বিরক্ত হয়ে কণ্ঠস্বর উঁচু করা, ধমক দেওয়া বা কঠিন কথা বলা কোনোভাবেই সন্তানের জন্য শোভন নয়
বিরক্ত হয়ে কণ্ঠস্বর উঁচু করা, ধমক দেওয়া বা কঠিন কথা বলা কোনোভাবেই সন্তানের জন্য শোভন নয়

পাথেয়

মা-বাবাকে খুশি রাখতে ইসলামের ৬ রূপরেখা

পৃথিবীতে সবচেয়ে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা কার? বিপদের মুহূর্তে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয়ই–বা কারা? নিঃসন্দেহে তাঁরা আমাদের মা-বাবা।

শৈশবে তাঁরাই আমাদের পথ চলতে শিখিয়েছেন। আমাদের ক্ষুধায় তাঁরা ব্যাকুল হয়েছেন এবং অসুস্থতায় কাটিয়েছেন অসংখ্য নির্ঘুম রাত। আমাদের মুখের একটুখানি হাসির জন্য তাঁরা নিজেদের কত আনন্দ, স্বাচ্ছন্দ্য ও প্রয়োজন ত্যাগ করেছেন, তার হিসাব হয়তো কোনো দিনই করা সম্ভব নয়।

তাই মা-বাবার প্রতি ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও দায়িত্ববোধ স্রেফ নৈতিক কর্তব্যই নয়; একজন সন্তানের জন্য এটি মহৎ আমানতও বটে। তাঁদের প্রতি আমাদের দায়িত্বের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হলো।

পৃথিবীতে সবচেয়ে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা কার? বিপদের মুহূর্তে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয়ই–বা কারা? নিঃসন্দেহে তাঁরা আমাদের মা-বাবা।

১. নম্রভাবে কথা বলা

মা-বাবার কৃতজ্ঞতা আদায়ের প্রথম ধাপ হলো তাঁদের সঙ্গে সুন্দর, কোমল ও সম্মানজনক ভাষায় কথা বলা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা অনেক বিষয়ে ধীর হয়ে যেতে পারেন, একই কথা বারবার বলতে পারেন কিংবা সন্তানের মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন।

এসব কারণে বিরক্ত হয়ে কণ্ঠস্বর উঁচু করা, ধমক দেওয়া বা কঠিন কথা বলা কোনোভাবেই সন্তানের জন্য শোভন নয়।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘... এবং তাঁদের ধমক দিয়ো না; বরং তাঁদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ২৩)

আমাদের কাছে সামান্য মনে হওয়া একটি কঠিন কথাও মা-বাবার মনে গভীর কষ্টের কারণ হতে পারে। তাই মতের অমিল হলেও আমাদের ভাষায় যেন সম্মান, কোমলতা ও ভালোবাসা বজায় থাকে।

২. তাঁদের কষ্ট না দেওয়া

বিনা কারণে কাউকে কষ্ট দেওয়া ইসলামে অত্যন্ত নিন্দনীয়। মা-বাবার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুতর। তাঁদের মনে কষ্ট দেওয়া, অপমান করা, অবহেলা করা কিংবা এমন আচরণ করা, যাতে তাঁরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন—এসব থেকে সন্তানের অবশ্যই বেঁচে থাকা উচিত।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের ‘উফ্‌’ বলো না...।” (সুরা ইসরা, আয়াত: ২৩)

যেখানে আল্লাহ–তাআলা তাঁদের ‘উফ্‌’ বলতেও নিষেধ করেছেন, সেখানে তাঁদের অপমান করা, কটু কথা বলা বা ইচ্ছাকৃতভাবে কষ্ট দেওয়া কতটা গুরুতর, তা সহজেই অনুমেয়।

আর যদি তারা তোমাকে আমার সঙ্গে এমন কিছুর শরিক করতে পীড়াপীড়ি করে, যার কোনো জ্ঞান তোমার নেই, তবে তুমি তাদের আনুগত্য করবে না; তবে দুনিয়ায় তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস করবে।
সুরা লুকমান, আয়াত: ১৫

৩. নিয়মিত তাঁদের জন্য দোয়া করা

মা-বাবার প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সবচেয়ে সুন্দর উপায়গুলোর একটি হলো তাঁদের জন্য দোয়া করা।

তাঁরা জীবিত থাকলে তাঁদের সুস্থতা, ইমান, কল্যাণ ও নেক হায়াতের জন্য দোয়া করা উচিত। আর তাঁরা ইন্তেকাল করলে তাঁদের মাগফিরাত ও রহমতের জন্য দোয়া করা সন্তানের অন্যতম দায়িত্ব।

কোরআন আমাদের এই দোয়া শেখায়, ‘হে আমার প্রতিপালক, তাঁদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তাঁরা শৈশবে আমাকে স্নেহের সঙ্গে লালন-পালন করেছেন।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ২৪)

৪. সামর্থ্য অনুযায়ী সেবা করা

মা-বাবার সেবা শুধু পারিবারিক দায়িত্ব নয়; এটি নেকি অর্জনেরও অপূর্ব সুযোগ। তাঁদের চিকিৎসা, ওষুধ সরবরাহ, দৈনন্দিন কাজ কিংবা চলাফেরায় সহযোগিতা করা উত্তম আচরণের অংশ।

হাদিসে এসেছে, ‘এক ব্যক্তি নবীজির কাছে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার মা-বাবা কি জীবিত?’ সে বলল, হ্যাঁ। তখন নবীজি (সা.) বললেন, ‘তাহলে তাঁদের সেবার মধ্যেই তোমার চেষ্টা করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩০০৪)

৫. বৈধ বিষয়ে তাঁদের কথা মানা

মা-বাবার প্রতি আনুগত্য ও সদাচরণ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। তাই বৈধ ও ন্যায়সংগত বিষয়ে তাঁদের কথা মানা এবং তাঁদের সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করা সন্তানের দায়িত্ব।

তবে কোনো বিষয়ে তাঁদের নির্দেশ যদি আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে নিয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে তা মানা যাবে না। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতেও তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা, সম্পর্ক ছিন্ন করা কিংবা অসম্মানজনক আচরণ করা বৈধ নয়।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আর যদি তারা তোমাকে আমার সঙ্গে এমন কিছুর শরিক (অংশীদার) করতে পীড়াপীড়ি করে, যার কোনো জ্ঞান তোমার নেই, তবে তুমি তাদের আনুগত্য করবে না; তবে দুনিয়ায় তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস করবে।’ (সুরা লুকমান, আয়াত: ১৫)

মা-বাবার যত্ন নেওয়া মানে শুধু তাঁদের প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে দেওয়া নয়। অনেক সময় তাঁদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় সন্তানের একটু সময়, মনোযোগ দিয়ে কথা শোনা কিংবা পাশে বসে কিছুক্ষণ গল্প করা।

৬. তাঁদের প্রয়োজন বোঝার চেষ্টা করা

মা-বাবার যত্ন নেওয়া মানে শুধু তাঁদের প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে দেওয়া নয়। অনেক সময় তাঁদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় সন্তানের একটু সময়, মনোযোগ দিয়ে কথা শোনা কিংবা পাশে বসে কিছুক্ষণ গল্প করা।

তাঁরা কী নিয়ে চিন্তিত, কোন বিষয়ে কষ্ট পাচ্ছেন কিংবা তাঁদের কী প্রয়োজন—এসব জানার চেষ্টা করুন। কখনো কখনো আপনার কয়েক মিনিটের আন্তরিক মনোযোগই তাঁদের দিনের সবচেয়ে বড় আনন্দ হয়ে উঠতে পারে।

এক ব্যক্তি রাসুলের কাছে এসে আরজ করল, “আমি আপনার হাতে হিজরত করার জন্য বাইআত হতে এসেছি, অথচ আমি আমার মা-বাবাকে (আমার বিচ্ছেদের কষ্টে) ক্রন্দনরত অবস্থায় রেখে এসেছি।”

নবীজি তাকে বললেন, “তাদের কাছে ফিরে যাও এবং যেভাবে তাদের কাঁদিয়ে এসেছ, ঠিক সেভাবেই তাঁদের হাসাও (তাদের মুখে হাসি ফোটাও)।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৫২৮)

শুধু বাহ্যিক আনুগত্য নয়, মা-বাবার ভেতরের অনুভূতি ও মানসিক শান্তি নিশ্চিত করা কত বড় ইবাদত, তা এই নির্দেশ থেকে স্পষ্ট হয়।

  • রায়হান আল ইমরান : লেখক ও গবেষক