বিবেকানন্দের মূর্তি, রামকৃষ্ণ মিশন বিবেকানন্দ এডুকেশনাল এন্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট, বেলুড় মঠ, হাওড়া
বিবেকানন্দের মূর্তি, রামকৃষ্ণ মিশন বিবেকানন্দ এডুকেশনাল এন্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট, বেলুড় মঠ, হাওড়া

শুভ জন্ম

গুরুভক্ত সাধক স্বামী বিবেকানন্দ

ঈশ্বর দর্শনের তীব্র আকাঙ্ক্ষায় ব্যাকুল এক তরুণ দক্ষিণেশ্বরে গিয়ে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কি ঈশ্বর দর্শন করেছেন?’

ঠাকুর হেসে বললেন, ‘আমি ঈশ্বর দর্শন করেছি। এই ঠিক তোকে যেমন চোখের সামনে দেখছি—তার চেয়েও অনেক স্পষ্টভাবে দেখেছি। তুই দেখতে চাস? তোকেও দেখাতে পারি, যদি আমি যেমন বলি তেমন আচরণ করিস।’

ঈশ্বরকে দেখতে পাবে শুনে তরুণটির প্রাণ খুশিতে ভরে উঠলেও পরক্ষণেই তাঁর মনে সন্দেহ দেখা দিল। ঈশ্বর দর্শনের তীব্র আকাঙ্ক্ষায় তিনি বিভিন্ন ধর্মীয় সভায় যাচ্ছেন, তাবড় তাবড় পণ্ডিতদের বক্তৃতা শুনছেন।

যখনই কোনো ধর্মপ্রচারক ধর্ম বা ঈশ্বর সম্বন্ধে বক্তৃতা করছেন, বক্তাকে জিজ্ঞেস করছেন, ‘আপনি ঈশ্বরকে দেখেছেন?’ এই অদ্ভুত প্রশ্ন শুনে কোনো বক্তা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ কোনটাই বলতে পারতেন না; বরং বিভিন্ন প্রবোধ বাক্যে তাঁকে তৃপ্ত করতে চাইতেন।

অনেক চেষ্টা ও অনুসন্ধান করেও তাঁদের মধ্যে ঈশ্বরকে দেখেছেন—এমন একজনেরও সন্ধান পেলেন না। আর তিনি বলেন কিনা ঈশ্বরকে দেখেছেন। লোকটা আধপাগল নন তো! ঈশ্বর দর্শনের জন্য এই লোকের পায়ে নিজেকে সমর্পণ করে তাঁকে কঠোর সাধনা করতে হবে! কিন্তু তা কি করে সম্ভব!

যখনই কোনো ধর্মপ্রচারক ধর্ম বা ঈশ্বর সম্বন্ধে বক্তৃতা করছেন, বক্তাকে জিজ্ঞেস করছেন, ‘আপনি ঈশ্বরকে দেখেছেন?’ এই অদ্ভুত প্রশ্ন শুনে কোনো বক্তা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ কোনটাই বলতে পারতেন না।

মহাকালের অমোঘ নির্দেশে প্রায়-নিরক্ষর ও সামান্য পূজারি ব্রাহ্মণ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবের পদতলে বসেই তরুণটিকে শিক্ষা নিতে হলো। সেদিনের সেই দার্শনিক তার্কিক, সাকারোপাসনা ও মূর্তিপূজার ঘোরতর বিরোধী, প্রতীচ্যের মুক্তিবাদে দীক্ষিত ঔদ্ধত্য তরুণটি মহাবিস্ময়ের সঙ্গে নিজের অন্তরের সব সংশয়, সন্দেহ ও বিরুদ্ধ ভাব পরিত্যাগ করে হয়ে উঠলেন ‘গুরুভক্ত সাধক’।

জগতের কল্যাণের জন্য নিজেকে গুরুর চরণে সঁপে দিয়ে হলেন তাঁর শিষ্য ও চিরদাস। গুরুর আশীর্বাদ ও অনুগ্রহে চলতে শুরু করলেন এক মহাবিকাশের পথে, যা তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত চলমান ছিল এবং যার সীমাহীন বিশালতার সম্মুখে আমাদের শির আপনা থেকেই নত হয়ে আসে।

এই তরুণটি হলেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবের আদরের নরেন, সবার স্বামী বিবেকানন্দ। পরবর্তীকালে যিনি বলেছিলেন,

‘বহুরূপে সম্মুখে তোমার, ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর?

জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।’

ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবের কাছে বিবেকানন্দ পেয়েছিলেন নতুন এক ধর্মের শিক্ষা, তা হলো মানুষকে সেবা করার ধর্ম। ঠাকুর একদিন ধর্মের উপদেশ দিতে দিতে বলছিলেন, ‘সব জীব যে সাক্ষাৎ শিব, শিবকে তো সেবা করতে হয়। তাই সব জীবকে শিবজ্ঞানে দেখে সেবা করতে হবে।’

ঠাকুরের কাছে বিবেকানন্দ পেয়ে গেলেন মানুষের আসল ধর্মের খোঁজ। সব জীবই ঈশ্বরের প্রতিভূ; মানুষের সেবা করলেই ঈশ্বরের সেবা করা হয়। জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সব মানুষের সেবাকেই তাই তিনি গ্রহণ করে নিলেন জীবনের ব্রত হিসেবে।

শ্রীরামকৃষ্ণদেবের দেহান্তের পর পরিব্রাজকরূপে ভারতবর্ষের আনাচকানাচে পরিভ্রমণকালে বিবেকানন্দ দেখেছিলেন, ভারতজুড়ে রয়েছে দারিদ্র্য নামে এক গভীর যন্ত্রণা। আর এই দারিদ্র্যের মূলে আছে অশিক্ষা, কুসংস্কার ও জাত–পাতের ভেদাভেদ।

দেশের সাধারণ মানুষেরা পেট ভরানোর জন্য সামান্য একটু খাবারও জোটাতে পারছে না। এই খেতে না পাওয়া, আধপেটা খাওয়া মানুষগুলোর মুখে অন্ন তুলে দিতে হবে। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবের কাছে তিনি শিখেছিলেন, খালি পেটে ধর্ম হয় না।

মানুষেরা পেট ভরানোর জন্য সামান্য একটু খাবারও জোটাতে পারছে না। এই খেতে না পাওয়া, আধপেটা খাওয়া মানুষগুলোর মুখে অন্ন তুলে দিতে হবে। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবের কাছে তিনি শিখেছিলেন, খালি পেটে ধর্ম হয় না।

মোটা ভাত, মোটা কাপড়ের ব্যবস্থা চাই। অন্নহীনের মুখে অন্ন তুলে দিতে হবে, অশিক্ষা-কুশিক্ষার অন্ধকার দূর করতে হবে, দরিদ্র ও মূর্খ–নিরক্ষর নারায়ণকে মানুষ করে তুলতে হবে।

আর তার জন্য তিনি চাইলেন একদল আদর্শনিষ্ঠ, চরিত্রবান ও সাহসী যুবক, যাঁরা সর্বস্ব ত্যাগ করে ধ্বংসোম্মুখ ভারতবর্ষের দরিদ্র মানুষের কল্যাণে জীবন পণ করবেন। এসব মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের মাধ্যমে হতদরিদ্র বর্তমান ভারতবর্ষকে পাল্টে ফেলে ভারতের গৌরব ফিরিয়ে আনবেন তিনি। এর জন্য প্রথম প্রয়োজন ত্যাগ আর সেবা। তারপর চাই অর্থ।

শ্রীরামকৃষ্ণদেবের বীরভক্ত স্বামী বিবেকানন্দ গুরুভাইদের সঙ্গে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন সুবিশাল কর্মযজ্ঞে। তাঁরা ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ–পুত্র। তাঁরা জগতে ঠাকুরের আদর্শ প্রচার করবেন, যে আদর্শ তাঁদের মাতৃভূমি ভারত ও জগতের পক্ষে কল্যাণকর।

বিবেকানন্দ বিশ্বাস করতেন, তাঁদের ভাবধারা একদিন সারা ভারতবর্ষকে যুক্তিপরায়ণ করে তুলবে, জগতের সব মানুষের কল্যাণ সাধন করবে। তাঁর স্থির বিশ্বাস জন্মাল যে বহু লোকের কল্যাণের জন্য যদি কয়েকজন লোকের দুঃখকে বরণ করতে হয়, তবে তা–ই ভালো।

ভাগ্যে যা–ই ঘটুক না কেন ত্যাগের মহান আদর্শ তাঁরা আঁকড়ে ধরে রাখবেন।

শ্রীরামকৃষ্ণদেবের আদর্শে শিবজ্ঞানে জীবসেবা এবং আত্মমুক্তি ও বিশ্বকল্যাণার্থে গুরুভাই ও শিষ্যদের নিয়ে গড়ে তুললেন রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন নামে আধ্যাত্মিক ও জনহিতকর দুটি সংগঠন। অকুণ্ঠচিত্তে দুঃখভারাক্রান্ত ভারতের জন্য, জগতের জন্য, পুরো মানবসমাজের জন্য নিজেকে পরিপূর্ণভাবে উৎসর্গ করলেন।

পরিব্রাজকরূপে স্বামী বিবেকানন্দের প্রথম ফটো, জয়পুর

ঠাকুরের শিক্ষা, আদর্শ ও অমৃতবাণী বিতরণ করতে বিবেকানন্দ পাড়ি দিলেন ইউরোপে–আমেরিকায়। ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার শিকাগো শহরের আর্ট ইনস্টিটিউট ভবনের বিশাল কলম্বাস হলে ধর্ম মহাসভায় বিবেকানন্দ তাঁর প্রথম সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। তিনি মঞ্চে উঠলেন সনাতন ধর্মের প্রতিনিধিরূপে বক্তৃতা দিতে।

মা সরস্বতীর উদ্দেশে প্রণাম জানিয়ে গুরুদেব শ্রীরামকৃষ্ণদেবের নাম স্মরণ করে শুরু করলেন তাঁর বক্তৃতা। চিরাচরিত প্রথার বাইরে গিয়ে সমবেত দর্শক-শ্রোতাদের সম্বোধন করলেন ‘আমেরিকাবাসী ভাই ও বোনেরা’।

নিস্তব্ধ প্রেক্ষাগৃহ মুহূর্তে সাত হাজার দর্শকশ্রোতার করতালিতে মুখর হয়ে উঠল। শত শত দর্শক উঠে দাঁড়ালেন। দুই মিনিট ধরে উচ্ছ্বসিত শ্রোতাদের করতালি চলতে থাকল। করতালি থামলে প্রেক্ষাগৃহ আবার নিস্তব্ধ হলো।

তারপর তিনি পৃথিবীর প্রাচীনতম ধর্ম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবীর নবীন ধর্মগুলোকে অভিনন্দন জানিয়ে তাঁর ভাষণ শুরু করলেন। ভাষণে তিনি কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের নির্দিষ্ট ঈশ্বরের কথা বললেন না, তিনি শোনালেন প্রেম ও সত্যের বাণী।

তিনি শোনালেন সনাতন ধর্মের সহিষ্ণুতা ও সর্বগ্রাহিতার কথা। সনাতন ধর্ম অন্য ধর্মকে ঘৃণা করে না, কোনো ধর্মকে বড়-ছোট ভাবে না। সনাতন ধর্ম শেখায় সব ধর্ম সমান মহান। সনাতন ধর্ম মানুষকে অমৃতের পুত্র বলে।

সেদিন তিনি মাত্র পনেরো মিনিট ভাষণ দিয়েছিলেন। তাঁর এই পনেরো মিনিটের ভাষণ সেদিন সর্বোত্তম ভাষণ হিসেবে স্বীকৃতি পেল। আর তিনি পেলেন শ্রেষ্ঠ বক্তার স্বীকৃতি।

বিবেকানন্দ অন্য ধর্মকে কখনো আঘাত করেননি, অন্য ধর্মের নিন্দা করেননি। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবের পদতলে বসে তিনি শিখেছিলেন ‘যত মত তত পথ’। সব নদী যেমন বিভিন্ন উৎস থেকে জন্ম নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন পথে প্রবাহিত হয়েও একই সমুদ্রের দিকে ধাবিত হয়ে একই সমুদ্রে মিলিত হয়। ঠিক তেমনিভাবে সব ধর্ম তার নিজ নিজ মতাদর্শ ও পথ অবলম্বন করে একই ভগবানের প্রতি ধাবিত হয়ে সেখানেই মিলিত হয়।

মানুষ সোজা পথ, আঁকাবাঁকা পথ, ঘুরপথ—যে পথেই আসুক না কেন, পথের শেষে আছেন এক ও অদ্বিতীয় সেই ঈশ্বর। সব ধর্মের লক্ষ্য এক। সব ধর্মের গন্তব্যস্থল এক। স্বামী বিবেকানন্দ দক্ষিণেশ্বরের পরমহংস শ্রীরামকৃষ্ণদেবের পদতলে বসে যে বাণী লাভ করেছিলেন, তা বিশ্ব ধর্ম মহাসম্মেলনে ঘোষণা করলেন।

এদিকে অন্য সব ধর্মের প্রতিনিধিরা তাঁদের নিজেদের ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশে ব্যস্ত ছিলেন। তাঁদের ভাষণে বিশ্বপ্রেম, বিশ্বভ্রাতৃত্ব ও একাত্মবোধের কথা ছিল না, যা ছিল স্বামী বিবেকানন্দের ভাষণে।

সেদিন তিনি মাত্র পনেরো মিনিট ভাষণ দিয়েছিলেন। তাঁর এই পনেরো মিনিটের ভাষণ সেদিন সর্বোত্তম ভাষণ হিসেবে স্বীকৃতি পেল। আর তিনি পেলেন শ্রেষ্ঠ বক্তার স্বীকৃতি।

শিকাগো ধর্ম মহাসম্মেলনের মধ্য দিয়ে স্বামী বিবেকানন্দের নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। আমেরিকাবাসী উপলব্ধি করতে পারল আজও ভারতবর্ষে এমন মানুষের আবির্ভাব হয়ে থাকে, যাঁদের পদতলে বসে জগতের সর্বাপেক্ষা সভ্য জাতিও ধর্ম ও নীতিশিক্ষা লাভ করতে পারে। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, নরেন একদিন দুনিয়া কাঁপিয়ে দেবে।

আজ ঠাকুরের আদরের নরেন সত্যিই দুনিয়া কাঁপিয়ে দিলেন।

হিন্দু পুনর্জাগরণের অন্যতম পুরোধা স্বামী বিবেকানন্দ শুধু ভারতেই নন, ভারতের বাইরেও সনাতন ধর্মকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সফল হয়েছিলেন। এখানেই তাঁর জীবনদর্শনের মাহাত্ম্য। মাত্র উনচল্লিশ বছর আয়ুষ্কালে বিবেকানন্দ এমন মহান কাজ করেছিলেন যে তাঁর প্রয়াণের পরও তিনি মানুষের বিবেকরূপে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।

দীপান্বিতা দে : শিশুতোষ গ্রন্থপ্রণেতা ও প্রাবন্ধিক