরই হোক, এমনকি জামায়াতে ইসলামীরও যদি হয়, তাহলে আরপিওর যে নিয়ম আছে, সেই নিয়মের ভিত্তিতে যেন বৈধ এবং অবৈধ বিষয়টিকে ফয়সালা করা হয়।’
তাহের আরও বলেন, মনোনয়নপত্র বৈধ বা অবৈধ ঘোষণার ক্ষেত্রে আরপিওর বিধান মানা না হলে নির্বাচন কমিশন দুর্বল এবং তাদের মাধ্যমে নির্বাচন শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকবে। অথবা এই কমিশন কোনো একটি দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করছে, এমনটি প্রতীয়মান হবে। এর ফলে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য মানুষের মাঝে সংশয় ও হতাশা দেখা দিতে পারে।
ব্রিফিংয়ে জামায়াত নেতা তাহের বলেন, মাঠপর্যায়ে কোনো কোনো এসপি, ডিসির আচরণে পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকা লক্ষ করা যাচ্ছে। জামায়াত তাদের তালিকা করেছে। তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তাদের বিষয়ে ইসিকে মৌখিকভাবে বলা হয়েছে। ইসি যথাযথ ভূমিকা না নিলে প্রধান উপদেষ্টা যেন এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেন।
সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ তাহের বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা জামায়াতকে আশ্বস্ত করেছেন, প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে সিসিটিভি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে।’
ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রের ভেতরে সেনাসদস্যরা থাকলে সাধারণ মানুষের গোপনীয়তা লঙ্ঘন হবে এবং তাঁদের মধ্যে একধরনের ভয়ভীতি তৈরি হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তাহের। তিনি বলেন, ‘শুধু সেনাবাহিনী নয়; পুলিশ, র্যাব, আনসার কাউকেই ভোটকেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশের অধিকার দেওয়া ঠিক হবে না। প্রধান উপদেষ্টা জামায়াত নেতাদের আশ্বস্ত করেছেন, এমনটি হবে না।’
জামায়াতের এই নেতা আরও বলেন, ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ পুরোপুরি নিশ্চিত করা উচিত ছিল নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার দিনই। তবে এরই মধ্যে কিছু ব্যত্যয় ঘটার বিষয়ে জানেন না প্রধান উপদেষ্টা। তাঁর না জানার পেছনে যেসব লোক রয়েছে, তাঁদের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টাকে ব্যবস্থা নিতে হবে।
ডাকসু নির্বাচনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে উল্লেখ করে সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ তাহের বলেন, ‘জাতীয়ভাবে জামায়াত ম্যান্ডেট পেলে একইভাবে সারা দেশে ইতিবাচক পরিবর্তন হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘একজন তো বলছেন, আই হ্যাভ আ প্ল্যান, আর আমি বলতে চাই, উই হ্যাভ আ লট অব প্ল্যান’।
বিএনপির ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড দেওয়ার ঘোষণাকে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন ও সুস্পষ্ট ধোঁকাবাজি বলে উল্লেখ করেছেন এই জামায়াত নেতা। তিনি বলেন, প্রধান উপদেষ্টাকে জামায়াত বলেছে, এমন কাজ করা অবৈধ। প্রধান নির্বাচন কমিশনারকেও বলা হয়েছিল, এটা থামানোর ব্যবস্থা করতে হবে। নইলে এটি এলাকায় এলাকায় মারামারির সূচনা করবে।
গত দুই-তিন সপ্তাহ ধরে কোনো একটি দলের প্রধানকে নিয়ে সরকার বাড়াবাড়ি করছে বলে মন্তব্য করেন সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। তিনি বলেন, তাঁকে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ও প্রটোকল দেওয়া হচ্ছে। এটি নির্বাচনী মাঠে সব দলের প্রতি সমতল ভূমিকাকে লঙ্ঘন করছে। কাউকে অধিক নিরাপত্তা দিলে জামায়াতের আপত্তি নেই, তবে অন্যতম প্রধান দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর আমিরের সঙ্গেও সম আচরণ করতে হবে। তা করা না হলে জাতি এই নির্বাচন কমিশনকে পক্ষপাতিত্বের দোষে দোষী বলে সাব্যস্ত করবে।