মাসআলা

চোরাই পণ্য কেনাবেচায় ইসলামের বিধান কী

কারও সম্পদ অন্যায়ভাবে দখল বা চুরি করা যেমন বড় পাপ (কবিরা গুনাহ), তেমনি চোরাই মাল কেনা, বিক্রি করা কিংবা এর বাজার সৃষ্টি করাও একই অপরাধ–চক্রের অংশ। চোরাই মাল সহজেই বিক্রি হয় বলে চোরেরা বারবার চুরি করার সাহস পায়।

আজকাল অস্বাভাবিক কম দামে মুঠোফোন, ল্যাপটপ, মোটরসাইকেল, স্বর্ণালংকার বা অন্যান্য মূল্যবান জিনিস বিক্রির ঘটনা অহরহ দেখা যায়। অনেকে কম দামের লোভে এসব কিনে ফেলেন, অথচ এর পেছনে চুরি-ডাকাতি বা ছিনতাইয়ের ঘটনা লুকিয়ে থাকতে পারে। শুধু দাম নয়, পণ্যের বৈধতার বিষয়েও সমান গুরুত্ব দেওয়া একজন মুসলমানের দায়িত্ব।

চুরি তখনই বাড়ে, যখন চোর জানে যে তার পণ্য সহজেই বিক্রি হয়ে যাবে। যারা কম দামের লোভে এসব কেনে, তারাই মূলত চোরের জন্য বাজার তৈরি করে দেয়।

চুরি করা পণ্য কেনা হারাম

ইসলামেন মৌলিক নীতি হলো, কোনো ব্যক্তি যে সম্পদের মালিক নয়, সে সেই সম্পদ বিক্রি করার অধিকারও রাখে না। চোর কখনো চুরি করা সম্পদের বৈধ মালিক হয় না, ফলে তার বিক্রয়ও বৈধ নয় এবং সেই পণ্য ক্রয় করাও শরিয়তসম্মত নয়।

রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জেনেশুনে চুরিকৃত বস্তু ক্রয় করে, সে চুরির অপরাধ ও লজ্জায় অংশীদার হয়ে যায়।’ (সুয়ুতি, জামে সগির, হাদিস: ৮৪২৪)

তাই একজন মুসলমানের জন্য চোরাই পণ্য ক্রয় করে লাভবান হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

চোরকে উৎসাহিত করা নিষেধ

চুরি তখনই বাড়ে, যখন চোর জানে যে তার পণ্য সহজেই বিক্রি হয়ে যাবে। যারা কম দামের লোভে এসব কেনে, তারাই মূলত চোরের জন্য বাজার তৈরি করে দেয়।

আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নেককাজ ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে একে অপরকে সহযোগিতা করো, পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করো না।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ২)

চোরাই সামগ্রী কেনা এই নির্দেশের সরাসরি লঙ্ঘন, কারণ এতে চোরকে তার অপরাধ চালিয়ে যেতে সহযোগিতা করা হয়।

রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমার ভাইকে সাহায্য করো, সে অত্যাচারী হোক বা অত্যাচারিত।’ এক সাহাবি জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, সে যদি অত্যাচারিত হয়, তাহলে আমি তাকে সাহায্য করব। কিন্তু যদি সে অত্যাচারী হয়, তাহলে কীভাবে তাকে সাহায্য করব?’ তিনি বললেন, ‘তুমি তাকে জুলুম থেকে বিরত রাখবে বা বাধা দেবে, এটিই তার সাহায্য।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৯৫২)

চোরাই পণ্য কেনা তাকে বিরত রাখা নয়, বরং তার অপরাধকে লাভজনক করে তোলা। এতে সমাজে চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতি বাড়বে বৈ কমবে না।

কোনো আইনজীবী যদি নিশ্চিতভাবে জানেন যে তাঁর মক্কেল অন্যায়ের ওপর রয়েছে, তাহলে তাঁর পক্ষে মামলা পরিচালনা করা বৈধ নয়।

চুরির পণ্য কি বৈধ করা যায়

অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করলে তা কোনো অবস্থাতেই বৈধ হয়ে যায় না। এমনকি বিরোধ আদালতে গড়ালেও এবং অন্যায়কারী চতুরতার সঙ্গে রায় নিজের পক্ষে নিয়ে নিলেও সম্পদটি তার জন্য হালাল হয় না।

কারণ, বিচারকের রায় হারামকে হালাল বা বাতিলকে সত্যে পরিণত করতে পারে না। বিচারক কেবল উপস্থাপিত প্রমাণের ভিত্তিতে রায় দেন, কিন্তু প্রকৃত সত্য অপরিবর্তিতই থাকে। বরং জেনেশুনে এমন প্রতারণা করলে অপরাধ আরও গুরুতর হয় এবং শাস্তিও কঠিনতর হয়। (তাফসিরে ইবনে সাদি, পৃষ্ঠা ৮৮, মুআসসাসাহ আর-রিসালাহ, বৈরুত, ২০০২)

হাদিসে এসেছে, আনসারদের দুই ব্যক্তি উত্তরাধিকারসংক্রান্ত একটি পুরোনো বিরোধ নিয়ে রাসুল (সা.)-এর কাছে বিচারপ্রার্থী হয়ে এলেন। তাঁদের মধ্যে কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ ছিল না।

তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘তোমরা নিজেদের বিরোধ নিয়ে আমার কাছে আসো। আমি তো একজন মানুষ মাত্র। হতে পারে, তোমাদের কেউ নিজের বক্তব্য উপস্থাপনে অন্যজনের চেয়ে বেশি দক্ষ। আমি যা শুনি, তার ভিত্তিতেই তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করি। সুতরাং আমার রায়ের কারণে যদি কেউ তার ভাইয়ের কোনো অধিকার পেয়ে যায়, তবে সে যেন তা গ্রহণ না করে। কারণ, আমি তার জন্য জাহান্নামের আগুনের একটি খণ্ডই নির্ধারণ করছি, যা সে কিয়ামতের দিন নিজের গলায় বহন করে নিয়ে আসবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৬৮০)

এ কারণেই কোনো আইনজীবী যদি নিশ্চিতভাবে জানেন যে তাঁর মক্কেল অন্যায়ের ওপর রয়েছে, তাহলে তাঁর পক্ষে মামলা পরিচালনা করা বৈধ নয়। কেননা, আল্লাহ বলেছেন, ‘আপনি খেয়ানতকারীদের পক্ষসমর্থক হবেন না।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১০৫)

ভুলবশত কিনলে করণীয় কী

কেউ অজ্ঞতাবশত চোরাই মাল কিনে পরে জানতে পারলে বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।

  • প্রথমত, আন্তরিকভাবে তওবা করতে হবে।

  • দ্বিতীয়ত, সম্ভব হলে প্রকৃত মালিককে সম্পদ ফিরিয়ে দিতে হবে, কারণ তার অধিকার এখনো বহাল। শুধু চোরকে টাকা ফেরত দেওয়া বা মাল নিজের কাছে রেখে দেওয়া সমাধান নয়।

  • প্রকৃত মালিককে খুঁজে পাওয়ার সব চেষ্টা ব্যর্থ হলে, সমমূল্য গরিব-অসহায়দের মধ্যে সদকা করে দিতে হবে। (খলিল আহমদ সাহরানপুরি, বাজলুল মাজহুদ ফি হাল্লি সুনানি আবি দাউদ, ১/৩৫৯, দারুল বাশায়ির আল-ইসলামিয়া, বৈরুত, ২০০৬)

বাজারে কোনো পণ্য অস্বাভাবিক কম দামে বিক্রি হলে বা পণ্যের উৎস নিয়ে সন্দেহ থাকলে একজন মুমিনের উচিত তা কেনা থেকে বিরত থাকা।

সন্দেহজনক লেনদেন না করা

হারামের আশঙ্কা আছে এমন বিষয় থেকেও দূরে থাকার শিক্ষা দেয় ইসলাম। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যা তোমাকে সন্দেহে ফেলে, তা পরিত্যাগ করে এমন বিষয় গ্রহণ করো, যা তোমাকে সন্দেহে ফেলে না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৫১৮)

আরেক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘হালাল স্পষ্ট, হারামও স্পষ্ট। আর এ দুয়ের মাঝে কিছু সন্দেহজনক বিষয় রয়েছে। একজন মুমিন সন্দেহজনক বিষয় থেকে নিজেকে বিরত রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২)

কাজেই বাজারে কোনো পণ্য অস্বাভাবিক কম দামে বিক্রি হলে, বিক্রেতা মালিকানার প্রমাণ দেখাতে না পারলে, বা পণ্যের উৎস নিয়ে সন্দেহ থাকলে একজন মুমিনের উচিত তা কেনা থেকে বিরত থাকা।

সাময়িক লাভের আশায় সন্দেহজনক লেনদেনে জড়ানো দুনিয়া ও আখিরাত উভয় দিক থেকেই ক্ষতির কারণ হতে পারে। ব্যক্তিগত সচেতনতা বাড়লে চোরাই মালের বাজার সংকুচিত হবে, সমাজে চুরি-ডাকাতিও কমে আসবে।

  • ফয়জুল্লাহ রিয়াদ : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।