পাঁচ সিটিতে সুষ্ঠু ভোটের লক্ষ্য আওয়ামী লীগের

কৃষিমন্ত্রী মো. আব্দুর রাজ্জাক
ফাইল ছবি

আসন্ন পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সরাসরি অংশ নেবে না ধরে নিয়ে পরিকল্পনা আঁটছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। রাজনৈতিক মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ভোটে না থাকলে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই ভোট যাতে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়, সেটি নিশ্চিত করতে চায় আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে জাতীয় নির্বাচনের আগমুহূর্তে বিরোধী দল বিএনপি নির্দলীয় সরকারের দাবিতে তাদের আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে নেওয়ার কথা বলছে। এমন পটভূমিতে পাঁচ সিটির নির্বাচন কোন মডেলে করা হয়, সেদিকেই নজর থাকবে সবার। এই বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে বলে আওয়ামী লীগের নেতাদের অনেকে বলছেন।

ফলে বর্তমান নির্বাচন কমিশন (ইসি) অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট করতে সক্ষম—এটা দেখানোর একটি চেষ্টা থাকবে সরকারের। আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, গাজীপুর, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট—এই পাঁচ সিটির নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করার জন্য তাঁদের দল ইসিকে সর্বাত্মক সহায়তা করার অবস্থান নিয়েছে।

ভোট খুবই সুষ্ঠু হবে। নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করবে। বিএনপি ভোটে অংশ নিলে ভালোই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।
আব্দুর রাজ্জাক আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী

দলটির একাধিক নেতা জানান, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিরোধীদের দাবি কোনোভাবেই মানবে না আওয়ামী লীগ। তবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন যাতে অবাধ ও সুষ্ঠু হয়, সেটা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক মহলও বলে আসছে। এর আগে দুটি জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক আছে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকারব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ের ভোটেও সংঘাত, অনিয়মের অভিযোগ ছিল। এ পরিস্থিতিতে পাঁচ সিটি নির্বাচনে ভালো ভোটের ‘দৃষ্টান্ত’ হিসেবে দেখানোর চিন্তা সরকার এবং আওয়ামী লীগের ভেতরে রয়েছে।

তবে নির্বাচন যা-ই হোক, দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বেশ পরীক্ষায় পড়তে হবে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের অনেক নেতা। বিশেষ করে গাজীপুর ও সিলেট সিটি করপোরেশনে দলীয় প্রার্থী নিয়ে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছে আওয়ামী লীগ। বাকি তিন সিটিতে হয়তো বর্তমান মেয়রকেই পুনরায় দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির ছেড়ে দেওয়া জাতীয় সংসদের আসনের উপনির্বাচনে ভোটারের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। বিএনপি ভোটে না এলে ভোটারের উপস্থিতি কমে যাবে, এটা নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তা আছে আওয়ামী লীগের। কারণ, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোট না হওয়ায় ভোটাররা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, এমন একটি অভিযোগ চলে আসছে অনেক দিন ধরে। এ পরিস্থিতিতে আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে সিটি নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি যাতে বেশি হয়, সেই চিন্তাও থাকবে আওয়ামী লীগের। এ ক্ষেত্রে কাউন্সিলর প্রার্থীর ওপর নির্ভর করতে চায় দলটি। প্রয়োজন হলে কাউন্সিলর পদে দলীয়ভাবে প্রার্থী না দিয়ে উন্মুক্ত করে দেওয়ার পরিকল্পনা আছে।

এর মধ্যে পাঁচ সিটি করপোরেশনে দলের প্রার্থী বাছাইয়ে দলীয় ফরম বিক্রির ঘোষণা দিয়েছে আওয়ামী লীগ। ইসি ঘোষিত তফসিল অনুসারে, আগামী ২৫ মে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ভোট গ্রহণ হবে। খুলনা ও বরিশালে ভোট হবে আগামী ১২ জুন। আর ২১ জুন রাজশাহী ও সিলেটের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

মূল চ্যালেঞ্জ গাজীপুর ও সিলেট

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র জাহাঙ্গীর আলমকে মেয়রের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর সাধারণ ক্ষমার আওতায় পুনরায় দলে ফিরেছেন। তিনি মেয়র পদ পেতেও তৎপর। এখন গাজীপুরে আগামী নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী জাহাঙ্গীর হবেন নাকি নতুন কেউ, এ নিয়ে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে আওয়ামী লীগ।

আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্র বলছে, দলের প্রভাবশালী একটি অংশ জাহাঙ্গীরকে পুনরায় মেয়র পদে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে তৎপর আছে। কিন্তু অন্য অংশের মত হচ্ছে, তিনি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটূক্তি করার পর আবার তাঁকে মেয়র পদে মনোনয়ন দেওয়া হলে ভুল বার্তা যাবে। এ ক্ষেত্রে তারা গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লা খানকে মনোনয়ন দেওয়ার পক্ষে। আজমত উল্লা ২০১৩ সালে বিএনপির প্রার্থী এম এ মান্নানের কাছে হেরে যান। এর পরেরবার জাহাঙ্গীর আলমকে মনোনয়ন দেওয়া হয়।

জাহাঙ্গীর আলম মেয়র পদ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত মেয়র হন প্যানেল মেয়র আসাদুর রহমান (কিরন)। তবে তাঁর ১৫ মাসের দায়িত্ব পালনের সময় নিয়ে দলের উচ্চপর্যায় সন্তুষ্ট নয়। ফলে তাঁর মেয়র পদে মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা কম।

আওয়ামী লীগের একজন কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, বহিষ্কার হওয়ার পর গাজীপুর মহানগরের রাজনীতি জাহাঙ্গীর আলমের হাতে নেই। দল পুরোপুরি আজমত উল্লার নিয়ন্ত্রণে। আবার এলাকায় জাহাঙ্গীরের একটা প্রভাব ও নানামুখী যোগাযোগ রয়েছে।

আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্র বলছে, দল হয়তো আজমত উল্লাকে আরেকবার সুযোগ দেবে। তবে জাহাঙ্গীর আলম স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে দলীয় কোন্দল আবারও মাথাচাড়া দেবে। অর্থাৎ আজমত উল্লা বা জাহাঙ্গীর যাঁকেই প্রার্থী করা হোক না কেন, পূর্ণ শক্তি নিয়ে দল মাঠে নামতে পারবে না। অবশ্য বিএনপি ভোটে অংশ না নিলে সমস্যা হবে না।

গত নির্বাচনে পাঁচ সিটির মধ্যে চারটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়ী হলেও সিলেটে স্বতন্ত্র হিসেবে ভোট করে জয়ী হন বিএনপির আরিফুল হক। প্রয়াত বদর উদ্দিন আহমদ কামরানকে হারিয়ে তিনি টানা দ্বিতীয়বার মেয়র হন।

এবার সিলেটে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে ইচ্ছুক নয়জন নেতা। তবে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী নিয়ে আলোচনা বেশি। তাঁর প্রতি দলের উচ্চপর্যায়ের বিশেষ বিবেচনা আছে। প্রার্থী হতে কয়েক বছর ধরে তৎপর সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ।

আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্র জানায়, সিলেটে প্রবাসী বনাম দেশি প্রার্থী—এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। আনোয়ারুজ্জামানকে ‘অতিথি’ রাজনীতিক মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এ জন্য আনোয়ার ছাড়া স্থানীয় যে কাউকে মনোনয়ন দিলে এক হয়ে কাজ করার বার্তা দিয়েছেন অন্য প্রার্থীরা।

এ পরিস্থিতিতে বিএনপির আরিফুল হক এবারও স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে আওয়ামী লীগের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের নেতারা।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ প্রথম আলোকে বলেন, বড় দলে অনেক প্রার্থী থাকা স্বাভাবিক ঘটনা। তবে জয়ী হতে পারবেন—এমন প্রার্থীকেই দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে। আর দল মনোনয়ন দিলে তাঁকে জয়ী করতে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে থাকবেন।

বাকি তিন সিটিতে প্রার্থী বদলের সম্ভাবনা কম

রাজশাহীর মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনকে পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখছেন না আওয়ামী লীগের নেতারা। কারণ, ইতিমধ্যে তিনি নগর উন্নয়নের মাধ্যমে বেশ শক্ত অবস্থানে আছেন। তিনি আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সভাপতিমণ্ডলীরও সদস্য। জাতীয় রাজনীতিতে তাঁকে আরও বড় দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা না থাকলে তিনিই আবার মেয়র পদে প্রার্থী থাকবেন বলে দলের নেতারা মনে করছেন।

খুলনায় তালুকদার আবদুল খালেক একাধিকবার মেয়র হয়েছেন। সেখানে মনোনয়ন পেতে অন্য কোনো নেতার তেমন কোনো জোরালো তৎপরতা নেই।

আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্র বলছে, বর্তমান মেয়রদের মধ্যে মাঠের জরিপে সবচেয়ে পিছিয়ে বরিশালের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। সেখানে দলীয় কোন্দলও প্রকট। বরিশাল সদর আসনের সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীমের সঙ্গে মেয়রের দ্বন্দ্ব বরিশালের সর্বস্তরে আলোচিত। প্রয়াত মেয়র শওকত হোসেনের (হিরণ) অনুসারীদের কেউ কেউ ভেতরে-ভেতরে সাদিক আবদুল্লাহর বিপক্ষে।

এ ছাড়া সাদিক আবদুল্লাহর আপন চাচা আবুল খায়ের আবদুল্লাহ ওরফে খোকন সেরনিয়াবাত মেয়র পদে প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন। তাঁর দলীয় পদ নেই। তবে তাঁর প্রতি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিশেষ সহানুভূতি আছে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যার সময় তাঁর ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত ও তাঁর পরিবারের বেশ কয়েকজন হত্যার শিকার হন।

তবে পুরো বরিশাল বিভাগে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে প্রভাব রয়েছে বঙ্গবন্ধুর আত্মীয় আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর। ফলে তাঁর ছেলে সাদিক আবদুল্লাহর সম্ভাবনা বেশি দেখছেন দলের নেতারা।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিটি নির্বাচনেই দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা সম্ভাব্য প্রার্থীদের জরিপ করে থাকেন। প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে জনপ্রিয়তা ও দলে গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনা করা হয়। এবারও এর ব্যতিক্রম হবে না।

পাঁচ সিটির ভোট কেমন হবে জানতে চাইলে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ভোট খুবই সুষ্ঠু হবে। নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করবে। বিএনপি ভোটে অংশ নিলে ভালোই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।