বিনোদনের সব উপায়কে যেমন ইসলাম নিষিদ্ধ করেনি, তেমনি সবগুলোকে আবার শর্তহীন বৈধও করে দেয়নি। এ ক্ষেত্রে ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ পথ তৈরি করেছে; যা মানুষের জীবন, সমাজ, সময় ও কল্যাণের জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী।
বিনোদনের ক্ষেত্রে ইসলামের এমনই কিছু মূলনীতি নিচে আলোচনা করা হলো:
সব ঐশী ধর্ম ও আসমানি কিতাবে শিরক হলো মহাপাপ। এ জন্য এটা পরিহার ছাড়া কোনো বৈধ বিনোদন সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে কোরআনের শাশ্বত ঘোষণা হলো, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরিক করা ক্ষমা করবেন না। এটা ছাড়া অন্য সব পাপ যাকে ইচ্ছে মাফ করবেন এবং যে আল্লাহর সঙ্গে শরিক করল, সে এক মহাপাপ রচনা করল।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৪৮)
এ ছাড়া বিনোদনের ক্ষেত্রে অন্যান্য কবিরা গুনাহ এড়িয়ে চলা জরুরি। না হলে সেটা বিনোদন না, বরং হয়ে উঠবে আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ। আল্লাহ বলেন, ‘যদি তোমরা নিষিদ্ধ বড় পাপ (কবিরা গুনাহ) হতে বিরত থাক, তাহলে আমি তোমাদের ছোট পাপগুলো ক্ষমা করে দেব এবং তোমাদের এক মহামর্যাদার স্থানে প্রবেশ করাব।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৩১)
তোমরা তোমাদের মায়েদের পেটে ভ্রূণ অবস্থায় ছিলে। কাজেই নিজেদের খুব পবিত্র মনে কোরো না। কে তাকওয়া অবলম্বন করে, তা তিনি ভালোভাবেই জানেন।সুরা নাজম, আয়াত: ৩২
আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘যারা বিরত থাকে বড় বড় পাপ আর অশ্লীল কার্যকলাপ থেকে ছোটখাটো দোষত্রুটি ছাড়া; বস্তুত তোমার প্রতিপালক ক্ষমা করার ব্যাপারে অতি প্রশস্ত। তিনি তোমাদের সম্পর্কে খুব ভালোভাবেই জানেন যখন তিনি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন আর যখন তোমরা তোমাদের মায়েদের পেটে ভ্রূণ অবস্থায় ছিলে। কাজেই নিজেদের খুব পবিত্র মনে কোরো না। কে তাকওয়া অবলম্বন করে, তা তিনি ভালোভাবেই জানেন। (সুরা নাজম, আয়াত: ৩২)
বিনোদনের মাধ্যমগুলোতে সচরাচর পাওয়া যায়, এমন কবিরা গুনাহের মধ্যে অন্যতম হলো বিনোদনে অতিরিক্ত সময় দিতে গিয়ে ফরজ ইবাদত পরিত্যাগ, গিবত, মানহানি, জুয়া, মাদকদ্রব্য ব্যবহার, অশ্লীলতা ইত্যাদি। এ–জাতীয় কবিরা গুনাহগুলো বৈধ ও সুস্থ বিনোদনের পথে অন্তরায়।
বিনোদন যদি কোনো পাপমিশ্রিত না–ও হয়, তবু সেটা বৈধতা পাবে না, যদি তাতে মাত্রাতিরিক্ত সময় দিতে গিয়ে ফরজ ইবাদত বাদ দিতে হয়। কারণ, এটা বিশ্বাসী জীবনের মৌলিক লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, ইহকালের ক্ষণস্থায়িত্ব ও পরকালের প্রস্তুতির দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত।
ইহজগতের অনিত্যতা ও পরকালের অন্তহীন জীবনের দিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ বলেছেন, ‘আর এ দুনিয়ার জীবন খেল-তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয় এবং নিশ্চয় আখেরাতের নিবাসই হলো প্রকৃত জীবন, যদি তারা জানত।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৬৪)
মানুষের জীবনের মৌলিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহ বলেছেন, ‘আর জিন ও মানুষকে কেবল এ জন্যই সৃষ্টি করেছি যে তারা আমার ইবাদত করবে।’ (সুরা জারিয়াত, আয়াত: ৫৬)
বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্তহীন স্ক্রোলিং, অনলাইন গেমস অথবা আড্ডা-গল্পে আমরা এতটাই মত্ত হয়ে যাই যে ফরজ ইবাদতের সময় পেরিয়ে যায়। কাজা হয়ে যায় একের পর এক নামাজ। এভাবে ধীরে ধীরে নামাজ ও অন্যান্য ইবাদত থেকেও আগ্রহ কমে যায়।
এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলো একান্তই ভুলে যাওয়া বা গভীর ঘুমের কারণে ফরজ নামাজের সময় পেরিয়ে গেলে। এতে পাপ নেই। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি নামাজ পড়তে ভুলে যায় কিংবা ঘুমের কারণে তা ছুটে যায়, তবে তার ক্ষতিপূরণ হলো, স্মরণ হওয়ামাত্রই তা পড়ে নেওয়া।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৮৪)
সোশ্যাল মিডিয়াগুলোই বর্তমানে সম্ভবত একমাত্র বিনোদন মাধ্যম, যেটা সব ধরনের মানুষই ব্যবহার করে—ধার্মিক, কপট বা বিধর্মী সবাই। তাই এর প্রভাব আমাদের মনস্তত্ত্বে ও সমাজজীবনে অনেক বেশি।
আগে একটা সময় সামাজিক জীবনে পরনিন্দা হতো আড়ালে আবডালে। মানহানি বা গালাগালি হতো সংক্ষিপ্ত পরিসরে। তবে অনলাইন সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে এর প্রসার হয়েছে প্লেগের মতো পৃথিবীজুড়ে।
এর পরোক্ষ, প্রত্যক্ষ প্রভাব থেকে বাঁচতে পারছে না কেউই। মানবস্বভাবের একটা দিক হলো, আমরা কোনো বিষয় যদি পুনরুক্তি হতে দেখি, তাহলে অবচেতন মনেই সেটাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নিই। অপরাধ মনে করি না। কখনো-সখনো নিজেরাও জড়িয়ে যাই।
সোশ্যাল মিডিয়াগুলোই বর্তমানে সম্ভবত একমাত্র বিনোদন মাধ্যম, যেটা সব ধরনের মানুষই ব্যবহার করে—ধার্মিক, কপট বা বিধর্মী সবাই। তাই এর প্রভাব আমাদের মনস্তত্ত্বে ও সমাজজীবনে অনেক বেশি। আমরা হয়তো পরনিন্দা, মানহানি ও গালাগালির শিকার হচ্ছি বা নিজেরাই করছি।
আর সোশ্যাল মিডিয়াগুলোর অ্যালগরিদম এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেন, মানুষ বেশি রিঅ্যাক্ট করে, এনগেজ হয়, সক্রিয় পদচারণা রাখে। এ বিষয়গুলো বেশি ঘটে নেতিবাচক কনটেন্ট, রেজবেইট (রাগ উসকানো কনটেন্ট), গালাগালি, পরনিন্দা ও মানহানির মাধ্যমে। ইতিবাচক ও পরিমিত কনটেন্টে সাড়া পাওয়া যায় তুলনামূলক কম।
তবে এ বিষয়গুলো ইসলামে ও অন্যান্য আসমানি কিতাবে পুরোপুরি নিষিদ্ধ। বিনোদন করতে গিয়ে এ বিষয়গুলোতে অংশগ্রহণ করা যাবে না। এতে বিনোদন বৈধতার সীমা অতিক্রম করে যাবে।
বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ট্রল’ করা, ‘রোস্ট’ করা বা ‘এক্সপোজ’ করার কালচার দেখা যায়। কারণ, এগুলোর মাধ্যমেই ভিউ ও আয় বেশি হয়। এসব কনটেন্টের কমেন্টেও চলে গালাগালি ও মানহানি। এসবের বিরুদ্ধে কোরআনের সুস্পষ্ট বাণী হলো, ‘দুর্ভোগ এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যে (সামনাসামনি) মানুষের নিন্দা করে আর (অসাক্ষাতে) দুর্নাম করে, যে অর্থ জমায় ও তা গুনে গুনে রাখে।’ (সুরা হুমাজা, আয়াত: ১-২)
গালিগালাজ কখনোই একজন বিশ্বাসীর স্বভাব হতে পারে না। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মুমিন কখনো ঠাট্টাকারী, অভিশাপকারী, অশ্লীলভাষী বা গালিদানকারী হতে পারে না।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১৯৭৭)
গালিগালাজকে মুনাফিক ও কপট লোকের স্বভাব হিসেবে চিহ্নিত করেছে ইসলাম। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘চারটি স্বভাব যার মধ্যে বিদ্যমান, সে হচ্ছে খাঁটি মুনাফিক। যার মধ্যে এর কোনো একটি স্বভাব থাকবে, তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকের একটি স্বভাব থেকে যায়। ১. আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে; ২. কথা বললে মিথ্যা বলে; ৩. অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে এবং ৪. বিবাদে লিপ্ত হলে গালাগালি করে।’ (বুখারি, হাদিস নং: ৩৪)
সামাজিক জীবনে পরনিন্দা, মানহানি, গালাগালি, অপবাদ দেওয়াসহ অন্যান্য মন্দ আচরণ ও পাপ থেকে বেঁচে চলা জরুরি। না হলে ব্যক্তির জন্য এসব বিনোদনের উপকরণ ব্যবহার ধর্মীয় বৈধতা হারাবে।
এগুলোর চেয়েও ভয়াবহ হলো নারীদের নিয়ে অশ্লীল ও যৌন ইঙ্গিতার্থক নানা মন্তব্য। ইসলামের দৃষ্টিতে এটা কেবল সাধারণ পরনিন্দা নয়, বরং নারী-চরিত্র নিয়ে মিথ্যা অপবাদ ও তার সতীত্বকে কলঙ্কিত করার শামিল। ইসলামের পরিভাষায় একে বলা হয় কাজফ।
ইসলামের সামগ্রিক নীতিমালায় মানুষের জীবন, সম্পদ, বুদ্ধি ও ধর্মের মতোই গুরুত্বপূর্ণ মানুষের ইজ্জত সম্মান। এই পাঁচটি বিষয়ের সুরক্ষা ও নিশ্চয়তার জন্যই ইসলামের সব বিধিবিধান দেওয়া হয়েছে।
তাই মানুষের, বিশেষত নারীদের ইজ্জত ও সম্মানের পবিত্রতা নষ্ট করা দণ্ডনীয় অপরাধ। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যারা সাধ্বী, সরলমনা ও বিশ্বাসী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।’ (সুরা নুর, আয়াত: ২৩)
এই পাপকে সাতটি ধ্বংসাত্মক পাপের মধ্যে গণ্য করেছেন আল্লাহর রাসুল (সা.)। বলেছেন, ‘তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক মহাপাপ থেকে বেঁচে থাকো। সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! সেগুলো কী?...তিনি (অন্যান্য পাপ উল্লেখের পর) বললেন, চরিত্রবতী, সরলমনা মুমিন নারীদের অপবাদ দেওয়া।’ (বুখারি, হাদিস নং: ২৭৬৬)
তাই একজন মুসলিম হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ও সামাজিক জীবনে পরনিন্দা, মানহানি, গালাগালি, অপবাদ দেওয়াসহ অন্যান্য মন্দ আচরণ ও পাপ থেকে বেঁচে চলা জরুরি। না হলে ব্যক্তির জন্য এসব বিনোদনের উপকরণ ব্যবহার ধর্মীয় বৈধতা হারাবে।
আবদুল্লাহিল বাকি : আলেম, লেখক ও সফটওয়্যার প্রোগ্রামার
abdullahalbaqi00@gmail.com