আমাদের সমাজে একটি দোয়া বেশ প্রচলিত— “হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে ফয়সালা (তকদির) পরিবর্তন করার আবেদন করছি না, বরং তাতে কোমলতা প্রার্থনা করছি।”
আপাতদৃষ্টিতে একে বিনয় মনে হলেও বিশ্বাসগত অবস্থান থেকে এই বাক্যটি ত্রুটিপূর্ণ। কেননা, এই দোয়ার পেছনে একটি ভুল ধারণা কাজ করে, আল্লাহর ফয়সালা বুঝি দোয়ার মাধ্যমে পরিবর্তন হওয়া সম্ভব নয়।
অথচ হাদিস বলছে, দোয়া নিজেই তকদিরের অংশ এবং এটি বিপদ কাটানোর অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার। তাই কারও কারও মতে, উল্লিখিত শব্দে দোয়া করা বৈধ হবে না।
সহিহ হাদিসে এসেছে, “দোয়া ছাড়া আর কোনো কিছুই তকদিরকে পরিবর্তন করতে পারে না।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২১৩৯)
অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, মানুষের দোয়া ও ওপর থেকে আসা বিপদ আসমান-জমিনের মাঝে একে অপরের সঙ্গে লড়াই করে। যদি দোয়ার শক্তি বেশি হয়, তবে তা বিপদকে ঠেকিয়ে দেয়। (মুস্তাদরাকে হাকিম, হাদিস: ৩২৯০; তাবারানি, হাদিস: ২৫১৯)
মানুষের দোয়া ও ওপর থেকে আসা বিপদ আসমান-জমিনের মাঝে একে অপরের সঙ্গে লড়াই করে। যদি দোয়ার শক্তি বেশি হয়, তবে তা বিপদকে ঠেকিয়ে দেয়।মুস্তাদরাকে হাকিম, হাদিস: ৩২৯০
সুতরাং ‘তকদির পরিবর্তনের আবেদন করছি না’ বলা মানে হলো আল্লাহর সেই বিশেষ অনুগ্রহকে অস্বীকার করা, যা তিনি দোয়ার মাধ্যমে আমাদের জন্য রেখেছেন।
ইবনে তাইমিয়া (রহ.) এই বিষয়টি একটি চমৎকার উদাহরণের মাধ্যমে পরিষ্কার করেছেন।
তিনি বলেন, ক্ষুধা নিবারণের জন্য যেমন খাবার একটি মাধ্যম, তেমনি কাঙ্ক্ষিত বস্তু লাভ বা বিপদ মুক্তির জন্য দোয়া একটি মাধ্যম।
কেউ যদি বলে—তকদিরে থাকলে এমনিতেই পেট ভরবে, খাওয়ার দরকার নেই, তবে সে যেমন বোকা; তেমনি তকদিরে থাকলে এমনিতেই বিপদ কাটবে, দোয়ার দরকার নেই—বলাও ভুল।
আল্লাহ–তাআলা অনেক সময় কোনো বিষয়ের ফয়সালা দোয়ার ওপর ঝুলিয়ে রাখেন। অর্থাৎ বান্দা দোয়া করলে বিপদ কাটবে, না করলে কাটবে না।
ইবনে তাইমিয়্যাহর মতে, দোয়া এবং এর ফল—উভয়ই আল্লাহর পূর্বজ্ঞানে বা তকদিরে লিখিত আছে। (মাজমুউল ফাতাওয়া, ৮/৬৬-৬৯, দারুল ওফা, মানসুরা: ২০০৫)
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা বারবার দেখিয়েছেন কীভাবে দোয়ার মাধ্যমে বড় বড় বিপদ ও রোগ মুক্তি ঘটেছে:
কেউ যদি বলে—তকদিরে থাকলে এমনিতেই পেট ভরবে, খাওয়ার দরকার নেই, তবে সে যেমন বোকা; তেমনি তকদিরে থাকলে এমনিতেই বিপদ কাটবে, দোয়ার দরকার নেই—বলাও ভুল।
১. নবী ইউনুস (আ.) যখন মাছের পেটে অন্ধকারে থেকে দোয়া করেছিলেন, তখন আল্লাহ তাঁকে সেই বিপদ থেকে মুক্তি দেন। (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৭-৮৮)
২. নবী জাকারিয়া (আ.) বার্ধক্যে পৌঁছেও দোয়ার মাধ্যমে সন্তান লাভ করেছিলেন। (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৯-৯০)।
৩. কোরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, “কে সেই সত্তা, যিনি আর্তের ডাকে সাড়া দেন যখন সে তাঁকে ডাকে এবং কষ্ট দূরীভূত করেন?” (সুরা নামল, আয়াত: ৬২)
মহানবী (সা.) শিখিয়েছেন যে, কোনো মুসলিম দোয়া করলে আল্লাহ তাকে তিনটি জিনিসের যেকোনো একটি অবশ্যই দেন:
১. হয় তার চাওয়াটি দ্রুত পূরণ করেন।
২. অথবা এর বিনিময়ে পরকালে তার জন্য সওয়াব জমা রাখেন।
৩. কিংবা এর মাধ্যমে তার ওপর থেকে সমপরিমাণ কোনো বড় বিপদ হটিয়ে দেন (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১১১৩৩)
তকদিরে কী আছে তা আমরা জানি না, তাই আমাদের কাজ হলো দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে আল্লাহর কাছে চাওয়া। ‘তকদির পরিবর্তন করবেন না’—এমন হতাশাজনক বাক্য না বলে বরং নবীজি (সা.)-এর শেখানো পদ্ধতিতে আল্লাহর কাছে পূর্ণ কল্যাণ ও নিরাপত্তা চাওয়া উচিত।