রোজা কেবল পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম নয়; বরং এটি আত্মিক পরিশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম। সাহ্রি থেকে ইফতার পর্যন্ত পুরো সময় কোরআন তেলাওয়াত, আল্লাহর জিকির ও দোয়ায় রত থাকা রোজার পরিপূর্ণতার অন্তর্ভুক্ত।
হাদিসে রোজার বিভিন্ন আদব বর্ণিত হয়েছে, যা রোজায় বরকত, সওয়াব বৃদ্ধি এবং রোজাদারের মর্যাদা সুউচ্চ করে।
সাহ্রি রোজার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আদব এবং এটি সুন্নত। দেরি করে সাহ্রি করা উত্তম। নবীজি (সা.) সাহরিকে বরকতময় বলেছেন। কারণ সাহ্রি রোজাদারকে শক্তি জোগায় এবং রোজা পালনে সহায়তা করে।
সাহ্রিতে কম বা বেশি—যে পরিমাণই হোক, এমনকি এক ঢোক পানি হলেও পান করা উচিত।
হজরত আবু সাইদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে আছে, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন,“সাহ্রির সবটুকুই বরকত। তাই তোমরা সাহ্রি ছেড়ে দেবে না—যদিও কেউ এক ঢোক পানি পান করে সাহ্রি সম্পন্ন করে। কারণ সাহ্রি গ্রহণকারীদের প্রতি আল্লাহ রহমত বর্ষণ করেন এবং ফেরেশতাগণ তাদের জন্য দোয়া করেন।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১০৯৬৯)
রোজার আদব হলো সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে দেরি না করে ইফতার করা। খেজুর দিয়ে ইফতার করা সুন্নাত। খেজুর না থাকলে পানি দিয়ে ইফতার করা উত্তম।
নবীজি (সা.) বলেছেন,“মানুষ যতদিন ওয়াক্তের সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করবে, ততদিন তারা কল্যাণের উপর থাকবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮৩৩)
সালমান ইবনে আমের (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন,“যখন তোমাদের কেউ রোজা রাখে, সে যেন খেজুর দ্বারা ইফতার করে। যদি খেজুর না পায়, তবে পানি দ্বারা ইফতার করুক; কারণ পানি পবিত্র।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৩৪৭)
রোজা অবস্থায় এবং বিশেষ করে ইফতারের সময় দোয়া করা রোজার গুরুত্বপূর্ণ আদব। এ সময় রোজাদারের দোয়া ফিরিয়ে দেয়া হয় না। (সুনানে ইবনে মাজা, হাদিস: ১৭৫৩)
মুআজা ইবনে জাহরা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, নবীজি (সা.) ইফতারের সময় এই দোয়া পড়তেন, “আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু, ওয়া ‘আলা রিযক্বিকা আফতারতু।”
অর্থ :“হে আল্লাহ! আমি তোমারই জন্য রোজা রেখেছি এবং তোমারই দেওয়া রিজিক দ্বারা ইফতার করছি।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৩৫০)
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন,“তিন ব্যক্তির দোয়া প্রত্যাখ্যাত হয় না—ন্যায়পরায়ণ শাসক, রোজাদার (ইফতার পর্যন্ত) এবং মজলুমের দোয়া।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৭৫২)
রোজা আল্লাহর নৈকট্য লাভের ইবাদত এবং আত্মশুদ্ধির মাধ্যম। তাই রোজার আদব হলো এমন সব কাজ থেকে বিরত থাকা, যা রোজার উদ্দেশ্যের বিরোধী। রোজা শুধু পানাহার ত্যাগ নয়; বরং গুনাহ ও নিষিদ্ধ কাজ থেকেও বিরত থাকা।
আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “রোজা কেবল পানাহার ত্যাগের নাম নয়; বরং বেহুদা ও অশ্লীল কথা ত্যাগেরও নাম। কেউ যদি তোমাকে গালি দেয়, তবে বলবে—আমি রোজাদার।” (আত-তারগিব ওয়াত-তারহিব, হাদিস: ১৬৫১)
তিনি আরও বলেছেন, “যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও সে অনুযায়ী আমল ত্যাগ করেনি, তার পানাহার ত্যাগে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।” (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৭৮২)
রমজানের গুরুত্বপূর্ণ আদবগুলোর একটি হলো মিসওয়াক করা। এটি সবসময়ের মর্যাদাপূর্ণ আমল। তবে রোজায় তার গুরুত্ব অধিক। দীর্ঘ সময় ক্ষুধা পেটে থাকার কারণে মুখে দুর্গন্ধ হতে পারে। যা অন্যদের কষ্টের কারণ হয়।
মিসওয়াক মুখের দুর্গন্ধ করে এবং মুখকে পরিষ্কার রাখে। রোজা অবস্থায় সকাল বা বিকাল—যেকোনো সময় মিসওয়াক করা মুস্তাহাব। নবীজি (সা.) রোজা অবস্থায় মিসওয়াক করতেন।
রমজানে সদকা করা ও কোরআন তেলাওয়াত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। যদিও এ দুটি কাজ সব সময়ই মোস্তাহাব, তবে রমজানে এর গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায়।
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, নবীজি ছিলেন সর্বাধিক দানশীল। রমজান মাসে তাঁর দানশীলতা আরও বেড়ে যেত, যখন জিবরাইল (আ.) তাঁর কাছে আসতেন। তিনি প্রতি রাতে নবীজির সঙ্গে কোরআনের দাওর করতেন। তিনি কল্যাণ বিতরণে প্রবাহিত বাতাসের চেয়েও অধিক দানশীল ছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩০২)
রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর রয়েছে। তাই এ সময়ের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। নবীজি (সা.) শেষ দশকে অন্যান্য সময়ের তুলনায় অধিক ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। তিনি শুধু নিজে ইবাদত করতেন না; বরং পরিবারের সদস্যদেরও জাগিয়ে দিতেন।
আয়িশা (রা.) বলেন, রমজানের শেষ দশক শুরু হলে নবীজি সারা রাত জেগে থাকতেন, পরিবারকে জাগিয়ে দিতেন এবং ইবাদতের জন্য বিশেষ প্রস্তুতি নিতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৫৮)
রোজা আমাদের জন্য ক্ষমা, বরকত, মর্যাদা লাভ ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির বার্তা নিয়ে আসে। রমজানের রোজার আদবসমূহ পালনের মাধ্যমে এগুলো লাভ করা যায়।