সিরাত

মদিনায় ১০ রমজান: কেমন ছিল নবীজি (সা.)–এর শেষ দশক

মুসলিম ইতিহাসে হিজরত-পরবর্তী রমজান মাসগুলো ছিল বৈচিত্র্যময়। হিজরির দ্বিতীয় বছরে মুসলমানদের ওপর রমজানের রোজা ফরজ করা হয়।

সেই বছর ১৭ রমজান ঐতিহাসিক বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) রমজানের শেষ দশকে নিয়মিত ইতিকাফ করতেন। হিজরতের পর থেকে ইন্তেকাল পর্যন্ত এটি ছিল তাঁর নিয়মিত আমল।

হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন এবং ইন্তেকাল পর্যন্ত এই নিয়ম অব্যাহত ছিল। তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর সহধর্মিণীরাও এ দিনগুলোতে ইতিকাফ করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮৯৯)

তবে দ্বিতীয় হিজরিতে বদরের যুদ্ধ এবং অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের অভিযানের কারণে তিনি ইতিকাফ করতে পারেননি। মদিনা জীবনের ১০টি রমজানে নবীজির ইতিকাফের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস নিচে তুলে ধরা হলো:

দ্বিতীয় হিজরি: প্রথম রমজান

এই বছরের ১৭ রমজান বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, যুদ্ধের ব্যস্ততার কারণে সে বছর নবীজি (সা.) ইতিকাফ করেননি।

ইবনে হিশামের বর্ণনা অনুযায়ী, নবীজি (সা.) বদরের যুদ্ধ শেষ করে রমজানের শেষ দিকে অথবা শাওয়াল মাসে মদিনায় ফিরে আসেন।

তৃতীয় থেকে সপ্তম হিজরি

  • তৃতীয় হিজরি: এই বছর রমজানে কোনো যুদ্ধ ছিল না, তবে পরবর্তী মাস শাওয়ালে উহুদের যুদ্ধ হয়। নবীজি (সা.) এই রমজানে ইতিকাফ করেছিলেন।

  • চতুর্থ হিজরি: সিরাত গ্রন্থগুলোর বর্ণনা অনুসারে এই রমজানে কোনো সামরিক অভিযান ছিল না, ফলে তিনি ইতিকাফ সম্পন্ন করেন।

  • পঞ্চম হিজরি: এই বছর শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ হয়। যদিও কেউ কেউ বলেন খন্দক খনন রমজানে শুরু হয়েছিল, তবে শক্তিশালী মত হলো নবীজি (সা.) এই রমজানে ইতিকাফ করেছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৮০২)।

  • ষষ্ঠ ও সপ্তম হিজরি: এই দুই বছরও কোনো যুদ্ধ না থাকায় নবীজি (সা.) নিয়মিতভাবে রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করেন।

অষ্টম হিজরি: মক্কা বিজয়ের বছর

অষ্টম হিজরির রমজান মাসে মক্কা বিজয় সংঘটিত হয়। ১০ হাজার সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে নবীজি (সা.) মক্কার উদ্দেশে রওনা হন। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজান মাসেই মক্কা বিজয়ের অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৯৪৮)

অভিযানের কারণে সে বছর তিনি ইতিকাফ করতে পারেননি।

নবম হিজরি: অষ্টম রমজান

একটি মতানুসারে, এই বছর তিনি তাবুক অভিযানে ব্যস্ত থাকায় ইতিকাফ করতে পারেননি। তবে অন্য বর্ণনা মতে, তিনি মদিনায় ফিরে ইতিকাফ করেছিলেন। যদি কোনো বছর বিশেষ কারণে ইতিকাফ ছুটে যেত, নবীজি (সা.) পরবর্তী বছর তা কাজা করতেন।

হজরত উবাই ইবনে কাব (রা.) বলেন, এক বছর বিশেষ কারণে নবীজি ইতিকাফ করতে পারেননি, তাই পরের বছর তিনি ২০ দিন ইতিকাফ করেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৪৫৫)।

দশম হিজরি: নবম রমজান

এটি ছিল নবীজি (সা.)-এর জীবনের শেষ রমজান। এই বছর তিনি মদিনায় অবস্থান করেন এবং কোনো যুদ্ধ ছিল না। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজি (সা.) প্রতি রমজানে ১০ দিন ইতিকাফ করতেন; কিন্তু যে বছর তিনি ইন্তেকাল করেন, সে বছর তিনি ২০ দিন ইতিকাফ করেছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯১৬)। এই ২০

দিনের মধ্যে ১০ দিন ছিল সেই বছরের এবং বাকি ১০ দিন ছিল পূর্ববর্তী বছরের (ছুটে যাওয়া ইতিকাফের) কাজা।

মদিনায় অবস্থানকালে নবীজি (সা.) অধিকাংশ সময় রমজানের শেষ দশক ইবাদত ও ইতিকাফের মধ্যে অতিবাহিত করেছেন। শুরুর দিকে তিনি মধ্যবর্তী দশকে ইতিকাফ করলেও যখন স্পষ্ট হয় যে ‘লাইলাতুল কদর’ শেষ দশকে, তখন থেকে তিনি আমৃত্যু শেষ দশকেই ইতিকাফ পালন করেছেন।

যুবাইর ইসহাক : লেখক ও অনুবাদক