মানুষের নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে তাদের কেন অবর্ণনীয় যন্ত্রণা সহ্য করতে হয় প্রাণীদের? পরম দয়াময় কি এই অবলা প্রাণীদের ওপর জুলুম হতে দেন? আর পরকালেই বা তাদের পরিণতি কী হবে? তারা কি তাদের এই নিদারুণ কষ্টের কোনো প্রতিদান পাবে?
ইসলামি বিশ্বাসের মূল ভিত্তি হলো, মহান আল্লাহ ‘আল-আদল’ অর্থাৎ পরম ন্যায়বিচারক। তাঁর রাজত্বে অণু পরিমাণ অবিচারও উপেক্ষিত থাকে না। সৃষ্টির প্রতিটি স্পন্দনের হিসাব যেমন তাঁর কাছে রয়েছে, তেমনি অবলা প্রাণীর দীর্ঘশ্বাসও বৃথা যায় না।
অনেকে মনে করেন পুনরুত্থান শুধু মানুষের জন্যই নির্দিষ্ট। কিন্তু কোরআন বলছে, “ভূমণ্ডলে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই এবং দুই ডানা দিয়ে আকাশে ওড়ে এমন কোনো পাখি নেই, যারা তোমাদের মতোই এক একটি সম্প্রদায় বা জাতি নয়। আমি কিতাবে কোনো কিছুই বাদ দিইনি; অতঃপর তাদের সবাইকে তাদের আল্লাহর সমীপে একত্র করা হবে।” (সুরা আনআম, আয়াত: ৩৮)
প্রাণীদের মাঝে প্রতিবিধান কার্যকর করা হবে আল্লাহর পরম ন্যায়বিচার প্রমাণের জন্য। যাতে সমগ্র সৃষ্টি প্রত্যক্ষ করতে পারে যে, দুর্বলকে আঘাত করে পরাক্রমশালী কখনোই পার পেতে পারে না।
অনুরূপভাবে কেয়ামতের অন্যতম চূড়ান্ত আলামত হিসেবে পশুপাখির পুনরুত্থানকে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, “এবং যখন বন্য পশুপাখিদেরকে একত্র করা হবে।” (সুরা তাকবির, আয়াত: ৫)
এই আয়াতসমূহ দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে, এই পৃথিবীতে প্রাণীদের জীবন কোনো অর্থহীন বিষয় নয়; বরং তাদেরও একটি সার্বিক উপস্থিতির দিন রয়েছে।
পশুদের জগতে পারস্পরিক যে আঘাত ও রক্তপাত ঘটে, তার সুবিচার কীভাবে হবে?
নবীজি (সা.) এক হাদিসে স্পষ্ট করে দিয়েছেন, “কেয়ামতের দিন তোমরা অবশ্যই হকদারদের পাওনা ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হবে। এমনকি (দুনিয়ায় কোনো শিংওয়ালা ভেড়া যদি কোনো শিংবিহীন ভেড়াকে গুঁতো মেরে থাকে, তবে) শিংহীন ভেড়ার পক্ষ থেকেও শিংওয়ালা ভেড়ার কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করে সুবিচার নিশ্চিত করা হবে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮২)
প্রাণীরা নৈতিকভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত (মুকাল্লাফ) না হওয়া সত্ত্বেও তাদের মাঝে এই প্রতিবিধান কার্যকর করা হবে আল্লাহর পরম ন্যায়বিচার প্রমাণের জন্য। যাতে সমগ্র সৃষ্টি প্রত্যক্ষ করতে পারে যে দুর্বলকে আঘাত করে পরাক্রমশালী কখনোই পার পেতে পারে না। (ইমাম নববি, শারহু সহিহি মুসলিম, ১৬/১৩৫, দারু ইহয়ায়িত তুরাসিল আরাবি, খণ্ড: ১৬)
হাদিস অনুযায়ী প্রাণীদের পারস্পরিক বিরোধ নিষ্পত্তির পর তাদের মাটিতে পরিণত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে; যা দেখে কাফেররা আফসোস করে বলবে, ‘হায়, আমি যদি আজ মাটি হয়ে যেতাম!’
হাদিস অনুযায়ী প্রাণীদের পারস্পরিক বিরোধ নিষ্পত্তির পর তাদের মাটিতে পরিণত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে; যা দেখে কাফেররা আফসোস করে বলবে, ‘হায়, আমি যদি আজ মাটি হয়ে যেতাম!’ (সুরা নাবা, আয়াত: ৪০)
তবে প্রাণীদের আত্মিক অস্তিত্ব এবং তাদের কষ্টের প্রতিদান নিয়ে মুসলিম ধর্মতাত্ত্বিকদের মাঝে দুটি গভীর ধারা লক্ষ্য করা যায়:
ধ্রুপদী ধারার অভিমত: সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি পণ্ডিতদের মতে, পশুপাখির কোনো স্থায়ী বেহেশত বা দোজখ নেই। তাদের পুনরুত্থান ও পারস্পরিক প্রতিবিধান শুধু আল্লাহর অসীম ইনসাফ প্রদর্শনের জন্য। এরপর তাদের পার্থিব অস্তিত্ব বিলীন করে মাটিতে রূপান্তর করা হবে।
মুতাজিলা অভিমত: মুসলিম ধর্মতত্ত্বের প্রাচীন যুক্তিবাদী ধারা (বিশেষ করে মুতাজিলা পণ্ডিতগণ) দাবি করেছিলেন যে আল্লাহর নিরঙ্কুশ প্রজ্ঞা ও ইনসাফের দাবি হলো—যেকোনো নির্দোষ প্রাণী যদি যন্ত্রণা ভোগ করে, তবে তার জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ থাকা আবশ্যক।
মানুষের মতো না হলেও পশুপাখির নিজস্ব একটি চেতনা, ব্যথা অনুভবের ক্ষমতা এবং আত্মিক সত্তা রয়েছে। মানুষ যদি অন্যের দ্বারা নির্যাতিত হয়ে পরকালে পুরস্কৃত হতে পারে, তবে অবলা প্রাণীরা, বিশেষ করে যারা উন্নত বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন মানুষের নির্মম নিষ্ঠুরতার শিকার হয়, তাদের জন্য দয়াময় আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো না কোনো রূপের কল্যাণকর প্রতিদান থাকা একেবারেই যুক্তিগ্রাহ্য ও প্রত্যাশিত।
আল্লাহর অসীম রহমত কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়।