চিরন্তন জিজ্ঞাসার জবাব

মহান আল্লাহ কোথায় আছেন

প্রকৃতির নির্জন নিস্তব্ধতায়, যখন রাতের আকাশে অগণিত নক্ষত্র মিটমিট করে জ্বলে ওঠে, অথবা দিনের কর্মব্যস্ততায় যখন জীবন দ্রুতবেগে ছুটে চলে, তখন বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে একটি নিগূঢ় প্রশ্ন উঁকি দেয়, এই মহাবিশ্বের অর্থ কী?

আমাদের অস্তিত্বের উদ্দেশ্যই বা কী? আমরা কেন এখানে এসেছি? এই যে সুবিশাল আকাশ, উত্তাল সমুদ্র আর পর্বতের অটল দাঁড়িয়ে থাকা—এগুলো কি নিছকই দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে কোনো মহান শিল্পী কাজ করছেন?

যুগে যুগে আল্লাহকে খোঁজার প্রশ্ন

মানুষের অবচেতন মনে আল্লাহর ধারণাটি সহজাত বিদ্যমান। এমনকি যারা নিজেদের কোনো ধর্মের অনুসারী মনে করেন না, চরম বিপদ বা শোকের মুহূর্তে তারাও আকাশের দিকে তাকিয়ে এক অদৃশ্য সত্তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন। অন্তরের এই যে টান, এটাই আল্লাহকে চেনার প্রথম ধাপ।

আল্লাহকে চেনার এই আদিম আগ্রহ থেকেই মানুষ যুগ যুগ ধরে প্রশ্ন করে আসছে, আল্লাহ কোথায় আছেন? তিনি কি আমাদের খুব কাছে, নাকি অনেক দূরে? তিনি কি এই প্রকৃতিরই অংশ, নাকি প্রকৃতির অতীত কোনো সত্তা?

আল্লাহ কোথায় আছেন? তিনি কি আমাদের খুব কাছে, নাকি অনেক দূরে? তিনি কি এই প্রকৃতিরই অংশ, নাকি প্রকৃতির অতীত কোনো সত্তা?

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রাচীন ব্যাবিলনীয় ও মিশরীয়রা আল্লাহকে খুঁজতে বিশাল সব মিনার ও পিরামিড তৈরি করেছিল। পারস্যের লোকেরা তাকে আগুনের মাঝে খুঁজেছে। উত্তর আমেরিকার আদিবাসী বা কেল্টিক জাতিগোষ্ঠী প্রকৃতির বিশালতার মাঝে আল্লাহর অস্তিত্ব কল্পনা করেছে।

কোনো ধর্মে বিশ্বাস করা হয় আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান, আর কোনো দর্শনে আল্লাহকে খোঁজা হয় নিজের ভেতরের নির্বাণে।

কিন্তু এই ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ মানুষকে এক ধরনের বিভ্রান্তিতেও ফেলে দেয়। যদি আল্লাহ সবখানেই থাকেন, তবে নোংরা বা অপবিত্র স্থানেও কি তিনি আছেন? যদি তিনি অন্তরেই থাকেন, তবে অন্তরের শূন্যতায় তার অস্তিত্ব কোথায় হারায়? এই গোলকধাঁধায় ইসলামের ধারণাটি অত্যন্ত স্বচ্ছ ও যুক্তিনির্ভর।

ইসলাম কী বলে

ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, আল্লাহ বা আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টিজগতের ঊর্ধ্বে আসমানে অবস্থান করেন। তবে তিনি তাঁর জ্ঞান ও ক্ষমতার মাধ্যমে প্রতিটি সৃষ্টির সঙ্গেই আছেন। বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় যখন আমরা পবিত্র কোরআনের বর্ণনায়, “পরম করুণাময় আরশের উপর সমাসীন হয়েছেন।” (সুরা তাহা, আয়াত: ৫)

এই আয়াতটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে আল্লাহ তাআলার অবস্থান নির্দেশ করে। তিনি সুউচ্চ এবং মহান। তাঁর এই সুউচ্চতা তাঁর মর্যাদা এবং অবস্থান—উভয় দিক থেকেই সত্য। তিনি সৃষ্টির কোনো সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ নন, বরং সকল সৃষ্টির ঊর্ধ্বে তাঁর সার্বভৌমত্ব। (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ৫/২৮৭, দারুত তাইয়িবা, মদিনা, ১৯৯৯)

বিদায় হজের ভাষণে যখন সমবেত সাহাবিদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছিলেন, “আমি কি পৌঁছে দিয়েছি?” এবং সাহাবিরা যখন সমস্বরে উত্তর দিয়েছিলেন “হ্যাঁ”, তখন তিনি আকাশের দিকে আঙুল তুলে তিনবার বলেছিলেন, “হে আল্লাহ, তুমি সাক্ষী থাকো।”

আল্লাহ যে আসমানে আছেন, সে সম্পর্কে কোরআনের আরেকটি স্থানে বলা হয়েছে, “তোমরা কি নিরাপদ হয়ে গেছ যে যিনি আসমানে আছেন তিনি তোমাদেরকে জমিনসহ ধসিয়ে দেবেন না?” (সুরা মুলক, আয়াত: ১৬)

মানুষের স্বভাবজাত প্রবৃত্তিও কিন্তু এই সত্যের সাক্ষ্য দেয়। যখনই আমরা কোনো বিপদে পড়ি বা পরম আকুতিতে কোনো কিছু চাই, আমরা আমাদের হাত ও দৃষ্টি অজান্তেই আকাশের দিকে তুলে ধরি। এটি একটি প্রাকৃতিক প্রতিফলন যে পরম সত্তা আমাদের উপরে অবস্থান করছেন।

আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর জীবনচরিত ও হাদিস থেকেও আমরা এর বহু প্রমাণ পাই। একবার তিনি এক ক্রীতদাসীকে পরীক্ষা করার জন্য প্রশ্ন করেছিলেন, “আল্লাহ কোথায়?” মেয়েটি উত্তর দিয়েছিল, “আসমানে।” তখন তিনি তাকে ইমানদার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে মুক্ত করে দিতে বলেছিলেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫৩৭)

বিদায় হজের ভাষণে যখন সমবেত সাহাবিদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছিলেন, “আমি কি পৌঁছে দিয়েছি?” এবং সাহাবিরা যখন সমস্বরে উত্তর দিয়েছিলেন “হ্যাঁ”, তখন তিনি আকাশের দিকে আঙুল তুলে তিনবার বলেছিলেন, “হে আল্লাহ, তুমি সাক্ষী থাকো।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৭৩৯)

তাঁর এই আকাশের দিকে আঙুল তোলার ইঙ্গিত স্পষ্টতই আল্লাহর উচ্চতর অবস্থানকে নির্দেশ করে। এই সকল ঘটনা প্রমাণ করে, আল্লাহ আসমানে আছেন—এই বিশ্বাসটি একজন মুমিনের মৌলিক আকিদার অংশ।

আল্লাহ কতটা কাছে

তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় পরিষ্কার হওয়া জরুরি। আল্লাহ তাআলা আসমানে বা আরশের উপরে আছেন বলার অর্থ এই নয় যে, তিনি কোনো নির্দিষ্ট স্থানের মুখাপেক্ষী। বরং স্থান ও কাল তাঁরই সৃষ্টি। তিনি তাঁর আরশের উপর এমনভাবে আছেন যা তাঁর মহিমার উপযোগী, যার ধরন আমাদের জানা নেই। (ইমাম আবু হানিফা, আল-ফিকহুল আকবার, পৃষ্ঠা: ৪৬, মাকতাবাতুল ফুরকান, কায়রো, ২০০৫)

এর পাশাপাশি কোরআনে এও বলা হয়েছে, “তিনিই সেই সত্তা যিনি আসমানসমূহ ও জমিনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি আরশের উপর সমাসীন হয়েছেন। তিনি জানেন যা জমিনে প্রবেশ করে এবং যা তা থেকে বের হয়, আর যা আসমান থেকে নামে এবং যা তাতে আরোহণ করে। আর তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, তিনি তোমাদের সঙ্গেই আছেন। আর তোমরা যা করো আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।” (সুরা হাদিদ, আয়াত: ৪)

অনেকে এই ‘সঙ্গে থাকা’ শব্দটিকে ভুল ব্যাখ্যা করেন। তারা মনে করেন আল্লাহ সত্তাগতভাবে সব জায়গায় মিশে আছেন। কিন্তু ইসলামের মূল শিক্ষা হলো, আল্লাহ মানুষের সঙ্গে আছেন তাঁর জ্ঞান, শ্রবণ ও দর্শনের মাধ্যমে।

অর্থাৎ পৃথিবীর কোনো কিছুই তাঁর অগোচরে নয়। তিনি আরশের উপরে থেকেও আমাদের অন্তরের গোপনতম ইচ্ছার খবর রাখেন। (ইমাম ইবনে তাইমিয়া, আল-আকিদাতুল ওয়াসিতিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৭৫, দারুল হিজরাহ, রিয়াদ, ১৯৯৫)

আর আমার বান্দারা যখন আপনার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, আমি তো তাদের খুব কাছেই আছি। আমি প্রার্থনাকারীদের ডাকে সাড়া দিই যখন সে আমাকে ডাকে।
কোরআন, সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৬

তিনি আরো বলেছেন, “আর আমার বান্দারা যখন আপনার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, আমি তো তাদের খুব কাছেই আছি। আমি প্রার্থনাকারীদের ডাকে সাড়া দিই যখন সে আমাকে ডাকে।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৬)

‘কাছেই আছি’ বলতে কত কাছে আছেন, সে-সম্পর্কে সুরা ক্বাফ-এ বলছেন, “আমি মানুষের ঘাড়ের রগ থেকেও তার বেশি নিকটবর্তী।” (সুরা ক্বাফ, আয়াত: ১৬)

এই নৈকট্য হলো আধ্যাত্মিক এবং জ্ঞানগত নৈকট্য। তিনি তাঁর ক্ষমতার মাধ্যমে প্রতিটি অণু-পরমাণুর খবর রাখছেন। এই বিশ্বাস মানুষের মনে এই ভরসা যোগায় যে, জীবনের দুঃখ-কষ্ট বা অন্যায়ের বিচার হবেই, কারণ তাঁর দৃষ্টির আড়ালে কিছুই নেই। (মুহাম্মদ আল-গাজালি, আকিদাতুল মুসলিম, পৃষ্ঠা: ১২০, দারুল কলম, দামেস্ক, ২০০৩)

যখন কোনো মুমিন শোক বা বিপদে নিমজ্জিত হয়, সে প্রশ্ন করে না যে ‘আল্লাহ কোথায় ছিলেন?’ বরং সে জানে আল্লাহ তাঁর আরশের উপর থেকে সব দেখছেন এবং ধৈর্যশীলদের জন্য মহাপুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন। এই বিশ্বাসই তাকে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ভেঙে পড়তে দেয় না।

এই মহিমান্বিত আল্লাহকে চেনা এবং তাঁর বড়ত্ব অনুভব করাই হলো মানবজীবনের সার্থকতা। রাতের নিস্তব্ধতায় কিংবা দিনের কোলাহলে যখনই আমরা বিচলিত বোধ করি, আকাশের দিকে তাকিয়ে এই অনুভব করা উচিত যে, আমার রব উপরে আছেন এবং তিনি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন। এই পরম নির্ভরতাই মানুষকে প্রকৃত মুক্তি ও শান্তি দিতে পারে।