জীবনে ইসলাম

১০ কারণে ইসলাম প্রতিবেশীর খবর রাখতে বলে

বর্তমান নাগরিক জীবনে আমরা অনেক সময় একই ছাদের নিচে বছরের পর বছর কাটালেও পাশের ফ্ল্যাট বা পাশের বাড়ির মানুষের খবর রাখি না। ব্যক্তিগত গোপনীয়তার দোহাই দিয়ে আমরা যে বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করছি, তা আমাদের সামাজিক নিরাপত্তাকেই বিঘ্নিত করছে।

ইসলামে প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করাকে শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং ইমানের অংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে প্রতিবেশীর অধিকারসংক্রান্ত ১০টি নির্দেশনা নিচে তুলে ধরা হলো:

১. ইমানের পরিমাপক হিসেবে প্রতিবেশী

একজন মানুষ কতটা প্রকৃত মুমিন, তা বোঝা যায় তার প্রতিবেশীর সঙ্গে তার আচরণের মাধ্যমে। প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া ইমানি দুর্বলতার লক্ষণ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কসম, সে মুমিন নয়! আল্লাহর কসম, সে মুমিন নয়! জিজ্ঞেস করা হলো, “কে হে আল্লাহর রাসুল?” তিনি বললেন, যার প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১৬)

২. অভুক্ত প্রতিবেশীর প্রতি দায়বদ্ধতা

নিজের ঘরে অঢেল খাবার থাকা আর পাশের ঘরে কেউ না খেয়ে থাকা—এটি ইসলামের চরম পরিপন্থী। সামাজিক বৈষম্য দূর করতে এটি একটি বৈপ্লবিক চেতনা। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সে ব্যক্তি মুমিন নয়, যে পেট পুরে খায় অথচ তার পাশেই তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।’ (আল-আদাবুল মুফরাদ, বুখারি, হাদিস: ১১২)

৩. উপহার বা খাবার আদান-প্রদান

পারস্পরিক হৃদ্যতা বাড়াতে ছোটখাটো উপহার বা খাবার শেয়ার করা অত্যন্ত কার্যকর। এটি মনের দূরত্ব কমিয়ে দেয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘হে আবু যর! যখন তুমি তরকারি রান্না করো, তখন তাতে ঝোল বাড়িয়ে দাও এবং তোমার প্রতিবেশীর খবর নাও।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬২৫)

৪. প্রতিবেশীর গোপনীয়তা রক্ষা করা

প্রতিবেশীর ঘরের ভেতরের খবর নেওয়ার চেষ্টা করা বা তাদের ব্যক্তিগত ত্রুটি প্রচার করা সামাজিক অপরাধ। সফল প্রতিবেশী হবে অন্যের মান-সম্মানের পাহারাদার। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের গোপন দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৯৯)

৫. সব ধরনের প্রতিবেশীর সমান অধিকার

প্রতিবেশী মুসলিম হোক বা অমুসলিম, নিকটাত্মীয় হোক বা অপরিচিত—সবারই নির্দিষ্ট অধিকার রয়েছে যা রক্ষা করা আবশ্যক। (ইমাম কুরতুবি, আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন, ৫/১৮৩-১৮৪, দারুল কুতুব আল-মিসরিয়্যাহ, কায়রো)

৬. ছোটখাটো বিষয়ে সহমর্মিতা

প্রতিবেশীর প্রয়োজনে নিজের সামান্য সুবিধা ত্যাগ করাও বড় সওয়াবের কাজ। যেমন পাশের দেয়ালে প্রতিবেশীর লোহা পোঁতা বা এমন কোনো প্রয়োজনে বাধা না দেওয়া। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন তার প্রতিবেশীকে তার দেয়ালে কাঠ (বা পেরেক) বিদ্ধ করতে বাধা না দেয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৬৩)

৭. কষ্টের সময় পাশে দাঁড়ানো

অসুস্থতায় দেখতে যাওয়া, বিপদে সাহায্য করা এবং কারও মৃত্যুতে তার পরিবারের পাশে দাঁড়ানো প্রতিবেশীর অন্যতম হক। আল্লাহ বলেছেন, ‘আর তোমরা সদ্ব্যবহার করো পিতা–মাতার সঙ্গে... এবং নিকট প্রতিবেশী ও দূর প্রতিবেশীর সঙ্গে।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৩৬)

৮. গালিগালাজ বা শব্দদূষণ থেকে বিরত থাকা

উচ্চ স্বরে গান বাজানো, জোরে কথা বলা বা এমন কোনো কাজ করা, যা প্রতিবেশীর বিশ্রামে ব্যাঘাত ঘটায়, তা সরাসরি অধিকার হরণ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের ওপর ইমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১৮)

৯. জানাজা ও শোকে অংশগ্রহণ

প্রতিবেশীর কেউ মারা গেলে তার জানাজায় শরিক হওয়া এবং শোকাতুর পরিবারকে সান্ত্বনা ও খাবার দিয়ে সহযোগিতা করা ইসলামের অনন্য শিষ্টাচার। আবদুল্লাহ ইবনে জাফর (রা.) বলেন, যখন জাফর (রা.)-এর শহীদ হয়েছেন বলে খবর এল, তখন আল্লাহর রাসুল (সা.) বললেন, ‘তোমরা জাফরের পরিবারের জন্য খাবার তৈরি করো। কারণ, তাদের কাছে এমন একটি সংবাদ এসেছে, যা তাদের (অন্য কাজে) ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৬১০)

১০. জিবরাইলের বারবার তাগিদ

প্রতিবেশীর গুরুত্ব কত বেশি, তা বোঝা যায় যখন নবীজি (সা.) বলেন যে জিবরাইল (আ.) তাঁকে এত বেশি নসিহত করতেন যে তাঁর মনে হতো প্রতিবেশীকে হয়তো সম্পত্তির উত্তরাধিকারী করে দেওয়া হবে।

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘জিবরাইল (আ.) আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে এত বেশি অসিয়ত করতেন যে আমার মনে হলো তিনি হয়তো তাকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেবেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১৫)

একটি অ্যাপার্টমেন্ট বা পাড়া তখনই শান্তিময় হয়, যখন সেখানকার মানুষ একে অপরের বিপদে ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। ইসলামের এই নীতিমালাগুলো মানলে আমাদের সমাজ থেকে একাকিত্ব, অনিরাপত্তা ও পারস্পরিক বিদ্বেষ দূর হয়ে যাবে।