বৈঠকের পর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাদের সঙ্গে ফটোসেশনে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। আজ সোমবার বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায়
বৈঠকের পর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাদের সঙ্গে ফটোসেশনে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। আজ সোমবার বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায়

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ

নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হবে, তা নিয়ে শঙ্কার কথা জানাল এনসিপি

বর্তমান নির্বাচন কমিশন কতটা সুষ্ঠুভাবে ভোট করতে পারবে, তা নিয়ে নিজেদের শঙ্কার কথা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির নেতারা প্রধান উপদেষ্টাকে বলেছেন, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের নিরপেক্ষ আচরণ মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে না। নির্বাচন যদি সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ না হয়, তাহলে এর দায় অন্তর্বর্তী সরকার ও অধ্যাপক ইউনূসের ওপর আসবে।

আজ সোমবার বিকেল পাঁচটা থেকে প্রায় ৫০ মিনিট অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেন এনসিপির নেতারা। প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনায় এ বৈঠক হয়।

বৈঠকে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া, ওই কমিটির সেক্রেটারি মনিরা শারমিন ও আইনি সহায়তাবিষয়ক উপকমিটির প্রধান জহিরুল ইসলাম অংশ নেন।

অন্যদিকে বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ছিলেন সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছেন, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পরিকল্পনা জনগণের সামনে স্পষ্ট করা উচিত।

বৈঠক শেষে যমুনার সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন এনসিপির নেতারা। সেখানে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, গত দু-তিন দিনের যেসব ঘটনা আগামী নির্বাচন এবং সমসাময়িক রাজনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, সেগুলো তুলে ধরেছেন তাঁরা। নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও প্রশাসনের নিরপেক্ষ আচরণ মাঠে দেখা না যাওয়ার বিষয়গুলো তাঁরা প্রধান উপদেষ্টাকে বলেছেন। ইসি যদি পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করে, সেটা নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে এবং নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হবে—এ কথা উল্লেখ করে তাঁরা বলেছেন, নির্বাচন যদি সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ না হয়, তাহলে এর দায় অন্তর্বর্তী সরকার ও অধ্যাপক ইউনূসের ওপর আসবে।

বিএনপির চাপে দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপিদের নির্বাচন করার সুযোগ ইসি করে দিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন নাহিদ। তিনি বলেন, বিএনপি ও দলটির ছাত্রসংগঠন (ছাত্রদল) নির্বাচন কমিশনের সামনে ‘মব’ ও চাপ তৈরি করেছে। বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা নির্বাচন কমিশনে গিয়ে কমিশন রায় (প্রার্থীদের আপিল নিষ্পত্তি) দেওয়ার আগেই রায়কে প্রভাবিত করেছেন।

বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যেও দ্বৈত নাগরিক আছেন উল্লেখ করে নাহিদ বলেন, এটা কোনো দলের বিষয় নয়। আইনের প্রয়োগ যাতে সুষ্ঠু হয়, সবার জন্য সমান হয় এবং সব দলের জন্যই যাতে এটা সমানভাবে প্রযোজ্য থাকে—সেটাই তাঁরা চান।

এনসিপি অভিযোগ করেছে, নির্বাচন কমিশন বিএনপির চাপে দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপিদের নির্বাচন করার সুযোগ করে দিয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের কাছে এনসিপি আবার যাবে জানিয়ে নাহিদ বলেন, দ্বৈত নাগরিকদের অনেকে তথ্য গোপন করেছেন। এখন এই তথ্যগুলো আসছে। এগুলো নিয়ে তাঁরা আদালতে যাবেন। তাঁরা চান না দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপিরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক।

নাহিদ ইসলাম বলেন, নির্বাচন নিয়ে কোনো সংশয় নেই, যদি নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ থাকে। কিন্তু যদি ইঞ্জিনিয়ার্ড (সাজানো) একটা নির্বাচন করার পরিকল্পনা থাকে কারও, সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে এবং সেটা প্রতিহত করা হবে। ২০০৮ সালের মতো কোনো নির্বাচনের যদি পরিকল্পনা থাকে, এটা এবার সফল হবে না। এবার ১৯৯১-এর মতো নির্বাচন হবে।

তারেক রহমানের ‘পরিকল্পনা’ জানতে চান নাহিদ

বিএনপি দায়িত্বশীল আচরণ করছে না উল্লেখ করে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বাংলাদেশে ফেরত এসে বলেছিলেন যে তাঁর একটা পরিকল্পনা আছে। একটা স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনকে চাপ প্রয়োগ করাটা তাঁর পরিকল্পনার অংশ কি না—এ প্রশ্ন জনগণের মনে তৈরি হয়েছে। গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করা, নির্বাচনকে একদিকে হেলে ফেলানো, প্রশাসনকে চাপ প্রয়োগ, নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করা, গণভোটে “না”-এর পক্ষে যাতে ভোট পড়ে, ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের সংসদে নেওয়া—এগুলো তাঁর পরিকল্পনার অংশ কি না, তা নিয়ে আমাদের সবার মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।’

তারেক রহমানের উদ্দেশে নাহিদ বলেন, ‘যদি তাঁর পরিকল্পনা এটা থাকে যে এই নির্বাচন নিরপেক্ষভাবে হবে না, ভোটকেন্দ্র দখল হবে, প্রশাসনে দলীয়করণ হবে, নির্বাচন কমিশনকে চাপ দিয়ে তাঁর নিজের দলের পক্ষে রায় নিয়ে আসা হবে, দেশের জনগণ ও তরুণসমাজ এগুলো মেনে নেবে না। তাঁর পরিকল্পনাটা জনগণের সামনে স্পষ্ট করা উচিত।’

ঢাকা–১১ আসনে এনসিপির প্রার্থী নাহিদ ইসলাম ও ঢাকা–৮ আসনের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগে গত রোববার কারণ দর্শনোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। এ প্রসঙ্গে নাহিদ বলেন, তারেক রহমানের ছবি পুরো ঢাকা শহরে, পুরো বাংলাদেশে ব্যবহৃত হচ্ছে। আরও অনেক প্রার্থীর ছবিও ব্যবহার করা হচ্ছে। তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।

সামগ্রিক পরিস্থিতি উদ্বেগ তৈরি করছে বলেও মন্তব্য করেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। নির্বাচন কমিশনের সামনে ছাত্রদলের অবস্থান কর্মসূচি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের সামনে গিয়ে বসে থাকলে যদি নির্বাচন কমিশন তাদের পক্ষ অবস্থান নেয়, তাহলে আমাদেরও নির্বাচন কমিশনের সামনে অবস্থান নিতে হবে। আমরা সেই দিকে যেতে চাই না। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, কোনো দল বা শক্তির চাপে নির্বাচন কমিশন নতজানু হবে না। যদি এ রকমটা হয়, তাহলে আমাদেরও কমিশনের বিরুদ্ধে বা এ ধরনের আচরণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে।’

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। আজ সোমবার বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায়

নাহিদ ইসলামের আগে যমুনার সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। তিনি নাহিদ ইসলাম ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে রিটার্নিং কর্মকর্তার ‘শোকজ’ করার ঘটনাকে ‘নিয়মবহির্ভূত’ বলে উল্লেখ করেন। সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যমূলক ও পক্ষপাতদুষ্টভাবে এবং মিডিয়া ট্রায়াল করার জন্য এটি করা হয়েছে এমন মন্তব্য করেন তিনি।

এ শোকজ দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রত্যাহার এবং কী কারণে আইনবির্ভূতভাবে এটি করা হলো, সেই ব্যাখ্যা দাবি করেন আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘যদি শুধু ছবি দেওয়াটা আচরণবিধি লঙ্ঘন হয়, তাহলে প্রথমে তারেক রহমানকে শোকজ করতে হবে।’

আইন অমান্য করলে ব্যবস্থা

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে সন্ধ্যায় পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নির্বাচন নিয়ে পর্যবেক্ষণ ও বিভিন্ন উদ্বেগ জানিয়েছেন এনসিপির নেতারা। তাঁরা নির্বাচন–সম্পর্কিত কয়েকটি বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং নির্বাচনে যেন ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ (সবার জন্য সমান সুযোগ) নিশ্চিত হয়, সে ব্যাপারে সরকারকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।

বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, এনসিপির প্রতিনিধিদলকে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, ‘নির্বাচন–সম্পর্কিত যেকোনো অভিযোগ ও পরামর্শ তাৎক্ষণিকভাবে সরকারকে জানাবেন। সরকারের পক্ষ থেকে যে ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সরকার তা নেবে। কেউ যেন আইন অমান্য করতে না পারে, সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এনসিপি নেতাদের বলেছেন, এই নির্বাচনে কোনো পক্ষপাতের সুযোগ নেই। এই নির্বাচন দেশের ভাগ্য নির্ধারণের নির্বাচন, দেশ পাল্টে দেওয়ার নির্বাচন। এ নির্বাচন সুষ্ঠু হতেই হবে।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরকার আইনসম্মতভাবেই প্রচারণা করছে। গণভোটে হ্যাঁ ভোট কেন দেওয়া প্রয়োজন, হ্যাঁ ভোট দিলে কী হবে, সরকার তা জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করছে। তিনি আরও বলেছেন, এবারের নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে হয়, এর দায়িত্ব সরকার, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দলসহ সবার।