কোরআন

সুদকে বৈধ মনে করার ক্ষতি কী

ইসলামের অকাট্য বিধানগুলোর মধ্যে সুদ (রিবা) নিষিদ্ধ হওয়া অন্যতম। কোরআন, সুন্নাহ ও উম্মাহর সর্বসম্মত ঐক্যের ভিত্তিতে সুদের নিষিদ্ধতা প্রমাণিত। ফলে কোনো মুসলিম যদি সুদের নিষিদ্ধতাকে অস্বীকার করে বা একে বৈধ মনে করে, তবে তার ইমানি অবস্থান নিয়ে তাত্ত্বিক ও আইনি পর্যালোচনার অবকাশ তৈরি হয়।

ইসলামের সাধারণ নিয়ম হলো, এমন কোনো বিধান যা অকাট্যভাবে প্রমাণিত এবং যা সাধারণ ও বিশেষজ্ঞ—সকল স্তরের মুসলিমের কাছে স্পষ্টভাবে পরিচিত, তা অস্বীকার করা ইসলামি বিশ্বাস পরিপন্থী। 

শাইখ সালেহ আল-মুনাজ্জিদের মতে, সুদ কোরআন, সুন্নাহ ও অকাট্য ইজমা দ্বারা হারাম। তাই কেউ যদি একে হালাল মনে করে, তবে সে মূলত ইসলামের একটি মৌলিক স্তম্ভকেই অস্বীকার করল।

সলামের প্রকাশ্য ও অকাট্য ওয়াজিব বিষয়গুলোর ওপর বিশ্বাস রাখা এবং প্রকাশ্য ও অকাট্য হারাম বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকা ইমানের অন্যতম মূল ভিত্তি।

অপরিহার্য বিষয় অস্বীকারের বিধান

‘ইনকার’ বা অস্বীকার করার অর্থ হলো সত্যকে গোপন করা বা স্বীকৃতি না দেওয়া। ইসলামের এমন কিছু বিধান রয়েছে যা অকাট্য সূত্রে (মুতাওয়াতির) প্রমাণিত। যেমন—পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জাকাত, রোজার আবশ্যকতা এবং ব্যভিচার, মদ ও সুদের নিষিদ্ধতা।

ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর মতে, ইসলামের প্রকাশ্য ও অকাট্য ওয়াজিব বিষয়গুলোর ওপর বিশ্বাস রাখা এবং প্রকাশ্য ও অকাট্য হারাম বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকা ইমানের অন্যতম মূল ভিত্তি। এসব অকাট্য বিধানকে অস্বীকার করলে সর্বসম্মতভাবে সে ইমান হারিয়েছে বলে গণ্য হয়। (মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ১৬৩)

একই প্রসঙ্গে ইমাম ইবনে কুদামা (রহ.) তাঁর আল-মুগনি গ্রন্থে লিখেছেন, “যে ব্যক্তি এমন কোনো বিষয়কে হালাল মনে করে যার নিষিদ্ধতার ওপর ঐক্যমত্য রয়েছে এবং সাধারণ মুসলিমদের মাঝেও সেই বিধানটি সুপরিচিত ও সুস্পষ্ট, যেমন—শূকরের মাংস বা ব্যভিচার; তবে সে কুফরিতে লিপ্ত হলো।” (ইবনে কুদামা, আল-মুগনি, ১২/২৭৬, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত)

এমন কিছু বিধান আছে যা কেবল বিশেষজ্ঞ আলেমরাই জানেন—যেমন দাদির মিরাসের অংশ বা বিশেষ কিছু আইনি মারপ্যাঁচ—সেসব বিষয় অস্বীকার করলে কেউ ইমানহারা হয় না।

সুদের নিষিদ্ধতা অস্বীকার করা যাবে না

শাইখ ইবনে উসাইমিন (রহ.)–এর মতে, সুদ কেবল হারামই নয়, বরং এটি কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। কোনো মুসলিম সমাজে বাস করে যদি কেউ সুদের নিষিদ্ধতাকে অস্বীকার করে, তবে সে ইসলামত্যাগী হিসেবে গণ্য হবে। কারণ এটি একটি প্রকাশ্য ও সুনিশ্চিত হারাম বিষয়। (আশ-শারহুল মুমতি আলা জাদিল মুস্তাকনি, ৮/৩৩৫, দার ইবনুল জাওজি, সৌদি আরব)

অজ্ঞতা কি ক্ষমার যোগ্য

ইমাম নববি (রহ.)–এর মতে, যদি কোনো ব্যক্তি নতুন মুসলিম হন এবং ইসলামের সীমানা সম্পর্কে তাঁর স্পষ্ট ধারণা না থাকে, তবে না জানার কারণে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কাফের হবেন না। তাঁকে আগে শিক্ষা দিতে হবে।

বর্তমান বিশ্বের আধুনিক ব্যাংকিং বা বিশেষ কিছু লেনদেনের ধরন সুদের অন্তর্ভুক্ত কি না, তা নিয়ে ফকিহদের মধ্যে ইজতিহাদ বা গবেষণার সুযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে, এমন কিছু বিধান আছে যা কেবল বিশেষজ্ঞ আলেমরাই জানেন—যেমন দাদির মিরাসের অংশ বা বিশেষ কিছু আইনি মারপ্যাঁচ—সেসব বিষয় অস্বীকার করলে কেউ ইমানহারা হয় না। কারণ এসব তথ্য সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচারিত নয়। (শারহু সহিহ মুসলিম, ১/১৫০, দারু ইহয়াইত তুরাসিল আরাবি, বৈরুত)

একটি সতর্কতা

সুদ হারাম হলেও এর প্রতিটি শাখা বা রূপ নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ থাকতে পারে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাডেমিক দিক।

বর্তমান বিশ্বের আধুনিক ব্যাংকিং বা বিশেষ কিছু লেনদেনের ধরন সুদের অন্তর্ভুক্ত কি না, তা নিয়ে ফকিহদের মধ্যে ইজতিহাদ বা গবেষণার সুযোগ রয়েছে।

কাজেই কেউ যদি সুদের কোনো বিশেষ রূপ (যা নিয়ে আলেমদের মাঝে বিতর্ক আছে) নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করে বা সেটিকে বৈধ মনে করে, তবে তাকে ইমানহারা বলা যাবে না। হ্যাঁ, যদি কেবল প্রবৃত্তির অনুসারী হয়ে কোনো হারামকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন, তবে তিনি পাপাচারী হিসেবে গণ্য হবেন।

মনে রাখতে হবে, পবিত্র কোরআনে সুদখোরদের বিরুদ্ধে আল্লাহর পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৯)

রাসুল (সা.) সুদখোর, সুদদাতা, এর লেখক ও এর সাক্ষী—সকলের ওপর লানত বা অভিশাপ দিয়েছেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৮)