বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী

এই প্রথম রাজধানীতে জামায়াত জোটের জয়

রাজধানীর ১৫টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ৭টিতে জয়ী হয়েছেন জামায়াত জোটের প্রার্থীরা।

সাধারণত যখন যে রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করে, সেই দলের প্রার্থীরাই রাজধানীর সংসদীয় আসনগুলোতে জয়ী হন। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত চারটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে এমনটিই দেখা গেছে। এবার তার ব্যতিক্রম দেখা গেল।

কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই–তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিএনপি জয়ী হলেও রাজধানীর আসনগুলোতে জামায়াতে ইসলামী ভালো ফল করেছে। রাজধানীর ১৫টি সংসদীয় আসনের (ঢাকা–৪ থেকে ঢাকা–১৮) মধ্যে জামায়াতের প্রার্থীরা ছয়টিতে জয়ী হয়েছেন। আর জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের ফলাফল বিবেচনায় নিলে আসনসংখ্যা হয় ৭। বাকি আটটি আসনেও হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করেছেন জামায়াতের প্রার্থীরা। এর মধ্য দিয়ে নতুন শক্তি হিসেবে উত্থান হয়েছে জামায়াতের। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত কোনো নির্বাচনেই রাজধানীতে জামায়াতের আসন ছিল না।

জামায়াতের প্রার্থীরা রাজধানীর যে ছয়টি আসনে জয়ী হয়েছেন, সেগুলো হলো ঢাকা-৪ (সৈয়দ জয়নুল আবেদীন), ঢাকা-৫ (মোহাম্মদ কামাল হোসেন), ঢাকা-১২ (সাইফুল আলম খান মিলন), ঢাকা-১৪ (মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান), ঢাকা-১৫ (জামায়াতের আমির মো. শফিকুর রহমান) ও ঢাকা-১৬ (মো. আব্দুল বাতেন)।

এ ছাড়া ঢাকা–১১ আসনে জয়ী হয়েছেন জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী ও এনসিপির আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম।

রাজধানীর বাকি ৮টি আসনে জামায়াত এবং তাদের জোটের প্রার্থীরা ভোটের হিসাবে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন। শুধু রাজধানীতে নয়, দলটির রাজনৈতিক ইতিহাসে এবার সর্বোচ্চ আসন পেয়েছে দলটি। এককভাবে পেয়েছে ৬৮টি আসন, আর জোটগতভাবে তাদের আসন ৭৭টি। স্বাধীনতার পর এই প্রথম সংসদে প্রধান বিরোধী দল হতে যাচ্ছে জামায়াত।

নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য গঠিত হয়। এতে জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), মাওলানা মামুনুল হকের দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, কর্নেল (অব.) অলি আহমদের দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), এবি পার্টিসহ ১১টি দল রয়েছে।

১৯৯১–২০০৮ পর্যন্ত রাজধানীতে আসন ছিল ৮টি

১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ থেকে ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ পর্যন্ত রাজধানীতে সংসদীয় আসন ছিল ৮টি। ১৯৯১ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করে। দুটি নির্বাচনেই রাজধানীর ৮টি আসনেই বিএনপির প্রার্থীরা জয়ী হন। ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। ওই নির্বাচনে রাজধানীর ৮টি আসনের মধ্যে ৭টিতে জয়ী হন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। একটি আসনে জিতেছিল বিএনপি।

২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হলে রাজধানীতে আসন বেড়ে হয় ১৫টি। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা ১৩টি আসনে জয়ী হন। বাকি দুটি আসনেও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রার্থীরা জয়ী হন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, যে রাজনৈতিক দল সরকারে থাকে, তাদের জন্য রাজধানীর আসনগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ক্ষমতাসীন দলকে রাজপথে বিরোধী দলের নানা আন্দোলন মোকাবিলা করতে হয়। রাজধানীর আসনগুলোতে ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যরা থাকলে রাজপথে বাড়তি সুবিধা পাওয়া যায়।

প্রবেশমুখের তিন আসনে জামায়াতের জয়

রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশমুখ যাত্রাবাড়ীসহ আশপাশের এলাকার দুটি সংসদীয় আসনেই (ঢাকা–৪ ও ৫) এবার জয় পেয়েছেন জামায়াতের প্রার্থীরা। এর মধ্যে কদমতলী-শ্যামপুর এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৪৭, ৫১, ৫২, ৫৩, ৫৪, ৫৮, ৫৯, ৬০ ও ৬১ ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা-৪ আসন। অন্যদিকে যাত্রাবাড়ী–শনির আখড়া–ডেমরা–দনিয়া এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা–৫ আসন।

ঢাকা–৪ আসনে জামায়াত নেতা সৈয়দ জয়নুল আবেদীন প্রায় ৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিএনপি প্রার্থী তানভীর আহমেদকে হারিয়েছেন। অন্যদিকে ঢাকা-৫ আসনে জামায়াত নেতা মোহাম্মদ কামাল হোসেন বিএনপির প্রার্থী মো. নবী উল্লাহকে ৯ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছেন।

একইভাবে ঢাকার আরেক প্রবেশমুখ গাবতলী এলাকাতেও (ঢাকা-১৪ আসন) জয়ী হয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান।

উত্তর সিটির আট আসনের পাঁচটিতে জামায়াতের জয়

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত আটটি নির্বাচনী আসনের মধ্যে পাঁচটিতে জয় পেয়েছেন জামায়াত জোটের প্রার্থীরা। আসনগুলো হলো ঢাকা–১১, ১২, ১৪, ১৫ ও ১৬। বাকি তিনটি আসনেও হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করেছেন দলটির প্রার্থীরা।

বাড্ডা, ভাটারা ও রামপুরা থানা নিয়ে গঠিত ঢাকা–১১ আসনে জয়ী হয়েছেন জামায়াত জোটের প্রার্থী ও এনসিপির আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম। তিনি বিএনপির প্রার্থী এম এ কাইয়ুমকে ২ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছেন।

ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও, শেরেবাংলা নগর–হাতিরঝিলের একাংশ নিয়ে গঠিত ঢাকা–১২ আসনেও জিতেছে জামায়াত। এই আসনে দলটির প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন বিএনপি জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হককে ২২ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছেন।

মিরপুরের রূপনগর, শাহ আলী, গাবতলী–কল্যাণপুর এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা–১৪ আসনে জয় পেয়েছেন জামায়াত নেতা মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান। তিনি বিএনপির প্রার্থী সানজিদা ইসলামকে (তুলি) প্রায় ১৮ হাজার ভোটে হারিয়েছেন।

কাফরুল থানা, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়াসহ মিরপুরের কিছু এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা–১৫ আসনে জয়ী হয়েছেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। তিনি বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলামকে ২১ হাজারের বেশি ভোটে পরাজিত করেছেন।

পল্লবী ও রূপনগর (আংশিক) নিয়ে গঠিত ঢাকা–১৬ আসনেও জয় পেয়েছে জামায়াত। দলটির প্রার্থী আবদুল বাতেন প্রায় সাড়ে তিন হাজার ভোটের ব্যবধানে বিএনপির প্রার্থী আমিনুল হককে পরাজিত করেছেন।

রাজধানীতে তিনটি আসনে পাঁচ হাজারের কম ভোটে হেরেছে জামায়াত। আসনগুলো হলো ঢাকা–১০, ১৩, ১৭। এর মধ্যে ঢাকা–১০ আসনে বিএনপি প্রার্থী শেখ রবিউল আলমের কাছে ৩ হাজার ৩০০ ভোটে জামায়াত প্রার্থী শোখ জসীম উদ্দীন সরকার, ঢাকা–১৩ আসনে বিএনপি প্রার্থী ববি হাজ্জাজের কাছে ২ হাজার ৩২০ ভোটে জামায়াত জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক এবং ঢাকা–১৭ আসনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে ৪ হাজার ৩৯৯ ভোটে পরাজিত হয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী স ম খালিদুজ্জামান।

এ ছাড়া রাজধানীর দুটি আসনে ১০ হাজারের কম ভোটে হেরেছেন জামায়াত জোটের দুজন প্রার্থী। আসনগুলো হলো ঢাকা–৭ ও ৮। এর মধ্যে ঢাকা–৭ আসনে বিএনপির প্রার্থী হামিদুর রহমানের কাছে ৭ হাজারের কম ভোটে হেরেছেন জামায়াতের প্রার্থী মো. এনায়েত উল্লা। আর ঢাকা–৮ আসনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাসের কাছে ৬ হাজারের কম ভোটে হেরেছেন জামায়াত জোটের প্রার্থী এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।

অপেক্ষা করতে হবে

রাজধানীতে জামায়াতের বড় জয়ের কারণ সম্পর্কে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, রাজধানীতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ থাকেন। ভিন্ন ভিন্ন চিন্তার মানুষ থাকেন। জামায়াতের প্রার্থীরা রাজধানীর আসনগুলোতে কেন ভালো করলেন, পরিপূর্ণ গবেষণা ছাড়া এটি এখনই বলা মুশকিল।

জামায়াতের উত্থান ভবিষ্যতে রাজধানীর দুটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও প্রভাব ফেলবে কি না, এমন প্রশ্নে মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, এটা পড়তেই পারে। কারণ, যাঁরা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন, তাঁরা আগামী সিটি নির্বাচনেও ভোট দেবেন। তবে সেখানে প্রার্থী কে হবেন, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।

জামায়াতের এই বিজয় রাজধানীতে আন্দোলন–সংগ্রামে কোনো প্রভাব ফেলবে কি না, এ প্রসঙ্গে লেখক–গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েই এখন ছাত্রশিবিরের আধিপত্য। ছাত্র সংসদগুলোতে তাঁরা জিতেছেন। কাজেই বাড়তি চাপ তো থাকবেই। চাপে পড়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে জামায়াতের এই অগ্রযাত্রা বিএনপি ঠেকাতে চেষ্টা করবে কি না। কারণ, এবার নির্বাচনে যে অবস্থা, পরের নির্বাচনে জামায়াত আরও ভালো করবে। সুতরাং এখন বিএনপির কৌশল কী হবে, সেটি দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।