ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ছোট-বড় কাজের জন্য রয়েছে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা। খাবার গ্রহণ কেবল একটি শারীরিক চাহিদা নয়, বরং এটি ইবাদতেরও অংশ।
মুসলিম মা-বাবারা একদম শৈশব থেকেই সন্তানদের খাবারের আগে ও পরের দোয়া এবং আদবগুলো শিক্ষা দিয়ে থাকেন, যাতে এই উত্তম অভ্যাসগুলো তাদের চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
খাবারের আগে ও পরে দোয়া পড়া নবীজি (সা.)–এর গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নত। এর মাধ্যমে আমরা আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করি এবং শয়তানের অনিষ্ট থেকে বেঁচে থাকি।
১. আহার শুরুর দোয়া: খাবার শুরুতে কেবল ‘বিসমিল্লাহ’ (আল্লাহর নামে শুরু করছি) বলা সুন্নত। তবে পূর্ণ দোয়াটি হলো:
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি ওয়া আলা বারাকাতিল্লাহ।
অর্থ: আল্লাহর নামে এবং আল্লাহর বরকতের ওপর ভরসা করে শুরু করছি।
যদি শুরুতে দোয়া পড়তে ভুলে যান: খাবার চলাকালীন মনে পড়লে এই দোয়াটি পড়তে হয়:
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি আওয়ালাহু ওয়া আখিরাহু।
অর্থ: এর শুরুতে এবং শেষেও আল্লাহর নাম নিচ্ছি।
২. আহার শেষের দোয়া: খাবার শেষ করে আল্লাহর শুকরিয়া জানিয়ে এই দোয়া পড়তে হয়:
উচ্চারণ: আলহামদুলিল্লাহিল্লাজি আত’আমানা ওয়া সাকানা ওয়া জা’আলানা মিনাল মুসলিমিন।
অর্থ: সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমাদের খাইয়েছেন, পান করিয়েছেন এবং আমাদের মুসলিম হওয়ার সৌভাগ্য দান করেছেন।
শয়তান থেকে সুরক্ষা: সহিহ মুসলিমের এক হাদিসে বর্ণিত আছে, মানুষ যখন খাবার শুরুতে আল্লাহর নাম নিতে ভুলে যায়, তখন শয়তান সেই খাবারে অংশীদার হয়। আল্লাহর নাম নেওয়ার মাধ্যমে আমরা শয়তানকে আমাদের খাবার থেকে দূরে রাখি।
নেয়ামতের শুকরিয়া: রিজিকদাতা হিসেবে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য। দোয়া পড়ার মাধ্যমে আমাদের অন্তরে এই অনুভূতি জাগ্রত হয় যে এই খাবার আমার উপার্জনে নয় বরং আল্লাহর দয়ায় প্রাপ্ত।
বরকত লাভ: দোয়ার মাধ্যমে খাবারে বরকত সৃষ্টি হয়, যা আমাদের শরীর ও মনের জন্য পুষ্টিকর ও কল্যাণকর হয়।
ইবাদতের সওয়াব: যখনই কোনো কাজ বিসমিল্লাহ দিয়ে শুরু করা হয় এবং শেষে আল্লাহর প্রশংসা করা হয়, তখন সেই সাধারণ কাজটিও ইবাদত হিসেবে গণ্য হয় এবং এর জন্য সওয়াব পাওয়া যায়।
সুন্নাহ অনুযায়ী খাওয়ার ১০টি আদব
খাবার গ্রহণের সময় দোয়া পড়ার পাশাপাশি কিছু আদব মেনে চলা সুন্নত:
হাত ধোয়া: খাবারের আগে ও পরে উভয় হাত ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া।
বিসমিল্লাহ বলা: আহারের শুরুতে আল্লাহর নাম নেওয়া।
ডান হাতে খাওয়া: সর্বদা ডান হাত দিয়ে খাবার গ্রহণ ও পানি পান করা।
বসে খাওয়া: দাঁড়িয়ে পানাহার না করা সুন্নত।
পরিমিত আহার: অতিরিক্ত ভোজন এড়িয়ে চলা এবং পেটের এক-তৃতীয়াংশ খালি রাখা।
খাবারের ত্রুটি না ধরা: খাবারের কোনো দোষ না খোঁজা। ভালো লাগলে খাওয়া, না লাগলে এড়িয়ে যাওয়া।
খাবার নষ্ট না করা: থালা পরিষ্কার করে খাওয়া এবং খাবার অপচয় না করা।
সামনে থেকে খাওয়া: পাত্রের মাঝখান থেকে না খেয়ে নিজের সামনের অংশ থেকে খাওয়া।
পানির আদব: পানি পান করার সময় বসে তিন শ্বাসে পান করা।
শেষের দোয়া: আহার শেষে আল্লাহর প্রশংসা করে দোয়া পাঠ করা।
খাবারের এই ছোট ছোট দোয়া এবং নিয়মগুলো আমাদের জীবনকে শৃঙ্খলিত করে। এটি কেবল একটি অভ্যাস নয়, বরং আল্লাহর সঙ্গে আমাদের এক আত্মিক বন্ধন।
আমরা যদি ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের এই সুন্নাহগুলো হাতে-কলমে শেখাই, তবে তারা বড় হয়েও একজন সচেতন ও কৃতজ্ঞ মুসলিম হিসেবে গড়ে উঠবে।