পাথেয়

প্রাণীর অধিকার রক্ষায় ইসলামের ১০ নীতি

ইসলাম মানুষের ওপর প্রাণীর অনেকগুলো অধিকার ন্যস্ত করেছে। সেই অধিকারগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

১. খাদ্য ও পানীয় সরবরাহ

প্রাণীর মালিকের ওপর আবশ্যিক কর্তব্য হলো তাকে খাবার দেওয়া, চারণভূমিতে নেওয়া এবং পানি পান করানো। কারণ প্রতিটি প্রাণীর জীবনের পবিত্রতা ও মূল্য আছে।

একটি বিড়ালকে আটকে রেখে মেরে ফেলার কারণে এক নারী দোজখি হয়েছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬১৯)

অন্যদিকে, তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে এক পাপাচারী নারীকে ক্ষমা করা হয়েছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩২১)

রাসুল (সা.) বলেছেন, “প্রত্যেক তৃষ্ণার্ত প্রাণীকে পানি পান করানোর মধ্যে সওয়াব রয়েছে।” (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৫৮৮২)

যদি কোনো প্রাণী নিজে চরে খেতে না পারে, তবে মালিককে খাবার দিতে হবে। আর যদি মালিক খাবার দিতে অস্বীকার করে, তবে বিচারক তাকে প্রাণীটি বিক্রি করতে, খাবার দিতে অথবা (হালাল হলে) জবাই করতে বাধ্য করবেন।

২. কষ্ট বা যন্ত্রণা না দেওয়া

রাসুল (সা.) একবার একটি পাখির বাচ্চার প্রতি মা পাখির ব্যাকুলতা দেখে বলেছিলেন, “কে এই পাখিটিকে তার বাচ্চার জন্য কষ্ট দিচ্ছে? ওর বাচ্চা ওকে ফিরিয়ে দাও।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৬৭৫)

ইবনে ওমর (রা.) একদল যুবককে দেখেছিলেন যারা একটি পাখিকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে তীর ছুড়ছিল; তিনি তাদের দেখে বলেন, “রাসুল (সা.) অভিশাপ দিয়েছেন ওই ব্যক্তিকে, যে কোনো প্রাণীকে লক্ষ্যবস্তু বানায়।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৫১৫)

প্রাণীকে আঘাত করা, মুখে ছ্যাঁকা দেওয়া বা তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে মারা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

৩. বিনোদনের নামে কষ্ট না দেওয়া

ইসলাম প্রাণীদের লড়াই লাগিয়ে তামাশা দেখা (যেমন মোরগ লড়াই, ষাঁড়ের লড়াই বা ভেড়ার লড়াই) হারাম ঘোষণা করেছে। কারণ এতে প্রাণীকে অহেতুক যন্ত্রণা দেওয়া হয়। বিনোদনের উদ্দেশ্যে প্রাণীর ওপর নিষ্ঠুরতা ইসলামের সভ্য ও মানবিক দর্শনের পরিপন্থী।

৪. লানত বা গালি না দেওয়া

সহিহ মুসলিমে এসেছে, এক নারী তার উটকে অভিশাপ দেওয়ায় রাসুল (সা.) তাকে উট থেকে নেমে যেতে বলেন এবং উটটিকে মুক্ত করে দেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৯৫)

এমনকি তিনি মোরগকে গালি দিতেও নিষেধ করেছেন, কারণ সে নামাজের জন্য মানুষকে জাগ্রত করে। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২১৬৭৯)

৫. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা

রাসুল (সা.) নিজেও ঘোড়ার যত্ন নিতেন। তাকে একবার নিজের চাদর দিয়ে ঘোড়ার মুখ মুছতে দেখা গিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, তাকে ঘোড়ার যত্নের ব্যাপারে (আল্লাহর পক্ষ থেকে) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (মুআত্তা মালিক, হাদিস: ১৬৯৮)

৬. পিঠকে মিম্বর বা আসন না বানানো

রাসুল (সা.) বলেছেন, “তোমরা তোমাদের পশুর পিঠকে মিম্বর বানিও না।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৫৬৭)

অর্থাৎ, প্রয়োজন ছাড়া দীর্ঘক্ষণ পশুর পিঠে বসে আড্ডা দেওয়া বা দাঁড়িয়ে থাকা উচিত নয়। পশু কেবল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার বাহন।

৭. সাধ্যাতীত বোঝা না চাপানো

প্রাণীর ওপর অতিরিক্ত বোঝা চাপানো নিষেধ। এমনকি কোনো একটি পশুর ওপর একসঙ্গে তিনজনের সওয়ার হওয়াও রাসুল (সা.) অপছন্দ করেছেন। (তাবরানি, আওসাত, হাদিস: ৭৫০৮)

যে প্রাণী যে কাজের জন্য নয় (যেমন গরু আরোহণের জন্য নয়) তাকে সেই কাজে ব্যবহার করা উচিত নয়।

৮. যাত্রাপথে বিশ্রাম ও চারণের সুযোগ

দীর্ঘ ভ্রমণে যদি ঘাসযুক্ত জমি পাওয়া যায়, তবে উট বা পশুকে সেখান থেকে খাওয়ার সুযোগ দিতে রাসুল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৮৫৮)

৯. দয়ার সঙ্গে জবাই করা

জবাই করার সময় পশুকে কষ্ট দেওয়া যাবে না। রাসুল (সা.) বলেছেন, “তোমরা যখন জবাই করবে, তখন দয়ার সঙ্গে করো। ছুরি ধারালো করে নাও যাতে পশুটি দ্রুত আরাম পায়।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯৫৫)

এক পশুর সামনে অন্য পশু জবাই করাও অনুচিত।

১০. উপযুক্ত পরিবেশ ও যত্ন

পশুর রশি বা লাগাম যেন তাকে কষ্ট না দেয়, তাকে যেন তীব্র শীত বা প্রচণ্ড গরমে অরক্ষিত রাখা না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা মালিকের দায়িত্ব।

এই হলো প্রাণী অধিকারের সেই মহান নীতিমালা যা ইসলাম চৌদ্দশ বছর আগেই প্রদান করেছে। মুসলিম বিজ্ঞানী, চিন্তাবিদ ও শাসকরা যুগে যুগে এই অধিকারগুলো বাস্তবায়ন করেছেন। বর্তমান সময়েও এই মানবিক শিক্ষাগুলোর প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি।

abdullahalbaqi00@gmail.com

আবদুল্লাহিল বাকি: আলেম, লেখক ও সফটওয়্যার প্রোগ্রামার