বঙ্গীয় সমাজ ও সংস্কৃতিতে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ পুরুষদেবতা হিসেবে শিব সবচেয়ে জনপ্রিয় দেবতা। এহেন এই দেবতার পুজো সারাবছরে বারো বার হলেও ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণা ত্রয়োদশী ও চতুর্দশী রাতেই সনাতনী বঙ্গসমাজ মেতে ওঠে শিবরাত্রিতে। তারা এই তিথিটিকেই পবিত্রতম মনে করে।
এই তিথি উপলক্ষে দুটি জনশ্রুতি আছে। একটি হল, এই দিনটিতেই শিব লিঙ্গরূপে প্রথম প্রকাশিত হন বলে তাঁকে পূজা করা হয়। দ্বিতীয়টি, এই তিথিতে শিব ও পার্বতীর বিবাহ হয়েছিল।
কথিত আছে, শিব নাকি পাবর্তীকে নিজেই এই তিথি পালনের সপক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন যে এটি পালন করলে সব পাপ থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে মোক্ষলাভ সম্ভব।
ইতিহাস বলে, শিব ও শক্তির মিলিত রূপের প্রতীক হচ্ছে গৌরীপট্ট এবং শিবলিঙ্গ। এই দুইয়ের মিলিত রূপের যৌথ আরাধনার চল হরাপ্পা সংস্কৃতির কাল থেকে।
ইতিহাস বলে, শিব ও শক্তির মিলিত রূপের প্রতীক হচ্ছে গৌরীপট্ট এবং শিবলিঙ্গ। এই দুইয়ের মিলিত রূপের যৌথ আরাধনার চল হরাপ্পা সংস্কৃতির কাল থেকে। শিবরাত্রি উপলক্ষে এই গৌরীপট্ট ও শিবলিঙ্গের উপর জল বা দুধ ঢালার রীতি আদিম যৌনপ্রতীক পূজার একটি সামাজিক প্রবাহমান উপাচার।
কুমারী মেয়েরা এদিন শিবলিঙ্গ প্রতীকে জল বা দুধ ঢেলে শিবের মতো উদার স্বামী প্রার্থনা করে থাকে। শিবপুরাণ, পদ্মপুরাণ, স্কন্দপুরাণ, মৎসপুরাণ, বায়ুপুরাণ প্রভৃতি বিভিন্ন পুরাণে এই সমস্ত কাহিনি বিধৃত রয়েছে।
শিবের মাথায় জল বা দুধ ঢালার সপক্ষে একটি কিংবদন্তির চল দেখা যায় জনসমাজে। কাহিনিটি এমন— সারাদিন ধরে শিকারের খোঁজে ঘুরতে ঘুরতে লুব্ধক নামের ক্লান্ত এক ব্যাধ পবিত্র বেলগাছের উপরে উঠে রাত কাটানোর ব্যবস্থা করে।
তখন গাছের পাতা থেকে শিশিরের ফোঁটা নীচে মাটিতে পোঁতা শিবরূপী পাথরখণ্ডের উপর পড়লে শিবের বরে ব্যাধ মহাপুণ্যবান বলে গণ্য হয়। সেই ব্যাধ যখন মারা যায় যমদূত তাকে নিতে এলে শিবের অনুচররা যমদূতের সঙ্গে তুমুল লড়াই করে তাকে স্বর্গে শিবের কাছে নিয়ে যায়। সেই থেকে শিব ব্যাধের উপাস্য দেবতারূপে পূজিত হন।
আসলে প্রাচীনকালে বৃক্ষ, প্রস্তর, পশু প্রভৃতির ভিতর চেতনাময় সত্তারূপে দেবতাকে কল্পনা করা হত। শিবকে সনাতন ধর্মের বঙ্গসমাজ বড়ো কাছের বলে মনে করে এসেছে।
অনেকে আবার বিশ্বাস করেন যে, এই পবিত্র রাতে মহাদেব শিব তাঁর তাণ্ডব নৃত্যে সৃষ্টির, স্থিতির এবং লয়ের মহামহিম তত্ত্ব প্রকাশ করেছিলেন। তাই শুধুমাত্র ভক্তির মাধ্যমে ধর্মীয় আচার পালনই শিবরাত্রি পালনের মুখ্য উদ্দেশ্য নয়, এটি ভক্তির সঙ্গে জড়িত এক গভীর সমাজতাত্ত্বিক দার্শনিক উপলব্ধিরও দিন বটে।
আসলে প্রাচীনকালে বৃক্ষ, প্রস্তর, পশু প্রভৃতির ভিতর চেতনাময় সত্তারূপে দেবতাকে কল্পনা করা হত। শিবকে সনাতন ধর্মের বঙ্গসমাজ বড়ো কাছের বলে মনে করে এসেছে।
কখনো তিনি চাষি ঘরে ধান বোনেন, কখনো নেশাখোর হিসেবে শ্মশানে শ্মশানে ঘুরে বেড়ান, কখনো হিমালয়বাসী হয়ে স্ত্রী-পুত্র-কন্যাসহ সংসার করেন। শিবের চাহিদা বড়োই স্বল্প। তিনি অল্পে তুষ্ট।
এমন একজন সাধারণ উদাসীন দেবতাকেই স্বাভাবিকভাবে কুমারীরা স্বামী হিসেবে চাইবে। তাই বঙ্গে ‘’শিবের মতো স্বামী’ একটি প্রবাদ বাক্য এবং ঘরে ঘরে শিবরাত্রি পালনের এতটা ঘটা। পুরাণের এই পৌরাণিক প্রথা আজ আধুনিক যুগে এসেও ততটা জনপ্রিয়।
শিব সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে শুধু তপস্যারই প্রতীক নয়। তাঁকে সংযম এবং বৈরাগ্যের প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়ে থাকে। শিবের পৌরাণিক আদলকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তাঁর কণ্ঠজুড়ে সাপ, মাথায় চুলের জটায় গঙ্গা, সারা শরীর জুড়ে ছাই-ভস্ম সবই সংসার জীবনের মোহজাল থেকে মুক্ত এক অনাসক্ত প্রতিভুকে।
শিবরাত্রির জাগরণে ও উপবাসে সেই অনাসক্তির সাধনাকেই বরণ করে নেওয়া হয়। শিবের ভক্তরা দিনভর উপবাস করে পার্বণটি পালন করেন এবং সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের পর শিবলিঙ্গে জল, দুধ, বেলপাতা নিবেদনের পর ‘ওঁ নমঃ শিবায়’ মন্ত্রোচ্চারণ করেন।
গ্রামবাংলায় প্রাচীন অশ্বত্থ বা বটমূলে প্রস্তরখণ্ডকে শিবরূপে পূজা করার চল রয়েছে। নগরকেন্দ্রিক সভ্যতার বিকাশেও এক চিত্র লক্ষ্য করা যায়। শিবের মন্দিরকে কেন্দ্র করে মেলা বসে।
অনেক স্থানে ভক্তরা রাত্রি জেগে কীর্তন ও শিবের বন্দনায় মেতে ওঠেন।
দার্শনিকরা বলে থাকেন, এই বাহ্যিক জাগ্রত ভাব অন্তরের অজ্ঞানতার অন্ধকার ঘুচিয়ে আত্মজাগরণের এক অসাধারণ পর্ব। শাস্ত্রে যদিও বলা আছে, শিবরাত্রির ব্রত পালনের মধ্যে দিয়ে মনকে শুদ্ধ করা হয়, পাপক্ষয় করা হয় এবং জীবনে শান্তির বাতাবরণ সৃষ্টি করা সহজ হয়। শিবের আরেক নাম ‘ভোলানাথ’।
তাই শিবরাত্রির আত্মসংযম, সহিষ্ণুতা ও অন্তর্দৃষ্টিতে আত্মভোলা আরাধনাই মূলমন্ত্র।
গ্রামবাংলায় প্রাচীন অশ্বত্থ বা বটমূলে প্রস্তরখণ্ডকে শিবরূপে পূজা করার চল রয়েছে। নগরকেন্দ্রিক সভ্যতার বিকাশেও এক চিত্র লক্ষ্য করা যায়। শিবের মন্দিরকে কেন্দ্র করে মেলা বসে। সাধুসন্ন্যাসীরা এসে যোগ দেন।
শিবের বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গের কাহিনী ভক্তসমাগমে আলোচিত হয়। ভক্তরা ছাড়াও আশেপাশের অঞ্চল থেকে আসা সববয়সী সবধর্মের ও সবজাতের মানুষজন এসে মেলাকে মহামিলন ক্ষেত্রে পরিণত করে। মানুষের এই মিলনের মধ্যে দিয়ে এর সামাজিক মূল্য বিকশিত হতে থাকে।