বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করার পাপ ও তার শাস্তি

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের অন্যতম উপকরণ। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কর্তৃক অধিক মুনাফার আশায় খাদ্য বা জরুরি পণ্য লুকিয়ে রেখে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করাকে মজুতদারি বলা হয়।

ইসলাম ব্যবসা-বাণিজ্যকে উৎসাহিত করেছে, কিন্তু মানুষের দুর্দশাকে পুঁজি করে অন্যায় মুনাফা অর্জনকে কঠোরভাবে নিন্দা করেছে।

মজুতদার ব্যক্তি পাপাচারী

ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যবসার অন্যতম একটি উদ্দেশ্য হলো মানুষের কল্যাণসাধন। মজুতদারি এ উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। কারণ, মজুতদার নিজের লাভের জন্য মানুষের কষ্টকে দীর্ঘায়িত করে।

যখন কোনো ব্যবসায়ী মানুষের প্রয়োজনীয় দ্রব্য আটকে রেখে মূল্যবৃদ্ধির অপেক্ষা করে, তখন সে পাপাচারী হিসেবে গণ্য হয়। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মজুতদারি করে, সে পাপী।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬০৫)

মজুতদারির পার্থিব শাস্তি

মজুতদারির মাধ্যমে সাময়িকভাবে অধিক মুনাফা অর্জিত হলেও এর ভয়াবহ পরিণাম অনেক ক্ষেত্রে দুনিয়াতেই ভোগ করতে হয়।

মানুষের অভিশাপ ও অন্যায় উপার্জনের কারণে অনেক মজুতদার শেষ পর্যন্ত ব্যাবসায়িক সুনাম, সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্থিতি হারিয়ে ফেলে। তার ওপর নেমে আসে শারীরিক অসুস্থতাও।

রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মুসলমানদের কষ্টে ফেলে খাদ্যপণ্য মজুত করে রাখে, আল্লাহ তাকে কুষ্ঠরোগ ও দারিদ্র্যের মাধ্যমে শাস্তি দেন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২১৫৫)

দ্বিতীয় খলিফা ওমরের শাসনামলে এক দাস নিত্যপণ্য মজুত করত। ওমর (রা.) তাকে এমনটা করতে নিষেধ করেন। কিন্তু সে তা মানেনি। ফলে তার গায়ে কুষ্ঠরোগ দেখা দিয়েছিল। (তাকি উসমানি, তাকমিলা ফাতহুল মুলহিম, ৭/৬০৮, দারু ইহয়াউত তুরাস, বৈরুত, ২০০৬)

নবীজির অভিশাপ

রাসুল (সা.) মানবকল্যাণের পরিপন্থী সব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। মজুতদারি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘খাদ্যপণ্য মজুতকারী অভিশপ্ত।’ (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি, ৭/১২২, আর-রিসালাতুল আলামিয়্যাহ, দামেস্ক, ২০১৩)

মুমিনের কাজ হলো মানুষের উপকার করা। মজুতদার মানুষের দুর্ভোগ বাড়ায়। এ জন্য নবীজি (সা.) তাকে নিন্দা ও ভর্ৎসনা করেছেন।

আত্মিক অধঃপতন

মজুতদারির পেছনে কাজ করে দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত লোভ। লোভ নামের এই প্রবৃত্তি মানুষের অন্তরকে ধীরে ধীরে কলুষিত করে।

রাসুল (সা.) বলেন, ‘পার্থিব মোহ সমস্ত পাপের মূল।’ (বাইহাকি, শুআবুল ইমান, হাদিস: ১০৫০১)

কেননা, সম্পদ ও খ্যাতি-প্রতিপত্তির প্রতি মোহ মানুষের হৃদয়ে কপটতার বীজ এমনভাবে অঙ্কুরিত করে, যেমন পানি উদ্ভিদকে লালন-পালন করে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে। (ইমাম গাজালি, ইহয়াউ উলুমিদ্দিন, ৩/৪০১, দারুল মিনহাজ, জেদ্দা, ২০১৯)

মজুতদার কৃপণতা ও লোভের কাছে আত্মসমর্পণ করে। ফলে তার হৃদয় থেকে মানুষের প্রতি সহানুভূতি কমে যায়। মানুষের অভাব, ক্ষুধা বা দুর্ভোগ তাকে বিচলিত করে না।

মজুতদার মানুষের ঘৃণার পাত্র

ইসলাম পারস্পরিক ভালোবাসার ভিত্তিতে একটি সুস্থ ও কল্যাণমুখী সমাজ বিনির্মাণ করতে চায়। কিন্তু মজুতদারি এই সামাজিক বন্ধনকে দুর্বল করে দেয়। 

যখন কোনো ব্যক্তি অধিক মুনাফার আশায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আটকে রেখে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে, তখন সে মূলত মানুষের দুর্দশা ও অসহায়ত্বকে নিজের স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ারে পরিণত করে। ফলে মানুষের মনে তার প্রতি স্বাভাবিকভাবেই ঘৃণার জন্ম হয়।

রাসুল (সা.) বলেন, ‘মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিব ও হাত থেকে অন্য মুসলমানরা নিরাপদ থাকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০)

একজন প্রকৃত মুমিনের পরিচয় হলো মানুষের জন্য কল্যাণ ও স্বস্তির কারণ হওয়া, কিন্তু মজুতদার তার সম্পূর্ণ বিপরীত ভূমিকা পালন করে।

সম্পদের বরকত থেকে বঞ্চিত হওয়া

অনেক সময় বিপুল সম্পদও মানুষের জীবনে শান্তি ও তৃপ্তি বয়ে আনতে পারে না, আবার অল্প সম্পদেও মানুষ স্বস্তি ও পরিতৃপ্তির জীবন যাপন করতে পারে। 

তাই ইসলাম সম্পদের বাহ্যিক প্রাচুর্যের চেয়ে তার বরকতকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছে। হারাম উপায়ে উপার্জিত সম্পদে বরকত থাকে না।

কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বৃদ্ধি করেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৬)

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, সুদের সম্পদ কখনো সম্পূর্ণরূপে মালিকের হাতছাড়া হয়ে যায়, আর কখনো সম্পদের বরকত উঠে যায়, ফলে বিপুল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও সে এর প্রকৃত কল্যাণ ও উপকার থেকে বঞ্চিত থাকে। বরং সেই সম্পদই দুনিয়ায় তার দুর্ভোগের কারণ এবং আখেরাতে শাস্তির উপকরণে পরিণত হয়। (তফসিরে ইবনে কাসির, ১/৫৮০, দারুল কিতাব আল-আরবি, বৈরুত, ২০১১)

মজুতদারির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদও একইভাবে বরকতশূন্য।

আল্লাহর নিকট জবাবদিহি

মজুতদারির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, এর কুফল সমাজের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি আঘাত হানে। ধনীরা অধিক মূল্যে প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হলেও নিম্নবিত্ত, দিনমজুর ও সীমিত আয়ের মানুষেরা চরম দুর্ভোগে পতিত হয়। 

অনেক সময় তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জীবনোপকরণ সংগ্রহ করাই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এভাবে মজুতদারি দুর্বল মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন করে এবং তাদের দুর্ভোগকে আরও তীব্র করে তোলে।

অতএব মজুতদার সমাজের দুর্বল ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কষ্টের জন্য নৈতিকভাবে দায়ী। এর জন্য আল্লাহর কাঠগড়ায় তাকে জবাবদিহি করতে হবে।

হাদিসে এসেছে, পরকালে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ছাড়া কেউ আল্লাহর সামনে থেকে নড়তে পারবে না। তন্মধ্যে একটি হলো তার সম্পদ কীভাবে অর্জন করেছে এবং কী কী খাতে ব্যয় করেছে। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪১৭)

পণ্য মজুত করার বিধান

ইসলামে সব ধরনের পণ্য মজুত করাকে হারাম বলা হয়নি। বরং মজুতদারির বিধান নির্ভর করে এর উদ্দেশ্য, পণ্যের ধরন এবং এর ফলে মানুষের ওপর কী প্রভাব পড়ছে তার ওপর।

নিজের পরিবার ও ব্যবসায়িক প্রয়োজনের জন্য স্বাভাবিক পরিমাণে পণ্য সংরক্ষণ করা বৈধ, তবে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অধিক মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বাজার থেকে তুলে রাখা নিষিদ্ধ ও গুনাহের কাজ। (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি, ৭/১২১, আর-রিসালাতুল আলামিয়্যাহ, দামেস্ক, ২০১৩)

বর্তমান সময়ে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবার উচিত মজুতদারি প্রতিরোধে সচেতন হওয়া এবং ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী বাজারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা।

ফয়জুল্লাহ রিয়াদ: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।

ফয়জুল্লাহ রিয়াদ: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ