মূল বইয়ের মলাটের একটি ছবি
মূল বইয়ের মলাটের একটি ছবি

ইসলামি বই

‘রিভিলেশন’: মহানবীর (সা.) জীবনী রচনায় সর্বাধুনিক উপস্থাপনা

মহানবী (সা.)-এর জীবনীকে বলা হয় সিরাত। সিরাত পাঠ করা প্রতিটি মুসলিমের জন্য শুধু ইবাদত নয়, বরং সিরাত মানব ইতিহাসের এক মহত্তম অভিযাত্রাও বটে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্বজুড়ে হাজারো সিরাতগ্রন্থ রচিত হয়েছে।

কিন্তু আমরা যখন একবিংশ শতাব্দীর যান্ত্রিক ও তথ্যবহুল যুগে দাঁড়িয়ে পেছনের দিকে তাকাই, তখন আধুনিক প্রজন্মের পাঠকদের কাছে এই ধ্রুপদী জ্ঞানকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন হয় এক নতুন আঙ্গিকের। ঠিক এই অভাবটি পূরণ করতে ২০১৫ সালে ডা. মিরাজ মহিউদ্দিন লেখেন রিভিলেশন: দ্য স্টোরি অফ মুহাম্মদ (সা.) বইটি।

বইটি প্রকাশের পর থেকে ইংরেজিভাষী মুসলিম ও অমুসলিম পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়। মজার ব্যাপার হলো বইটি দেখলে মনে হয় না এটা কোনও জীবনীগ্রন্থ, বরং যেন একটি সুপরিকল্পিত ‘স্টাডি গাইড’ বা আধুনিক পাঠ্যবই।

রচনার নেপথ্য কথা

বইয়ের লেখক ডা. মেরাজ মহিউদ্দিন পেশায় একজন চিকিৎসক (অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট)। লেখক ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান। বেড়ে উঠেছেন নিউ জার্সিতে এবং নিউ জার্সির পাবলিক স্কুল সিস্টেমে লেখাপড়া করেছেন।

এক সময় সিরাতের প্রতি অনুরাগী হয়ে তিনি লক্ষ্য করেন যে সিরাত সাহিত্যের ধ্রুপদী ইংরেজি অনুবাদগুলো বেশ জটিল এবং দীর্ঘ বর্ণনামূলক। আধুনিক তরুণ প্রজন্মের জন্য যা পড়া কিছুটা দুরূহ।

বইয়ের ভেতরে চিত্র

জায়তুনা কলেজের সহপ্রতিষ্ঠাতা আমেরিকান মুসলিম পণ্ডিত শেখ হামজা ইউসুফ তার একটি বক্তব্যে এই মহানবীর জীবনীগ্রন্থগুলোর এই সমস্যাটি আরো বিশদভাবে তুলে ধরেন এবং বলেন, “যদি কেউ সিরাতের জটিল নাম ও বংশপরম্পরাগুলোকে একটি গ্লসারির মাধ্যমে সাজিয়ে দিত, তবে পাঠকদের জন্য সুবিধা হতো।”

ডা. মিরাজ সেই পরামর্শকে হৃদয়ে ধারণ করেন এবং দীর্ঘ ১৩ বছরের পরিশ্রমে ৪২৯ পৃষ্ঠার এই প্রামাণ্য বইটি রচনার কাজ সম্পন্ন করেন। এক্ষেত্রে তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলো যেমন ডায়াগ্রাম, টেবিল আর চার্টের মাধ্যমে আয়ত্ত করা হয়, সেই রীতি অনুসরণ করেন।

বইটির প্রতিটি পৃষ্ঠার পাশে একটি টাইমলাইন দেওয়া আছে, যা দেখে পাঠক মুহূর্তেই বুঝতে পারেন তিনি মহানবীর নবুয়তের কততম বছরে অবস্থান করছেন।

বইয়ের গঠন ও বিষয়বস্তু

‘রেভেলেশন’ বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি এর উপস্থাপনা। লেখক এখানে প্রধান তিনটি আকর গ্রন্থকে ভিত্তি হিসেবে নিয়েছেন: ১. সফিউর রহমান মোবারকপুরির ‘আর-রাহিকুল মাখতূম’, ২. মার্টিন লিংসের ‘মুহাম্মদ: হিজ লাইফ বেসড অন দ্য আর্লিয়েস্ট সোর্সেস’ এবং ৩. উইলিয়াম মন্টগোমারি ওয়াটের ‘মুহাম্মদ ইন মক্কা’ ও ‘মুহাম্মদ ইন মদিনা’।

এই তিনটি মূল সূত্রের পাশাপাশি তিনি তারিক রামাদান, ক্যারেন আর্মস্ট্রং, রেজা আসলান ও আদিল সালাহির মতো আধুনিক সিরাত লেখকদের বিশ্লেষণকে যুক্ত করেছেন।

লেখক নিজেকে একজন ‘শিক্ষার্থী’ মনে করে বইটিকে এমনভাবে সাজিয়েছেন যেন পাঠকরা একটি শ্রেণিকক্ষে বসে আছেন। যেখানে মূল লেখকরা লেকচার দিচ্ছেন এবং আধুনিক গবেষকরা ‘শিক্ষা সহকারী’ (টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট) হিসেবে বিভিন্ন বিতর্কিত বা সমকালীন বিষয়ের যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিচ্ছেন।

লেখক ডা. মিরাজ মহিউদ্দিন

দৃশ্যমান উপস্থাপনা: ডায়াগ্রাম ও মানচিত্র

বইটির প্রতিটি পাতায় তথ্যের ঘনঘটা থাকলেও তা বিরক্তিকর লাগে না। এর কারণ হলো বইটির চমৎকার ডিজাইন।

  • টাইমলাইন: বইটির প্রতিটি পৃষ্ঠার পাশে একটি টাইমলাইন দেওয়া আছে, যা দেখে পাঠক মুহূর্তেই বুঝতে পারেন তিনি মহানবীর নবুয়তের কততম বছরে অবস্থান করছেন।

  • বংশলতিকা ও মানচিত্র: আরবের জটিল গোত্রীয় রাজনীতি বোঝার জন্য লেখক অসংখ্য ফ্যামিলি ট্রি এবং পরিষ্কার মানচিত্র ব্যবহার করেছেন। কোরাইশদের ১৪টি গোত্রের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং শত্রুতাই যে ইসলামের প্রাথমিক যুগের অনেক ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল, তা এই চিত্রগুলোর মাধ্যমে পরিষ্কার হয়ে যায়।

  • কোরআনের আয়াত: বইটিতে প্রায় ৪০০টি কোরআনের আয়াত তাদের অবতরণের ক্রমানুসারে প্রাসঙ্গিকভাবে বসানো হয়েছে। ফলে পাঠক সিরাত পড়ার পাশাপাশি কোন প্রেক্ষাপটে কোন আয়াত নাজিল হয়েছিল, তা অনুভব করতে পারেন।

একটি উদাহরণ: হুদায়বিয়ার সন্ধি

বইটির গভীরতা বোঝার জন্য ১৯.৩ অধ্যায়ের ‘হুদায়বিয়ার সন্ধি’র আলোচনাটি দেখা যেতে পারে। প্রথাগত বইগুলোতে কেবল সন্ধির শর্তগুলো লেখা থাকে। কিন্তু এখানে লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে হজরত আলি (রা.) রাসুলের নামের পাশ থেকে ‘আল্লাহর রাসুল’ উপাধি মুছে দিতে দ্বিধাবোধ করছিলেন, আবার কেন রাসুল (সা.) সুহাইলের যুক্তির কাছে নমনীয় হয়েছিলেন।

লেখক এখানে উইলিয়াম ওয়াট ও শেখ হামজা ইউসুফের উদ্ধৃতি দিয়ে দেখিয়েছেন যে বাহ্যিকভাবে এই সন্ধি মুসলমানদের জন্য অপমানজনক মনে হলেও এটি ছিল আসলে একটি বিশাল রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিজয়।

সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন অনূদিত বইয়ের বাংলা অনুবাদের কভার

কেন এই বইটি অনন্য

ডা. মিরাজ মহিউদ্দিন নিজে কোনো প্রথাগত ইসলামিক স্কলার নন। তিনি এই সীমাবদ্ধতা জানেন বলেই বইটিতে নিজের কোনো ব্যক্তিগত মতামত দেননি। বরং প্রখ্যাত ইসলামি পণ্ডিতদের মতামতের সমন্বয় ঘটিয়েছেন। বইটির গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করেছে ড. শারম্যান জ্যাকসন, শেখ হামজা ইউসুফ ও ইমাম জায়েদ শাকিরের মতো পণ্ডিতদের সমর্থন ও মুখবন্ধ।

পশ্চিমা বিশ্বের বহু গবেষক বইটিকে ‘ইংরেজি ভাষায় মহানবী (সা.)-এর জীবনের ওপর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ’ বলে অভিহিত করেছেন। অনেকগুলো ইনস্টিটিউট বইটিকে নবীজির অফিসিয়াল জীবনীগ্রন্থ হিসেবে গ্রহণ করেছে।

নবীজির জীবন নিয়ে গবেষণারত কোনো পণ্ডিত হোন কিংবা প্রথমবার পড়তে আসা কোনো পাঠক—সবার জন্য বইটি অভূতপূর্ব ও সহজলভ্য তথ্যের এক আধার। এই কাজের পেছনে যে শ্রম দেওয়া হয়েছে তা অসামান্য এবং গুণগত মান, নির্ভুলতা ও স্বচ্ছতার দিক থেকে বলা যায় বিস্ময়কর।
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জোনাথন ব্রাউন

জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জোনাথন ব্রাউন লিখেছেন, “নবীজির জীবন নিয়ে গবেষণারত কোনো পণ্ডিত হোন কিংবা প্রথমবার পড়তে আসা কোনো পাঠক—সবার জন্য বইটি অভূতপূর্ব ও সহজলভ্য তথ্যের এক আধার। এই কাজের পেছনে যে শ্রম দেওয়া হয়েছে তা অসামান্য এবং গুণগত মান, নির্ভুলতা ও স্বচ্ছতার দিক থেকে বলা যায় বিস্ময়কর।” 

বইটির গ্লসারিতে ৩৫০-এর বেশি ব্যক্তির সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া হয়েছে, যা সিরাত গবেষণায় এক অমূল্য সম্পদ। এছাড়া যুদ্ধের নকশা এবং গোত্রীয় অবস্থানের চিত্রগুলো ইতিহাসের একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি তৈরি করে।

সম্প্রতি বাংলা ভাষায় বইটির একটি অনুবাদ করেছেন সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন।

আনোয়ার লাইব্রেরি থেকে প্রকাশিত বইয়ের সূচনা কথায় অনুবাদক লিখেছেন, “আধুনিক বিশ্বে নবীজিকে নিয়ে যেসব আরোপিত বুদ্ধিবৃত্তিক জটিলতার ধুম্রজাল তৈরি করা হয়, লেখক সেগুলোর জট খুলেছেন অত্যন্ত ধীর লয়ে, মনোময় বাকপ্রতিমায় এবং সুসঙ্গত কিংবা সুসংহত যুক্তির নিরিখে। মনে হয় এটি শুধু নবীজির সিরাতগ্রন্থ নয়, এটি একটি আশ্চর্য পোস্ট মডার্ন প্রতিষেধক। এক কথায় এটি একটি ক্যারিশমাটিক ও অভিনব উপস্থাপন।”