
স্থানীয় নির্বাচনের তোড়জোড় শুরুর আগেই বিভিন্ন সিটি করপোরেশনে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করে বসে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তা রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি করে কৌতূহল। প্রশ্ন আসে, এনসিপি কি তবে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটে থাকছে না? এর মধ্যে জামায়াতও স্থানীয় সরকার নির্বাচন এককভাবে করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে শুরু করেছে।
তাহলে এনসিপি কী করবে—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দলটির নেতাদের কাছ থেকে জানা গেল, দুই ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে তারা। আপাতত এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি গুছিয়ে রাখছে তারা। জোট গঠনের সিদ্ধান্ত হলে তা হবে নির্বাচনের আগে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে হবে, সে বিষয়ে সরকারের চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি। তবে এ বছরের শেষ দিকে তা শুরু হবে বলে ৫ মে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।
জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য থেকে গড়ে ওঠা দল এনসিপি গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্য থেকে। ৩০টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ৬টি আসনে জয় পায় দলটি। এ ছাড়া ১৭টি আসনে এনসিপির প্রার্থীরা দ্বিতীয় হন, অর্থাৎ জয়ী হওয়া বিএনপির প্রার্থীদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী।
এনসিপি নেতাদের একটি অংশ মনে করেন, এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার মতো প্রত্যাশিত সাংগঠনিক শক্তি এখনো অর্জন করতে পারেননি তাঁরা। আরেক অংশের মত, এককভাবে নির্বাচনে গেলে নিজেদের সক্ষমতা ও দুর্বলতার জায়গাগুলো চিহ্নিত করে এগোতে পারবে এনসিপি।
জেন–জি প্রজন্মের দলটির আশাজাগানো উন্মেষের অনুবাদ ভোটের মাঠে হয়নি, যা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার মধ্যেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য এককভাবে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে দলটি।
গত ২৯ মার্চ ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনসহ দেশের পাঁচটি সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করে এনসিপি। বাকি সিটিগুলোতেও শিগগিরই প্রার্থী ঘোষণার কথা জানান দলটির নেতারা। এরপর ১০ মে ১০০ উপজেলা-পৌরসভায় চেয়ারম্যান ও মেয়র পদে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। আগামী ২০ মে আরও ১০০ উপজেলা-পৌরসভায় তাদের প্রার্থী ঘোষণার কথা রয়েছে।
দলটির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, আগেভাগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রার্থী ঘোষণার পেছনে প্রধান কারণ হলো নিজেদের প্রস্তুতি এগিয়ে রাখা। এ ছাড়া আগেভাগে প্রার্থী ঘোষণার পেছনে প্রার্থীদের আগেই জনগণের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং তাঁদের কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট এলাকায় সংগঠন গোছানোর বিষয়ও রয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত যেভাবে আগেভাগে প্রার্থী ঘোষণা করে সুবিধা পেয়েছে, এনসিপিও সেই সুবিধা পেতে চায়।
শেষ পর্যন্ত যদি জোট না হয়, তখন যাতে এনসিপি এককভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করতে পারে, সে জন্য প্রস্তুতি এগিয়ে রাখা হচ্ছে বলে দলটির নেতাদের ভাষ্য।
এনসিপির ছয়জনের সংসদ সদস্য হওয়ার পেছনে জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি ও সমর্থনের পাশাপাশি জামায়াতের ভোটব্যাংকও ভূমিকা রেখেছে বলে দলটির নীতিনির্ধারকেরা মনে করেন। তবে তাঁরা এটাও দাবি করেন, জামায়াতসহ ১১ দলের অন্য মিত্ররাও নির্বাচনে এনসিপির সমর্থনের ‘সুবিধা’ পেয়েছেন।
এনসিপি নেতাদের অনেকেই জোটগতভাবেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। তাঁদের মূল্যায়ন হচ্ছে, এনসিপি এখনো এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার মতো প্রত্যাশিত সাংগঠনিক শক্তি অর্জন করতে পারেনি।
আবার একটি অংশ এককভাবে নির্বাচনের পক্ষপাতী। তাঁদের মত হলো, এককভাবে নির্বাচনে গেলে নিজেদের সক্ষমতা ও দুর্বলতার জায়গাগুলো চিহ্নিত করে এগোতে পারবে এনসিপি।
জোটগতভাবে নির্বাচন হবে নাকি এককভাবে হবে, সেই সিদ্ধান্ত হবে নির্বাচনের আগে। কিন্তু আমরা জোটের আশায় বা জোট হবে কি না—এই দ্বিধা নিয়ে বসে থাকতে পারি না। আমরা এককভাবে আমাদের প্রস্তুতি এগিয়ে রাখছি।আরিফুল ইসলাম আদীব, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক, এনসিপি
এনসিপি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মেয়র প্রার্থী হিসেবে দলীয় মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার নাম ঘোষণা করেছে। ঢাকা উত্তরে এনসিপির মেয়র প্রার্থী হবেন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ও মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব।
এ ছাড়া কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তারিকুল ইসলাম, রাজশাহী সিটি করপোরেশনে মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক মো. মোবাশ্বের আলী এবং সিলেট সিটি করপোরেশনে মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক আবদুর রহমান আফজালকে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণে আসিফ মাহমুদকে নিয়ে জামায়াতের আপত্তির কথা দলটির নেতাদের সূত্রে জানা গেছে। জামায়াত সেখানে প্রার্থী হিসেবে ডাকসুর ভিপি মো. আবু সাদিককে চূড়ান্ত করেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের এই দুই ছাত্রনেতার ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা চলছে।
এই সিটির প্রার্থিতাকে কেন্দ্র করে জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির টানাপোড়েন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোট না হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে বলে এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের একজন নেতা এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন।
স্থানীয় নির্বাচনের বিষয়ে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব প্রথম আলোকে বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির জন্য এনসিপি পর্যাপ্ত সময় পায়নি। দলের সাংগঠনিক ভিত্তিও তখন সব জায়গায় প্রত্যাশিত মাত্রায় শক্তিশালী ছিল না। সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা স্থানীয় নির্বাচনের ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু করেছি।’
তবে জোটগতভাবে নির্বাচনের সম্ভাবনাও যে রয়েছে, সেই ইঙ্গিতও দিয়ে রেখে আদীব বলেন, ‘জোটগতভাবে নির্বাচন হবে নাকি এককভাবে হবে, সেই সিদ্ধান্ত হবে নির্বাচনের আগে। কিন্তু আমরা জোটের আশায় বা জোট হবে কি না—এই দ্বিধা নিয়ে বসে থাকতে পারি না। আমরা এককভাবে আমাদের প্রস্তুতি এগিয়ে রাখছি।’
দল সম্প্রসারণে নজর আওয়ামী লীগেও
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রার্থী ঘোষণার পাশাপাশি দল সম্প্রসারণের উদ্যোগও নিয়েছে এনসিপি। এ বিষয়টিও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত। বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা–কর্মী, এমনকি আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) যেসব নেতা–কর্মী অপরাধে জড়িত নন, তাঁদেরও দলে টানতে চাইছে এনসিপি। তাঁদের মধ্যে সাংগঠনিকভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের স্থানীয় সরকারে প্রার্থী করারও চিন্তা আছে দলটির।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রার্থী ঘোষণার পাশাপাশি দল সম্প্রসারণের উদ্যোগও নিয়েছে এনসিপি। এ বিষয়টিও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত। বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী, এমনকি আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) যেসব নেতা-কর্মী অপরাধে জড়িত নন, তাঁদেরও দলে টানতে চাইছে দলটি।
১০ মে দেশের ১০০ উপজেলা–পৌরসভায় প্রার্থী ঘোষণার সময় এনসিপির স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান সারজিস আলম বলেন, ‘অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের পরিশ্রমী ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি, যাঁরা কখনো মানুষের ওপর নিপীড়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না, যাঁদের সঙ্গে ফ্যাসিস্টদের সরাসরি সম্পৃক্ততা বা তাদের ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল না, তাঁরা অন্য যেকোনো রাজনৈতিক দলেরই হোন না কেন, তাঁরা এনসিপির প্রার্থী হওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন।’
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর দল সম্প্রসারণের এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত ১৯ এপ্রিল এবি পার্টি, আপ বাংলাদেশ ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৪৪ নেতা-কর্মীর এনসিপিতে যোগদানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই প্রক্রিয়া। এরপর ২৪ এপ্রিল বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা ইসহাক সরকার, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নাতনি ফেরসামিন হক ইকবালসহ কয়েকজন এনসিপিতে যোগ দেন।
৫ মে আনুষ্ঠানিকভাবে এনসিপিতে যোগ দেন জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে মোহাম্মদ নাদিমুর রহমান, হাজী শরীয়তুল্লাহর বংশধর আবদুল্লাহ মোহাম্মদ হোসাইন ও অধ্যাপক এম এ এইচ আরিফ। সর্বশেষ ৮ মে গণ অধিকার পরিষদসহ বিভিন্ন দল–সংগঠনের নেতা-কর্মী ও বিভিন্ন পেশায় থাকা ৩৬ ব্যক্তি যোগ দেন এনসিপিতে।
দল সম্প্রসারণের মাধ্যমে তৃণমূলে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি সম্পর্কে একটি ইতিবাচক বার্তা যাচ্ছে বলে এনসিপির নেতারা মনে করেন। অন্যতম একজন শীর্ষ নেতার ভাষ্য, সংসদে এনসিপি তৃতীয় বৃহত্তম দল। এখন গুরুত্বপূর্ণ অনেক ব্যক্তি দলে যোগ দিচ্ছেন। আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির যোগদানের আলোচনা চলছে। তাঁদের মধ্যে এমন ব্যক্তিও আছেন, যাঁর যোগদানে রীতিমতো হইচই পড়ে যাবে। অনেকে নির্বাচনের আগে যোগ দিতে পারেন। সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এনসিপি সুবিধাজনক অবস্থায় চলে যাবে। এর ফলে সারা দেশে দলের সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি হয়ে যাবে।
এনসিপি নেতা আরিফুল ইসলাম এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির অনেক সম্মানিত মানুষের পাশাপাশি অন্যান্য দলের অনেকে এনসিপিতে ইতিমধ্যে যোগ দিয়েছেন, অনেকের যোগদানের আলোচনা চলছে। সব মিলিয়ে আমরা সাংগঠনিক পুনর্গঠন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি এগিয়ে রাখছি।’