
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছয়জনকে প্রার্থী করেছে বিএনপি।
সিপিবি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে ১৭ জনকে প্রার্থী করেছে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজনকে মনোনয়ন দিয়েছে জামায়াত।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৭৭ শতাংশ প্রার্থী উচ্চশিক্ষিত। তাঁদের কেউ স্নাতক, কেউবা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। পিএইচডি করেছেন এমন প্রার্থীও রয়েছেন।
পেশার দিক থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের মধ্যে ৩৪ শতাংশই ব্যবসায়ী। এরপর ১৬ শতাংশ প্রার্থী আইন পেশায় নিয়োজিত আছেন। নির্বাচন কমিশনে (ইসি) জমা দেওয়া প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
এবারের নির্বাচনে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে বিভিন্ন দলের ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৭৯ জন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যালঘু প্রার্থী দিয়েছে সিপিবি, ১৭ জন।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছয়জনকে এবার প্রার্থী করেছে বিএনপি। প্রথমবারের মতো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজনকে মনোনয়ন দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজনকে প্রার্থী করেছে।
নিবন্ধিত ৬০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ২২টি দল এবারের নির্বাচনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। সব মিলিয়ে দলীয় প্রার্থী ৬৭ জন। এর বাইরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন ১২ জন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৭৯ প্রার্থীর মধ্যে নারী ১০ জন, যা মোট প্রার্থীর ১২ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
এর আগে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু প্রার্থী ছিলেন ৭৯ জন। তাঁদের মধ্যে ৫ জন নারী ছিলেন। আর ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থী ছিলেন ৮১ জন।
নিবন্ধিত ৬০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ২২টি দল এবারের নির্বাচনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। সব মিলিয়ে দলীয় প্রার্থী ৬৭ জন। এর বাইরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন ১২ জন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৭৯ প্রার্থীর মধ্যে নারী ১০ জন, যা মোট প্রার্থীর ১২ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি থেকে মনোনয়ন পাওয়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছয় প্রার্থীর মধ্যে পাঁচজনই উচ্চশিক্ষিত। তাঁরা হলেন ঢাকা–৩ আসনের গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, মাগুরা–২ আসনের নিতাই রায় চৌধুরী, বাগেরহাট–১ আসনের কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল, বাগেরহাট–৪ আসনের সোম নাথ দে ও রাঙামাটি আসনের দীপেন দেওয়ান। দলটির আরেক প্রার্থী বান্দরবান আসনের সাচিং প্রু এইচএসসি পাস।
বাগেরহাট-৪ আসনের বিএনপির প্রার্থী সোম নাথ দে গত মঙ্গলবার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর মাঠের অবস্থা ভালো। জয়ের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা দেখছেন না তিনি।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের মধ্যে মাধ্যমিক বা এইচএসসি পাস পাঁচজন। তাঁদের মধ্যে খুলনা–১ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী এসএসসি পাস।
উচ্চমাধ্যমিক বা এইচএসসি পাস প্রার্থী রয়েছেন ছয়জন। তাঁদের মধ্যে মৌলভীবাজার–৪ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী প্রীতম দাশ এইচএসসি পাস। এ ছাড়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের মধ্যে দুজন অষ্টম শ্রেণি পাস ও চারজন স্বশিক্ষিত।
ইসির ওয়েবসাইটে প্রার্থীদের যে হলফনামা রয়েছে, তাতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পাঁচজনের শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। বাকি ৭৪ জন প্রার্থীর মধ্যে ৫৭ জনই উচ্চ শিক্ষিত, যার হার ৭৭ শতাংশ।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের অন্যতম সভাপতি নির্মল রোজারিও প্রথম আলোকে বলেন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৭৭ শতাংশ প্রার্থী উচ্চশিক্ষিত, যা ইতিবাচক। উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিরা রাজনীতিতে এলে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন হওয়ার সুযোগ থাকে।
ইসির ওয়েবসাইটে প্রার্থীদের যে হলফনামা রয়েছে, তাতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পাঁচজনের শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। বাকি ৭৪ জন প্রার্থীর মধ্যে ৫৭ জনই উচ্চ শিক্ষিত, যার হার ৭৭ শতাংশ।
হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের মধ্যে ‘রাজনীতি’কে পেশা হিসেবে উল্লেখ করেছেন মাত্র চারজন। তাঁরা হলেন মাগুরা–১ আসনে বাসদের প্রার্থী শম্পা বসু, ঢাকা–১২ আসনে সিপিবির প্রার্থী কল্লোল বনিক, নোয়াখালী–৪ আসনে বাসদ (মার্ক্সবাদী) মনোনীত প্রার্থী বিটুল চন্দ্র তালুকদার ও চট্টগ্রাম–১১ আসনে বাসদ (মার্ক্সবাদী) মনোনীত প্রার্থী দীপা মজুমদার।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের তিনজন প্রার্থী বলেছেন, তাঁদের পেশা ‘টিউশনি’। তিনজনই বাসদ (মার্ক্সবাদী) দলের প্রার্থী। তাঁরা হলেন রংপুর–৪ আসনের প্রগতি বর্মণ, গাইবান্ধা–১ আসনের পরমানন্দ দাস ও সিলেট–১ আসনের সঞ্জয় কান্ত দাস।
একজন প্রার্থী বলেছেন, তাঁর পেশা ‘কণ্ঠশিল্পী’। তাঁর নাম চম্পা রানী সরকার। তিনি নেত্রকোনা-৪ আসন থেকে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছয়জন প্রার্থী তাঁদের পেশা হিসেবে কৃষির কথা উল্লেখ করেছেন।
চারজন প্রার্থী পেশা হিসেবে উল্লেখ করেছেন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও ব্যাংক কর্মকর্তা। তিনজন প্রার্থীর পেশা শিক্ষকতা। বেসরকারি চাকরিজীবী দুজন, পরামর্শক দুজন এবং পেশা হিসেবে সাংবাদিকতার কথা বলেছেন একজন প্রার্থীর পেশা। অন্যরা অন্যান্য পেশার।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বয়স নিতাই রায় চৌধুরীর। তিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান, নির্বাচন করছেন মাগুরা-২ আসন থেকে।
নিতাই রায় চোধুরী যেদিন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন, সেদিন তাঁর বয়স ছিল ৭৬ বছর ১১ মাস ২২ দিন।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের মধ্যে বয়সের দিক থেকে নিতাই রায়ের পরেই আছেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য। মনোনয়নপত্র দাখিলের দিন তাঁর বয়স ছিল ৭৪ বছর ১ মাস ২৮ দিন। তিনি নির্বাচন করছেন ঢাকা-৩ আসন থেকে।
নিতাই ও গয়েশ্বর আত্মীয়তার দিক থেকে ‘বেয়াই’। তাঁরা দুজনসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের মধ্যে ৭০ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সী প্রার্থী মোট ছয়জন। অন্য চারজন হলেন বান্দরবান আসনের প্রার্থী বিএনপি নেতা সাচিং প্রু, নারায়ণগঞ্জ–৫ আসনে সিপিবির প্রার্থী মন্টু চন্দ্র ঘোষ, খুলনা–৫ আসনের সিপিবির প্রার্থী চিত্ত রঞ্জন গোলদার এবং চট্টগ্রাম–৭ আসনে সিপিবির প্রার্থী প্রমোদ বরন বড়ুয়া।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী নিমাই চন্দ্র রায়। মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় তাঁর বয়স ছিল ৩০ বছর। লালমনিরহাট–২ আসনে তিনি সিপিবির প্রার্থী হিসেবে প্রতিন্দ্বিতা করছেন। স্নাতক করে তিনি কৃষি পেশায় যুক্ত রয়েছেন।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের মধ্যে ৩০ থেকে ৩৯ বছর বয়সী আছেন ১৫ জন। ৪০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী প্রার্থী ৩১ জন। ৫০ থেকে ৫৯ বছর বয়সী ১৭ জন এবং ৬০ থেকে ৬৯ বছর বয়সী প্রার্থী ৮ জন। আরেকজন প্রার্থীর বয়সের বিষয়টি হলফনামায় স্পষ্ট বোঝা যায় না। ইসির ওয়েবসাইটে হলফনামার ওই অংশটুকু কালো হয়ে আছে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের মধ্যে নগদ অর্থ সবচেয়ে বেশি জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দীর। খুলনার দাকোপ ও বটিয়াঘাটা উপজেলা নিয়ে গঠিত খুলনা-১ আসনের এই প্রার্থীর নগদ আছে ১৮ কোটি ৫৩ লাখ ৩৯ হাজার ৯৮৪ টাকা। হলফনামায় তিনি এটিও উল্লেখ করেছেন, ঋণ হিসেবে গ্রহণ করা টাকাও এর মধ্যে রয়েছে।
প্রার্থীদের কার কাছে নগদ অর্থ কত আছে, তা উল্লেখ করতে হয় হলফনামায়। এর পাশাপাশি প্রার্থীর যদি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা করা অর্থ থাকে, তা–ও উল্লেখ করতে হয়।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের মধ্যে নগদ অর্থ সবচেয়ে বেশি জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দীর। খুলনার দাকোপ ও বটিয়াঘাটা উপজেলা নিয়ে গঠিত খুলনা-১ আসনের এই প্রার্থীর নগদ আছে ১৮ কোটি ৫৩ লাখ ৩৯ হাজার ৯৮৪ টাকা। হলফনামায় তিনি এটিও উল্লেখ করেছেন, ঋণ হিসেবে গ্রহণ করা টাকাও এর মধ্যে রয়েছে।
জামায়াতের প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী মঙ্গলবার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর নির্বাচনী প্রচারে প্রতিপক্ষ বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তবে ছোটখাটো এসব বাধা এড়িয়ে জয়ের বিষয়ে তিনি আশাবাদী।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা টাকার দিক থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের মধ্যে কোটিপতি আছেন আরও দুজন। তাঁরা হলেন দীপেন দেওয়ান এবং এস এন তরুন দে।
বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীকে রাঙামাটি আসন থেকে ভোট করছেন দীপেন দেওয়ান। তাঁর কাছে নগদ আছে ১ কোটি ৫৫ লাখ ৪৯ হাজার ১৩৫ টাকা। অন্যদিকে এস এন তরুন দের কাছে নগদ রয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৫ হাজার ৯৩ টাকা। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে ভোট করছেন।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্য প্রার্থীরা নগদ টাকার যে হিসাব হলফনামায় উল্লেখ করেছেন, তাতে কারও কাছে কোটি টাকা নেই। অন্যদিকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমানো টাকা সবচেয়ে বেশি রয়েছে মাদারীপুর-২ আসনের বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির প্রার্থী সুবল চন্দ্র মজুমদারের। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তাঁর জমা আছে ২৯ লাখ টাকা।
টাকা ছাড়া নির্বাচন করা সম্ভব নয়। তবে নির্বাচন করার জন্য কোটিপতি হওয়াও জরুরি নয়। ভক্ত, সমর্থকদের অনেকে পছন্দের প্রার্থীকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করে থাকেন। যাঁরা ভালো মানুষ, ভালো প্রার্থী, তাঁরা যাতে নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারেন, সে জন্য সবার এগিয়ে আসা উচিত।হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের অন্যতম সভাপতি নির্মল রোজারিও
ব্যাংক হিসাবে ১০ লাখ টাকার বেশি রয়েছে আরও দুজন প্রার্থীর। তাঁরা হলেন প্রবীর গোপাল রায় (খুলনা-১ আসন) ও কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল (বাগেরহাট-১ আসন)।
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের অন্যতম সভাপতি নির্মল রোজারিও প্রথম আলোকে বলেন, টাকা ছাড়া নির্বাচন করা সম্ভব নয়। তবে নির্বাচন করার জন্য কোটিপতি হওয়াও জরুরি নয়। ভক্ত, সমর্থকদের অনেকে পছন্দের প্রার্থীকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করে থাকেন। যাঁরা ভালো মানুষ, ভালো প্রার্থী, তাঁরা যাতে নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারেন, সে জন্য সবার এগিয়ে আসা উচিত।