ইসলামের মূল নির্যাসই হলো শান্তি। ‘ইসলাম’ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ যেমন শান্তি, তেমনি এর প্রায়োগিক দিকটিও আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেয়।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা বলেছেন, ‘আর যদি তারা শান্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে আপনিও শান্তির দিকে ঝুঁকুন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করুন; নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ৬১)
বর্তমান অস্থির পৃথিবীতে নিজের ভেতর এবং চারপাশে শান্তির সুবাতাস ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আমাদের খুব বড় কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। ছোট ছোট কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপই আমাদের পরিবার, সমাজ ও প্রতিবেশের মধ্যে আমূল পরিবর্তন আনতে পারে।
আসুন জেনে নিই চারপাশের পরিবেশে প্রশান্তি ছড়ানোর পাঁচটি কার্যকর উপায়।
শান্তি ছড়িয়ে দেওয়ার সবচেয়ে সহজ এবং শক্তিশালী মাধ্যম হলো একে অপরকে সালাম দেওয়া। ‘আসসালামু আলাইকুম’ মানে হলো ‘আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক’। এটি কেবল একটি অভিবাদন নয়, বরং এটি অন্যের জন্য একটি আন্তরিক দোয়া। কর্মক্ষেত্রে, পাড়ায় বা কেনাকাটা করার সময় পরিচিত-অপরিচিতনির্বিশেষে সবাইকে সালাম দেওয়ার অভ্যাস করুন।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, ইসলামের কোন কাজটি সবচেয়ে উত্তম? তিনি বললেন, ‘মানুষকে খাদ্য খাওয়ানো এবং পরিচিত-অপরিচিতনির্বিশেষে সবাইকে সালাম দেওয়া।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১২)
আপনি যখন মানুষের দোষ না খুঁজে তাদের প্রতি দয়ালু হবেন, তখন আপনার নিজের মনেও এক অদ্ভুত প্রশান্তি জন্মাবে।
‘ইহসান’ হলো প্রতিটি জীবের প্রতি সদিচ্ছা রাখা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের মঙ্গল করা। এর মধ্যে রয়েছে মানুষের সঙ্গে ন্যায়বিচার করা, স্বার্থপরতা ত্যাগ করা এবং প্রতিদান পাওয়ার আশা না করেই অন্যকে সাহায্য করা। ইহসানের একটি বড় অংশ হলো ক্ষমা করা এবং মনে ক্ষোভ পুষে না রাখা।
জিবকে গিবত বা পরনিন্দা থেকে রক্ষা করাও ইহসানের অন্তর্ভুক্ত। আপনি যখন মানুষের দোষ না খুঁজে তাদের প্রতি দয়ালু হবেন, তখন আপনার নিজের মনেও এক অদ্ভুত প্রশান্তি জন্মাবে। শিশুদেরও ছোটবেলা থেকে শিখিয়ে দিন, যেন তারা আল্লাহর প্রতিটি সৃষ্টির প্রতি সদয় হয়।
আজকের বিশৃঙ্খল পৃথিবীতে শান্তির গুরুত্ব বোঝার জন্য শিশুদের সঠিক ‘তারবিয়াত’ বা চারিত্রিক উন্নয়ন অপরিহার্য। শিশুদের মনে শৈশব থেকেই শান্তির বার্তা গেঁথে দিতে হবে। তাদের জন্য রঙিন এবং সহজ ভাষায় লেখা কোরআনের গল্পের বই সংগ্রহ করুন।
সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে তাদের শেখান কীভাবে ঝগড়াবিবাদ এড়িয়ে মিলেমিশে থাকতে হয়। পরিবারের নৈতিক ভিত্তি যত মজবুত হবে, ভবিষ্যৎ সমাজ তত বেশি শান্তিময় হবে।
একটি স্থিতিশীল ও নিরাপদ সমাজের ভিত্তি হলো শক্তিশালী পারিবারিক বন্ধন। পরিবারকে একত্র করার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো অন্তত এক বেলা সবাই মিলে একসঙ্গে খাবার খাওয়া। এতে একে অপরের প্রতি বোঝাপড়া এবং হৃদ্যতা বাড়ে।
পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জামাতে নামাজ পড়ার অভ্যাস করুন। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৮৯৫) একত্রে দোয়া করা এবং গল্প করার মাধ্যমে যে বন্ধন তৈরি হয়, তা পরিবারে এক অনাবিল নিরাপত্তা ও শান্তির আবহ তৈরি করে।
প্রতিবেশী মুসলিম হোক বা অমুসলিম, তাদের খোঁজখবর নেওয়া, প্রয়োজনে সাহায্য করা এবং মাঝেমধ্যে খাবার বা উপহার আদান-প্রদান করা শান্তির চাবিকাঠি।
ভৌগোলিক দিক থেকে আমাদের সবচেয়ে কাছের মানুষ হলেন আমাদের প্রতিবেশীরা। ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকারকে এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, জিবরাইল (আ.) তাঁকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে এত বেশি অসিয়ত করছিলেন যে তাঁর মনে হচ্ছিল অচিরেই হয়তো প্রতিবেশীকে সম্পদের ওয়ারিশ বানিয়ে দেওয়া হবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬,০১৪)
প্রতিবেশী মুসলিম হোক বা অমুসলিম, তাদের খোঁজখবর নেওয়া, প্রয়োজনে সাহায্য করা এবং মাঝেমধ্যে খাবার বা উপহার আদান-প্রদান করা শান্তির চাবিকাঠি। আপনি যখন প্রতিবেশীর সঙ্গে শান্তিপূর্ণ আচরণ করবেন, তখন বিনিময়ে আপনিও একটি দুশ্চিন্তামুক্ত পরিবেশ পাবেন।
প্রশান্তি কেবল বাইরের কোনো বিষয় নয় বরং এটি অন্তরের একটি অবস্থা। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘জেনে রেখো, আল্লাহর জিকিরেই (স্মরণেই) অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।’ (সুরা রাদ, আয়াত: ২৮)
যখন আমরা আল্লাহর স্মরণে নিজেদের অন্তরকে শান্ত রাখতে পারব, তখনই কেবল অন্যের জীবনে শান্তি ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে। ওপরের এই পাঁচটি পদক্ষেপ অনুশীলনের মাধ্যমে আমরা প্রত্যেকেই হয়ে উঠতে পারি এক একজন ‘শান্তির দূত’।