ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, যা মানুষকে চরমপন্থা ও শিথিলতা—উভয় প্রান্তিকতা বর্জন করে মধ্যপন্থা অবলম্বনের শিক্ষা দেয়। ধর্মের বিধিবিধান পালনে নিষ্ঠা থাকা প্রশংসনীয়, কিন্তু সেই নিষ্ঠা যখন সীমালঙ্ঘন করে ‘চরমপন্থা’র রূপ নেয়, তখন তা কল্যাণের পরিবর্তে ধ্বংস বয়ে আনে।
আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি বিশুদ্ধ হাদিসে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “তোমরা ইসলামের ব্যাপারে চরমপন্থা থেকে বেঁচে থাকো; কেননা তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধর্মের ব্যাপারে এই চরমপন্থার কারণেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।” (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৩০৫৭; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩০২৯)
পরিভাষায় গুলু হলো, ইবাদত বা ধর্মীয় কোনো বিষয়ে শরিয়ত নির্ধারিত সীমানা অতিক্রম করে নিজেকে এমন কষ্টসাধ্য কাজে লিপ্ত করা যা ইসলাম আবশ্যক করেনি।
গুরুত্বপূর্ণ হাদিসটির বর্ণনাকারী হলেন হজরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.)। তিনি কেবল একজন সাহাবিই ছিলেন না, বরং তাকে বলা হয় উম্মতের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত এবং কোরআনের অনন্য ভাষ্যকার।
নবীজির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এই সাহাবির জন্য স্বয়ং নবীজি (সা.) দোয়া করেছিলেন, “হে আল্লাহ, আপনি তাকে ইসলামের গভীর জ্ঞান দান করুন এবং কোরআনের ব্যাখ্যা শেখান।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪৩)
হাদিসে ব্যবহৃত ‘গুলু’ শব্দের অর্থ হলো সীমালঙ্ঘন করা বা সীমার বাইরে চলে যাওয়া। পরিভাষায় গুলু হলো, ইবাদত বা ধর্মীয় কোনো বিষয়ে শরিয়ত নির্ধারিত সীমানা অতিক্রম করে নিজেকে এমন কষ্টসাধ্য কাজে লিপ্ত করা যা ইসলাম আবশ্যক করেনি।
কায়রোর প্রখ্যাত আলেম শেখ ইব্রাহিম জালহুম বলেছেন, “শরিয়তের সীমানা থেকে বেরিয়ে নিজেকে এমন পরিশ্রমে লিপ্ত করা যা মানুষের জন্য অসহনীয়, যেমন—হালাল বস্তুকে হারাম করে নেওয়া, যা ফরজ নয় তাকে ফরজ মনে করা অথবা নিজের ওপর এমন কঠোরতা আরোপ করা যা পালন করা সাধ্যের অতীত।” (ইব্রাহিম জালহুম, ফিকহুল মুসলিম, ইসলাম অনলাইন)
মানুষ যদি জাগতিক বিষয়ে সীমালঙ্ঘন করে, তবে তার ফল যেমন মারাত্মক হয়, ইসলামের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। কেউ যদি খাবারের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করে, তবে তার স্বাস্থ্য নষ্ট হয়; পানীয়র ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করলে রোগব্যাধি দেখা দেয়; আবার যদি পোশাক বা বিলাসিতায় মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় করে, তবে সে সম্পদ হারায়।
হে আহলে কিতাবগণ, তোমরা তোমাদের ধর্মের ব্যাপারে অতিরঞ্জন (গুলু) করো না।কোরআন, সুরা নিসা, আয়াত: ১৭১
ঠিক তেমনি, ধর্মের ক্ষেত্রে যারা নির্ধারিত সহজ পথ ছেড়ে কঠিন ও জটিল পথ বেছে নেয়, তারা শেষ পর্যন্ত পথভ্রষ্ট ও ধ্বংস হয়ে যায়। ইসলাম একটি সহজ ও স্বাভাবিক ধর্ম, যা মানুষের সহজাত প্রকৃতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৫)
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বনী ইসরাইল বা ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা তাদের নবীদের ব্যাপারে চরমপন্থা অবলম্বন করেছিল। কেউ নবীর অবমাননা করেছে, আবার কেউ নবীকে আল্লাহর আসনেই বসিয়ে দিয়েছে।
খ্রিষ্টানরা হজরত ইসা (আ.)-এর প্রতি ভক্তির আতিশয্যে তাকে ‘আল্লাহর পুত্র’ বানিয়ে আকিদাগত চরমপন্থায় লিপ্ত হয়েছিল। অন্যদিকে, ইহুদিরা শরিয়তের সূক্ষ্ম বিষয় নিয়ে এমন সব চুলচেরা বিশ্লেষণ ও কঠোরতা শুরু করেছিল, যা শেষ পর্যন্ত তাদের ইসলাম থেকেই বিচ্যুত করে দেয়।
আল্লাহ তাআলা কোরআনে নির্দেশ দিয়েছেন, “হে আহলে কিতাবগণ, তোমরা তোমাদের ধর্মের ব্যাপারে অতিরঞ্জন (গুলু) করো না।” (সুরা নিসা, আয়াত: ১৭১)
বর্তমান যুগেও যারা ধর্মের নামে মানুষ হত্যা, ঘৃণা ছড়ানো বা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে অন্যদের কাফের ফতোয়া দেয়, তারা মূলত সেই প্রাচীন ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিগুলোর পথই অনুসরণ করছে।
ইসলামের মূল সৌন্দর্য ইসলাম ধর্ম কঠোরতার নাম নয়, বরং এটি সহজতা ও আন্তরিকতার ধর্ম। নবীজি (সা.) বলেছেন, “নিশ্চয়ই ইসলাম ধর্ম অত্যন্ত সহজ। ইসলাম নিয়ে যে-ই কঠোরতা করতে যাবে, ধর্ম তার ওপর প্রবল হয়ে যাবে (অর্থাৎ সে টিকতে পারবে না)। অতএব তোমরা মধ্যপন্থা অবলম্বন করো, সত্যের কাছাকাছি থাকো এবং সুসংবাদ গ্রহণ করো।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৯)
ইসলামের ইবাদতব্যবস্থা এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে একজন মানুষ তার জাগতিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আধ্যাত্মিক উন্নতিও করতে পারে। কিন্তু চরমপন্থীরা মনে করে, কেবল সারারাত জেগে নামাজ পড়া বা সারাবছর বিরতিহীন রোজা রাখাই শ্রেষ্ঠত্ব। অথচ আল্লাহর রাসুল (সা.) এমন মানসিকতাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এখানে ‘মুতানাত্তিউন’ বলতে তাদের বোঝানো হয়েছে যারা কথায় ও কাজে গভীর পাণ্ডিত্য দেখাতে গিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য ধর্মকে কঠিন করে তোলে।
ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন, নবীজি (সা.) তিনবার করে বলেছেন, “কঠোরতা অবলম্বনকারীরা (মুতানাত্তিউন) ধ্বংস হয়ে গেছে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৭০)
এখানে ‘মুতানাত্তিউন’ বলতে তাদের বোঝানো হয়েছে যারা কথায় ও কাজে গভীর পাণ্ডিত্য দেখাতে গিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য ধর্মকে কঠিন করে তোলে।
ধর্মে চরমপন্থা গ্রহণ কেবল ব্যক্তির আধ্যাত্মিক ক্ষতি করে না, বরং এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নষ্ট করে। যখন কোনো গোষ্ঠী মনে করে যে কেবল তাদের ব্যাখ্যাই সঠিক এবং বাকি সবাই ভ্রান্ত, তখন সমাজে বিভাজন ও অসহিষ্ণুতা তৈরি হয়।
আল্লাহর রাসুলের সতর্কবাণীটি তাই কেবল ব্যক্তিগত আমলের জন্য নয়, বরং একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণের জন্যও অপরিহার্য দিকনির্দেশনা।