
বাংলাদেশের ইতিহাসের দুই জাতীয় নেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও গত ডিসেম্বরে শহীদ হওয়া ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদির কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার শুরু করল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। আজ বৃহস্পতিবার এই প্রচার শুরু করে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ১০-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যকে বিজয়ী করতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
কবর জিয়ারতের পর জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও শহীদ ওসমান হাদির সমাধিসৌধের সামনে থেকে আজ বেলা পৌনে একটার দিকে ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ শীর্ষক পদযাত্রা বের করে এনসিপি। পদযাত্রাটি শাহবাগ মোড় হয়ে রমনা পার্কের সামনের সড়ক দিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে গিয়ে শেষ হয়।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদের নেতৃত্বে এই পদযাত্রায় ছিলেন দলের মুখ্য সমন্বয়ক ও ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি মনিরা শারমিন, ঢাকা-৯ আসনে দলের প্রার্থী জাবেদ রাসিন, ঢাকা-২০ আসনের প্রার্থী নাবিলা তাসনিদ, জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তারিকুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় নেতা ফরহাদ সোহেলসহ অনেকে।
১০-দলীয় ঐক্যের নেতৃত্ব দেওয়া জামায়াতে ইসলামীর পল্টন থানা শাখার আমির শাহিন আহমেদ খান, শাহবাগ থানা শাখার আমির আহসান হাবিবসহ দলটির কিছু নেতা-কর্মীও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে আজ বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দোয়েল চত্বরের পাশে অবস্থিত তিন নেতার মাজারে যান এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদসহ দলটির কেন্দ্রীয় নেতা ও প্রার্থীরা। সেখানে দুই নেতার কবর জিয়ারতের পর নাহিদ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
নাহিদ বলেন, দুই নেতা, কাজী নজরুল ও শহীদ শরিফ ওসমান হাদির কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে তাঁরা তাঁদের নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করছেন। দুই জাতীয় নেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহারাওয়ার্দীকে স্মরণের মাধ্যমে তাঁদের এই নির্বাচনী যাত্রা শুরু হলো। এই বাংলাদেশের রূপকার ছিলেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। এই বাংলাদেশের অন্যতম স্থপতি ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। জমিদারি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক লড়াই-সংগ্রাম করেছেন। একইভাবে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম করে তাঁরা একটি নতুন বন্দোবস্তের দিকে এগোচ্ছেন। অন্যদিকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এই বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করেছেন। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তাঁরা বাংলাদেশে নতুন করে গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করছেন এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে।
নাহিদ বলেন, ‘আমাদের জুলাই সৈনিক, আমাদের জুলাই সিপাহসালার, আধিপত্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের শহীদ শরিফ ওসমান হাদির কবর জিয়ারতের মাধ্যমে এবারের নির্বাচন যে আমাদের আধিপত্যবাদবিরোধী যাত্রা, আজাদির যাত্রা, সেই যাত্রা আমরা শুরু করছি।...গণভোটে সারা বাংলাদেশের মানুষকে আমরা আহ্বান জানাচ্ছি, গণভোটে আপনারা “হ্যাঁ” ভোট দিন। গণভোটে “হ্যাঁ” ভোটের মাধ্যমে সংস্কারের যাত্রাকে অব্যাহত রাখুন। শরিফ ওসমান হাদি ভাইকে যারা হত্যা করেছে, সেই হত্যাকারীদের বিচার আমাদের আজকের এই নির্বাচনী যাত্রার অন্যতম প্রধান এজেন্ডা। আমরা চাই, নির্বাচনের আগেই এই মামলার অভিযোগপত্র থেকে শুরু করে সব কার্যক্রম যাতে সম্পন্ন হয়। আমরা অবশ্যই এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার এই বাংলার মাটিতে আদায় করে ছাড়ব, ইনশা আল্লাহ। ওসমান হাদির পাশাপাশি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবর জিয়ারত করে এনসিপির নির্বাচনী পদযাত্রা শুরু হবে।’
ঢাকা-৮ আসনে ১০-দলীয় ঐক্যের সমর্থনে এনসিপির প্রার্থী নাসীরুদ্দীন ‘নতুন মাফিয়া ও নতুন জমিদারদের’ বিরুদ্ধে কথা বলে যাচ্ছেন বলে উল্লেখ করেন নাহিদ। তিনি বলেন, ‘আমরা ঢাকা-৮ আসনের এলাকা প্রদক্ষিণ করব। মার্চ ফর জাস্টিস করব।’
সারা বাংলাদেশের মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে নাহিদ বলেন, ‘আপনারা ১০-দলীয় ঐক্যকে বিজয়ী করুন। ১০-দলীয় ঐক্যের মার্কাকে বিজয়ী করুন। এনসিপির সারা দেশে যে ৩০ জন প্রার্থী রয়েছেন, তাঁদের শাপলা কলি মার্কায় বিজয়ী করে সংসদে পাঠান। সংসদে এনসিপি এবং ১০-দলীয় ঐক্য সাধারণ মানুষের কথা বলবে। গণ–অভ্যুত্থান, সংস্কার ও সার্বভৌমত্বের কথা বলবে।’
নির্বাচন কমিশন (ইসি) নিরপেক্ষ আচরণ করছে না বলে অভিযোগ করেন নাহিদ। তিনি বলেন, তারা (ইসি) একটি বিশেষ দলকে বিশেষ ধরনের সুবিধা দিচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ আচরণ দাবি করেন তিনি।
পরে তিন নেতার মাজারের সামনের সড়ক থেকে মিছিল বের করে এনসিপি। মিছিলে ‘গণভোটে হ্যাঁ বলি, জিতবে এবার শাপলা কলি’, ‘গোলামি না আজাদি, আজাদি আজাদি’, ‘১০-দলীয় ঐক্যজোট, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ’, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’ প্রভৃতি স্লোগান দেওয়া হয়।
মিছিলটি দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শাহবাগ এলাকায় জাতীয় কবির সমাধির সামনে গিয়ে শেষ হয়। তখন নাহিদ, নাসীরুদ্দীনসহ এনসিপির একটি প্রতিনিধিদল জাতীয় কবি কাজী নজরুল ও শহীদ ওসমান হাদির কবর জিয়ারত করে।
‘মার্চ ফর জাস্টিসের’ পর ভোট চাইলেন নাহিদ
কবি কাজী নজরুল ও ওসমান হাদির কবর জিয়ারতের পর নাহিদের নেতৃত্বে জাতীয় কবির সমাধির সামনের সড়ক থেকে শুরু হয় এনসিপির ‘মার্চ ফর জাস্টিস’। সেখানে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস, জাস্টিস জাস্টিস’, ‘আমরা সবাই হাদি হব, যুগে যুগে লড়ে যাব’, ‘চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে, লড়তে হবে একসাথে’, ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’ প্রভৃতি স্লোগান দেওয়া হয়।
মিছিলের সামনে মোটরসাইকেলে ছিলেন কিছু তরুণ। তাঁদের পেছনে কয়েকজন মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিক ছিলেন। এরপর ছিলেন নাহিদ ও নাসীরুদ্দীন। তাঁদের পেছনে ছিল মূল মিছিল। মিছিলের সামনের সারিতে ছিলেন এনসিপির নেত্রীরা। মিছিল চলাকালে মাইকে স্লোগান দেওয়া হচ্ছিল।
মিছিলটি বেলা দেড়টার দিকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে নাসীরুদ্দীন দ্রুত ওসমান হাদি হত্যার বিচার দাবি করেন। কোনো ষড়যন্ত্রকারী ও খুনিকে আশ্রয় না দিতে তিনি ভারতের প্রতি আহ্বান জানান। পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’–এর পক্ষে কাজ করতে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানান নাসীরুদ্দীন। নিরাপদ ও সুন্দর ঢাকা-৮ গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
পরে সমাপনী বক্তব্যে নাহিদ বলেন, এনসিপি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার কার্যক্রম শুরু করেছে। ১৬ বছর পরে দেশে নির্বাচন হচ্ছে। মানুষ ভোটাধিকার ফেরত পাচ্ছে শহীদদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে। ১২ ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক নির্বাচনে এনসিপির শাপলা কলি প্রতীকের ৩০ প্রার্থী এবং ১০-দলীয় ঐক্যের সৎ ও দেশপ্রেমিক প্রার্থীদের নির্বাচিত করার আহ্বান জানান নাহিদ।
ঢাকা-৮ আসনে ১০-দলীয় ঐক্য ও এনসিপি–মনোনীত প্রার্থী নাসীরুদ্দীনের জন্য ভোট চান নাহিদ। তিনি বলেন, এই আসনের আনাচকানাচে থাকা মাফিয়াগোষ্ঠীকে নির্মূল করাই নাসীরুদ্দীনের প্রধান এজেন্ডা। ওসমান হাদি হত্যার বিচারের দাবিও তাঁর অন্যতম এজেন্ডা।
নাহিদ বলেন, ‘আমরা নির্বাচনে জিতে সংসদে যাব এবং জনগণকে দেওয়া সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করব।’