ইসলামি ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে ৩ রমজান দিনটি বেশ বৈচিত্র্যময়। একদিকে এই দিনে ইসলামের প্রথম সশস্ত্র সংগ্রামের যাত্রা শুরু হয়, অন্যদিকে এই দিনেই পৃথিবীকে বিদায় জানিয়েছিলেন মহানবীর (সা.) কন্যা ফাতিমা (রা.)।
২ হিজরির ৩ রমজান। নবীজি মুহাম্মদ (সা.) তাঁর সাহাবিদের নিয়ে মদিনা থেকে বের হলেন ঐতিহাসিক ‘বদর' অভিমুখে। মদিনা থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই কৌশলগত স্থানেই সংঘটিত হয় ইসলামের ইতিহাসের প্রথম বড় যুদ্ধ।
মুহাজিরদের লুণ্ঠিত সম্পদ উদ্ধারে আবু সুফিয়ানের কাফেলার গতিরোধ করাই ছিল প্রাথমিক লক্ষ্য। মুসলিমদের এই বাহিনীতে ছিলেন মাত্র ৩১৩ থেকে ৩১৭ জন যোদ্ধা।
তাঁদের সঙ্গে ছিল মাত্র দুটি ঘোড়া আর ৭০টি উট। অথচ এই ক্ষুদ্র বাহিনীই ১৭ রমজানে মক্কার ১০০০ সশস্ত্র যোদ্ধার বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করে ইসলামের ইতিহাসে সত্য-মিথ্যার পার্থক্যের দিন রচনা করে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৯৫১)
১১ হিজরির ৩ রমজান। আল্লাহর রাসুলের ইন্তেকালের মাত্র ছয় মাস পর তাঁর কন্যা ফাতিমা (রা.) মৃত্যুবরণ করেন। নবীজি (সা.) আগেই তাঁকে সুসংবাদ দিয়েছিলেন যে, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তিনিই প্রথম তাঁর সঙ্গে মিলিত হবেন।
ফাতিমা (রা.) তাঁর লজ্জা ও পর্দার বিষয়ে এতটাই সচেতন ছিলেন যে ইন্তেকালের আগে আসমা বিনতে উমাইস (রা.)-কে অসিয়ত করে গিয়েছিলেন যেন তাঁর মরদেহ এমনভাবে ঢাকা হয় যাতে শরীরের অবয়ব বোঝা না যায়।
ইসলামে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যার জন্য ঘের দেওয়া খাটিয়া বা ‘নাআশ’ তৈরি করা হয়েছিল। তাঁর অসিয়ত অনুযায়ী রাতেই তাঁকে জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়। (ইমাম জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/১২৮, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৮৫)
ইতিহাসের পাতায় ৩ রমজান আরও কিছু বড় রাজনৈতিক ঘটনার সাক্ষী:
দুমাতুল জান্দাল ও সালিশি মজলিস (৩৭ হিজরি): সিফফিনের যুদ্ধের পর সৃষ্ট ফিতনা নিরসনে হজরত আলী ও মুয়াবিয়া (রা.)-এর পক্ষ থেকে দুই বিচারক—আবু মুসা আশআরি ও আমর ইবনুল আস এক বৈঠকে মিলিত হন। যদিও এটি চূড়ান্ত সমাধান দিতে পারেনি, তবে এটি মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বড় মোড় ছিল।
আব্দুল মালিক বিন মারওয়ানের খিলাফত (৬৫ হিজরি): উমাইয়া খিলাফতের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা মারওয়ান ইবনে হাকামের মৃত্যুর পর এই দিনে তাঁর পুত্র আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান ক্ষমতায় আসীন হন। তাঁর হাত ধরেই আরব্যকরণ (Arabization) এবং মুদ্রা সংস্কারের মাধ্যমে ইসলামি রাষ্ট্র নতুন শক্তিতে জেগে ওঠে।
আন্দালুসের জ্ঞানবিপ্লব (৩৫০ হিজরি): স্পেনের কর্ডোভায় আব্দুল রহমান আল-নাসিরের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র হাকাম আল-মুস্তানসির বিল্লাহ ৩ রমজানে সিংহাসনে বসেন। তাঁকে বলা হয় ‘বইপ্রেমিক খলিফা’। তাঁর ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে ৪ লাখেরও বেশি বই ছিল এবং তাঁর আমলে সাধারণ মানুষের শিক্ষার হার বিস্ময়করভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল।