ইসলামি সভ্যতার ইতিহাসে এমন বহু মহামনীষীর আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁদের জ্ঞান, তাকওয়া ও অবদান আজও মুসলিম উম্মাহকে পথ দেখায়। তাঁদেরই অন্যতম হলেন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস, ফকিহ ও আকিদাবিদ ইমাম আবু জাফর আহমদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে সালামাহ তাহাবি (রহ.)।
তাঁর রচিত গ্রন্থগুলো, বিশেষত আল-আকিদাতুত তাহাবিয়া বিশ্বের বহু মাদ্রাসা ও উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আজও গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্য হিসেবে সমাদৃত।
জন্ম ও শৈশব
ইমাম তাহাবি হিজরি ২৩৯ সনে মিসরের ‘তাহা’ নামক অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত ‘তাহাবি’ উপাধি মূলত তাঁর এই জন্মস্থানের সঙ্গেই সম্পর্কিত। তিনি শৈশব থেকেই একটি ধর্মপ্রাণ ও জ্ঞানসমৃদ্ধ পরিবারে বেড়ে ওঠেন।
তিনি বিশেষভাবে তাঁর মামা ইমাম মুজানির সান্নিধ্যে আসেন, যিনি ছিলেন ইমাম শাফেয়ির অন্যতম প্রধান শিষ্য। তাঁর কাছ থেকে ইমাম তাহাবি ফিকহ, দলিলভিত্তিক মাসআলা নির্ণয়ের পদ্ধতি এবং মতভেদের আদব শিক্ষা লাভ করেন।
তাঁর পিতা ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম। ফলে ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে জ্ঞানার্জনের প্রবল আগ্রহ দেখা যায়। তিনি অল্প বয়সেই পবিত্র কোরআনের হাফেজ হন এবং অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ও প্রখর মেধার পরিচয় দেন। এই গুণাবলিই পরবর্তীকালে তাঁকে জ্ঞানের উচ্চ শিখরে পৌঁছে দেয়।
জ্ঞানার্জনের পথে
প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির পর তিনি মিসরের খ্যাতিমান মুহাদ্দিস ও ফকিহদের নিকট হাদিস ও ফিকহ অধ্যয়ন শুরু করেন। তিনি শুধু গ্রন্থপাঠে সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং আলেমদের দরসে নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন, মনোযোগ দিয়ে শুনতেন এবং জিজ্ঞাসার মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করতেন।
এ সময় তিনি বিশেষভাবে তাঁর মামা ইমাম মুজানির সান্নিধ্যে আসেন, যিনি ছিলেন ইমাম শাফেয়ির অন্যতম প্রধান শিষ্য। তাঁর কাছ থেকে ইমাম তাহাবি ফিকহ, দলিলভিত্তিক মাসআলা নির্ণয়ের পদ্ধতি এবং মতভেদের আদব শিক্ষা লাভ করেন।
ঐতিহাসিক ঘটনা
ইতিহাসবিদদের বর্ণনায় পাওয়া যায়, ইমাম তাহাবি ছিলেন অত্যন্ত সত্যসন্ধানী ও অনুসন্ধিৎসু। তিনি প্রায়ই বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর মামা ইমাম মুজানিকে প্রশ্ন করতেন। একদিন তাঁর অতি-জিজ্ঞাসায় কিছুটা বিরক্ত হয়ে ইমাম মুজানি বলেছিলেন, ‘আল্লাহর কসম, তুমি কখনোই কিছু করতে পারবে না।’
এই কথাটি তরুণ তাহাবির হৃদয়ে গভীর দাগ কাটে। তবে তিনি হতাশ হননি, বরং এই মনস্তাত্ত্বিক ধাক্কাই তাঁকে আরও বেশি অধ্যবসায়ী ও কঠোর পরিশ্রমী করে তোলে।
তিনি ছিলেন নির্ভরযোগ্য, দৃঢ়চেতা, ফকিহ ও প্রাজ্ঞ পণ্ডিত। তাঁর পরে আর কেউ তাঁর সমকক্ষ হতে পারেননি।তাহাবি সম্পর্কে ইমাম ইবনে আসাকির (রহ.)
তিনি নিজেকে জ্ঞানচর্চায় এমনভাবে নিয়োজিত করেন যে পরবর্তীকালে সমকালীন বহু আলেমকেও ছাড়িয়ে যান। (ইবনুল ইমাদ আল-হানবালি, শাজারাতুজ জাহাব ফি আখবারি মান জাহাব, ৪/১০৫, দার ইবনে কাছির, বৈরুত, ১৯৮৯)
সত্যের অনুসন্ধান
প্রথম জীবনে ইমাম তাহাবি (রহ.) শাফেয়ি মাজহাবের অনুসারী ছিলেন। এ সময় তিনি ফিকহে শাফেয়ি গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন এবং এর দলিলগুলো বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করতেন। তবে তিনি অন্ধ অনুকরণের ঘোর বিরোধী ছিলেন।
সত্য অনুসন্ধানের মানসিকতা থেকেই তিনি অন্যান্য মাজহাবের মতামতও বিচার-বিশ্লেষণ করতে শুরু করেন। দীর্ঘ অধ্যয়নের একপর্যায়ে তিনি সপ্রমাণ উপলব্ধি করেন যে হানাফি মাজহাবের দলিল ও আইনি বিশ্লেষণ বহু ক্ষেত্রে অত্যন্ত শক্তিশালী ও সুসংহত।
ফলে তিনি শাফেয়ি মাজহাব ত্যাগ করে হানাফি মাজহাব গ্রহণ করেন। (আহমাদ সিদ্দিকি, ইজাহুত তাহাবি, ১/৪৮, জাকারিয়া বুক ডিপো, দেওবন্দ, অখণ্ড)
তাঁর এই সিদ্ধান্ত কোনো আবেগ বা দলীয় প্রভাবের ফল ছিল না, বরং এটি ছিল নিখাদ জ্ঞান ও সত্য অনুসন্ধানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি বিশ্বাস করতেন, সত্য যেখানে পাওয়া যাবে, একজন আলেমের প্রধান কর্তব্য সেটিই গ্রহণ করা।
কালজয়ী অবদান
তাহাবি যেমন ছিলেন একজন অসাধারণ মুহাদ্দিস ও ফকিহ, তেমনি লেখক হিসেবেও ছিলেন অতুলনীয়। তাঁর রচনাশৈলী ছিল সহজ, প্রাঞ্জল ও যুক্তিনির্ভর। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে:
শারহু মাআনিল আছার: এতে তিনি হাদিসগুলোর ফিকহি বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন ফিকহি মতের চমৎকার সমন্বয় তুলে ধরেছেন।
মুশকিলুল আছার: আপাতদৃষ্টে পরস্পরবিরোধী মনে হওয়া হাদিসগুলোর যৌক্তিক ব্যাখ্যা ও সমাধান নিয়ে রচিত এটি একটি অনন্য গ্রন্থ।
আল-আকিদাতুত তাহাবিয়া: এতে ‘আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’-এর বিশুদ্ধ আকিদা সংক্ষিপ্ত অথচ প্রাঞ্জল ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে, যা আজও আকিদা শাস্ত্রের অন্যতম প্রধান উৎস।
মনীষীদের মূল্যায়ন
ইমাম তাহাবির জীবন ছিল বিনয়, তাকওয়া ও জ্ঞানের এক অপূর্ব সমন্বয়। মতভেদের ক্ষেত্রেও তিনি সর্বদা শালীনতা ও উদারতা বজায় রাখতেন। কোনো বিষয়ে দ্বিমত হলে প্রতিপক্ষকে কখনো হেয় করতেন না; বরং দলিলভিত্তিক আলোচনা, যুক্তি ও প্রজ্ঞাকেই তিনি সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন।
দীর্ঘ অধ্যয়নের একপর্যায়ে তিনি সপ্রমাণ উপলব্ধি করেন যে হানাফি মাজহাবের দলিল ও আইনি বিশ্লেষণ বহু ক্ষেত্রে অত্যন্ত শক্তিশালী ও সুসংহত। ফলে তিনি শাফেয়ি মাজহাব ত্যাগ করে হানাফি মাজহাব গ্রহণ করেন।
হাদিস, ফিকহ ও আকিদা—ইসলামি জ্ঞানের প্রায় প্রতিটি শাখায় তাঁর সুদৃঢ় দক্ষতা ও গভীর পাণ্ডিত্যের কারণে তিনি সমকালীন ও পরবর্তী যুগের মনীষীদের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় হয়ে ওঠেন।
ইবনে আসাকির (রহ.) বলেন, ‘তিনি ছিলেন নির্ভরযোগ্য, দৃঢ়চেতা, ফকিহ ও প্রাজ্ঞ পণ্ডিত। তাঁর পরে আর কেউ তাঁর সমকক্ষ হতে পারেননি।’ (তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ৫-৬/৩৬৮, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৫)
হাফেজ জাহাবি (রহ.) তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন, ‘তিনি ছিলেন এক বিশাল আল্লামা, মহান হাফিজুল হাদিস এবং মিসরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফকিহ।’ (জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১১/৩৬১, দারুল হাদিস, কায়রো, ২০০৬)
ইন্তেকাল
৩২১ হিজরির জিলকদ মাসের শুরুতে, এক বৃহস্পতিবার প্রায় ৮০ বছর বয়সে এই মহান ইমাম ইন্তেকাল করেন। (জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১১/৩৬৩, দারুল হাদিস, কায়রো, ২০০৬)
তিনি নশ্বর দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেও তাঁর জ্ঞান, গবেষণা ও অনন্য রচনাবলি আজও মুসলিম উম্মাহর মাঝে জীবন্ত আলোকবর্তিকা হয়ে জ্বলছে।
রায়হান আল ইমরান: লেখক ও গবেষক