পাথেয়

আমাদের জীবনে আল্লাহর রহমত কীভাবে আসবে

সম্প্রতি এক যুবকের সাথে আলাপ হচ্ছিল। কথার এক পর্যায়ে সে কিছুটা হতাশ হয়েই বলে বসল, “আমি আর দোয়া করি না।” কৌতূহলী হয়ে কারণ জানতে চাইলে সে জানালো, অনেক দিন ধরে অনেক কিছু চেয়েও সে পায়নি, তাই এখন আর দোয়ার ওপর তার কোনো ভরসা নেই।

তাকে যখন প্রশ্ন করা হলো, “তুমি কি জীবনে সুখী?” সে সরাসরি না সূচক উত্তর দিল। কিন্তু যখন জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কি জীবনে আল্লাহর রহমত বা করুণার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করো?” তখন সে অত্যন্ত আবেগের সাথে উত্তর দিল, “অবশ্যই করি!”

এই কথোপকথনটি আমাদের সমাজের এক গভীর বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলে। আমরা সৃষ্টিকর্তার কাছে সবকিছু প্রত্যাশা করি, কিন্তু বিনিময়ে নিজেদের দায়িত্ব পালনে থাকি চরম উদাসীন। জীবনের সার্থকতা কেবল চাওয়ার মধ্যে নয়, বরং পাওয়ার যোগ্য হয়ে ওঠার মধ্যে নিহিত।

প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমীকরণ

আমাদের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমরা কেবল ‘গ্রহণ’ করতে ভালোবাসি, ‘প্রদান’ করতে নয়।

একজন সন্তান যদি তার বাবা-মায়ের অবাধ্য হয়, তাদের অপছন্দনীয় কাজ করে এবং ঘরের কোনো দায়িত্ব পালন না করে কেবল আবদার নিয়ে হাজির হয়, তবে সেই আবদার পূরণ না হওয়াটাই স্বাভাবিক।

নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করেন না।
সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৫

একইভাবে, একজন বন্ধু যদি কেবল প্রয়োজনের সময় আপনার কাছে আসে এবং অন্য সময় আপনার সমালোচনা করে, তবে আপনি তাকে সাহায্য করতে কুণ্ঠাবোধ করবেন।

মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যদি এই ‘দেওয়া-নেওয়ার’ ভারসাম্য জরুরি হয়, তবে বিশ্বজগতের প্রতিপালকের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের ভিত্তি কী হওয়া উচিত?

আমরা আল্লাহর অসংখ্য নেয়ামত ভোগ করছি। এই বিশাল সৃষ্টিজগত মানুষের উপকারের জন্যই তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সৃষ্টির সেবা করছি, নাকি কেবল নিজেদের ভোগবিলাসে মত্ত আছি?

ইমাম গাজালি তার কালজয়ী ইহ্ইয়াউ উলুমিদ্দিন গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর নেয়ামত ভোগ করে কিন্তু তাঁর সৃষ্টির প্রতি দয়া দেখায় না, তার আধ্যাত্মিক উন্নতি রুদ্ধ হয়ে যায়। (১/১২০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা, ২০০২)

পরিবেশ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা

আধুনিক বিশ্বে আমরা চরম ভোগবাদী জীবনযাপন করছি। আমরা অবলীলায় পরিবেশ দূষণ করছি, যত্রতত্র ময়লা ফেলছি এবং ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করছি। অথচ আল্লাহ আমাদের এই পৃথিবীর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দিয়েছেন।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি, মানবজাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে; তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং অসৎকাজে নিষেধ করো আর আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১১০)

যখন আমরা পরিবেশ দূষিত করে অসুস্থ হয়ে পড়ি, তখন আমরা আল্লাহর কাছে আরোগ্যের জন্য কান্নাকাটি করি। কিন্তু সুস্থ হওয়ার পরপরই আবার সেই একই ধ্বংসাত্মক অভ্যাসে ফিরে যাই।

বিষাক্ত বর্জ্য যথাস্থানে না ফেলে নদীতে ফেলা বা ব্যক্তিগত লাভের জন্য অন্যের ক্ষতি করা—এসবই জুলুমের শামিল।

আল্লাহ অত্যন্ত দয়ালু যে, বারবার ভুল করা সত্ত্বেও তিনি আমাদের সুযোগ দেন। তিনি আমাদের তওবা করার এবং নতুন করে শুরু করার পথ খোলা রেখেছেন।

কিন্তু আমাদের মনে রাখা উচিত, পৃথিবীতে মানুষের ভূমিকা কেবল অর্থের পেছনে ছোটা বা বিলাসিতায় ডুবে থাকা নয়। বরং সমাজের কণ্ঠস্বর হওয়া, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং জলবায়ু ও পরিবেশ রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করা আমাদের ইমানি দায়িত্ব।

আল্লাহর রাসুল (সা.) এই সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্বের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ যদি কোনো অন্যায় কাজ হতে দেখে, তবে সে যেন তা হাত দিয়ে বদলে দেয়; যদি সে তাতে সক্ষম না হয়, তবে যেন মুখ দিয়ে তার প্রতিবাদ করে; আর যদি সে তাতেও সক্ষম না হয়, তবে যেন মন দিয়ে তা ঘৃণা করে—আর এটি হলো ইমানের সর্বনিম্ন স্তর। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৯)

ইবাদতের লক্ষ্য ও সীমাবদ্ধতা

আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদত করার জন্য। আর এই ইবাদতের একটি বড় অংশ হলো তাঁর নির্ধারিত সীমানার মধ্যে থাকা। মানুষ যখন স্বার্থপর হয়ে ওঠে এবং কেবল নিজের বস্তুগত উন্নতির জন্য অন্যদের অধিকার হরণ করে, তখন সে আসলে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরে যায়।

বিষাক্ত বর্জ্য যথাস্থানে না ফেলে নদীতে ফেলা বা ব্যক্তিগত লাভের জন্য অন্যের ক্ষতি করা—এসবই জুলুমের শামিল।

এমন একজন ব্যক্তি যদি আল্লাহর কাছে দু’হাত তুলে দোয়া করে, তবে সেই দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু? রাসুল (সা.) এ বিষয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করেন না।”

এরপর তিনি একজন ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে দীর্ঘ সফর করে ক্লান্ত, যার মাথার চুল এলোমেলো এবং দেহ ধূলিমলিন। সে আকাশের দিকে হাত তুলে ‘হে প্রভু, হে প্রভু’ বলে ডাকছে, অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং সে হারাম উপার্জনেই লালিত-পালিত হয়েছে। এমতাবস্থায় তার দোয়া কীভাবে কবুল হতে পারে? (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৫)

পবিত্র কোরআনেও এর প্রতিফলন পাওয়া যায়। আল্লাহ বলেন, “হে রাসুলগণ, আপনারা পবিত্র বস্তু আহার করুন এবং সৎকাজ করুন। (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ৫১)

বিশ্বাসীদের উদ্দেশ্যেও একই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, “হে মুমিনগণ, আমি তোমাদের যে জীবনোপকরণ দান করেছি, তা থেকে পবিত্র বস্তু আহার করো। (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৭২)

সুতরাং, দোয়া কবুল হওয়ার এবং আল্লাহর রহমত লাভের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো আমাদের জীবনযাত্রা ও উপার্জন পবিত্র হওয়া।

আলস্য ও আধ্যাত্মিক স্থবিরতা

অনেক সময় আমরা খুব বেশি অপরাধী না হলেও চরম অলস ও উদাসীন হয়ে পড়ি। ‘পরে করব’ বা ‘এখন থাক’—এই মানসিকতা আমাদের আমল ও আখলাককে ধ্বংস করে দেয়।

অনেকেই ভাবেন যে, বয়স হলে বা অবসরে গেলে তারা ইবাদতে মনোযোগী হবেন। কিন্তু জীবনের কোনো নিশ্চয়তা নেই। যখনই কোনো সংকট আসে, আমরা সহজ পথ খুঁজি। সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো বা মজলুমের পাশে থাকার মতো কঠিন কাজগুলো আমরা এড়িয়ে চলি। অথচ বিপদে পড়লে আমরা ঠিকই আল্লাহর কাছে অলৌকিক কিছু প্রত্যাশা করি।

মানুষের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই একটি পরীক্ষা এবং এই পরীক্ষার মাধ্যমেই নির্ধারিত হয় সে আল্লাহর রহমতের যোগ্য কি না।
শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি (রহ.)

আল্লাহ আমাদের জীবন, পরিবার, বন্ধু এবং এই বিশাল প্রকৃতি দান করেছেন কেবল খেলাধুলার জন্য নয়। শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি তাঁর হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ গ্রন্থে লিখেছেন, মানুষের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই একটি পরীক্ষা এবং এই পরীক্ষার মাধ্যমেই নির্ধারিত হয় সে আল্লাহর রহমতের যোগ্য কি না। (১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৫৪)

আল্লাহর রহমত সবসময়ই বিদ্যমান, কিন্তু সেই রহমতকে গ্রহণ করার মতো যোগ্যতা আমাদের অর্জন করতে হবে।

রহমত লাভের পথ

আল্লাহর রহমত কোনো নিষ্ক্রিয় বস্তু নয় যে তা এমনিতেই আমাদের ওপর বর্ষিত হবে। এটি অর্জনের জন্য প্রয়োজন সক্রিয় প্রচেষ্টা। সৃষ্টিকর্তা আমাদের স্বাধীন ইচ্ছা দিয়েছেন। আমরা চাইলে তাঁর সাহায্য নিয়ে জীবন পরিচালনা করতে পারি, আবার চাইলে তাঁকে ছাড়াও চলতে পারি। কিন্তু স্রষ্টাকে ছাড়া জীবনের কোনো সার্থকতা বা উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।

যিনি এই মহাবিশ্ব পরিচালনা করছেন, তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, যদি আমরা তাঁর দিকে ফিরে আসি, তবে তিনিও আমাদের দিকে ফিরবেন। তবে এই ফিরে আসাটা হতে হবে পূর্ণাঙ্গ। কেবল মুখে দোয়া নয়, বরং কাজে-কর্মে, উপার্জনে এবং সৃষ্টির প্রতি দয়া প্রদর্শনের মাধ্যমে আমাদের প্রমাণ করতে হবে যে আমরা তাঁর রহমতের যোগ্য।

জীবনের উদ্দেশ্য কেবল ব্যক্তিগত সুখ নয়, বরং সামগ্রিক কল্যাণ। যখন আমরা অন্যের দুঃখ মোচনে এগিয়ে আসব, পরিবেশ রক্ষায় সচেতন হব এবং নিজেদের জীবনকে হারামের পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত রাখব, তখনই আমাদের প্রতিটি নিঃশ্বাস ইবাদতে পরিণত হবে। সেই সার্থক জীবনের পথেই রয়েছে আল্লাহর অবারিত রহমত ও শান্তি।