পরকালে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাওয়া এবং জান্নাতে প্রবেশ করা প্রত্যেক মুমিনের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য।
পবিত্র কোরআনে এই মুক্তিকে ‘জুহজিহা’ শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে। যার শাব্দিক অর্থ হলো—দ্রুত ও সজোরে টেনে দূরে সরিয়ে নেওয়া।
অর্থাৎ হাশরের ময়দানে যাকে জাহান্নামের কিনারা থেকে দ্রুত টেনে সরিয়ে নেওয়া হবে, সেই সফল। (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ২/১৬২, দারু তাইয়িবাহ, রিয়াদ, ১৯৯৯)
এই চূড়ান্ত সফলতা বা জাহান্নাম থেকে দূরে সরে থাকার উপায় কী?
সাধারণ দৃষ্টিতে আমরা মনে করি কেবল নামাজ, রোজা, জাকাত বা হজের মাধ্যমেই এই মুক্তি সম্ভব। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস আমাদের সামনে ভিন্ন এক দুয়ার খুলে দেয়, যেখানে ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে আচরণের বিষয়টিকে মুক্তির শর্ত হিসেবে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
মুক্তির দুই মূলনীতি
জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাত লাভের উপায় হিসেবে নবীজি (সা.) দুটি মৌলিক বিষয়ের কথা বলেছেন।
আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে তাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হোক এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হোক, তার মৃত্যু যেন এমন অবস্থায় আসে যে সে আল্লাহ ও পরকালের ওপর বিশ্বাস রাখে। আর সে মানুষের সঙ্গে তেমন আচরণই করে, যেমন আচরণ সে নিজের জন্য পছন্দ করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৮৪৪)
যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে তাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হোক এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হোক, তার মৃত্যু যেন এমন অবস্থায় আসে যে সে আল্লাহ ও পরকালের ওপর বিশ্বাস রাখে। আর সে মানুষের সঙ্গে তেমন আচরণই করে, যেমন আচরণ সে নিজের জন্য পছন্দ করে।সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৮৪৪
এই হাদিসটি বিশ্লেষণ করলে দুটি অংশ পাওয়া যায়:
১. সঠিক বিশ্বাস (আকিদাহ): আল্লাহ ও পরকালের ওপর অবিচল আস্থা নিয়ে মৃত্যু বরণ করা।
২. মানবিক আচরণ (মুয়ামালাত): মানুষের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে একটি গোল্ডেন রুল বা স্বর্ণালি নীতি অনুসরণ করা।
নিজের জন্য যা পছন্দ, অন্যের জন্যও তাই
সামাজিক ও পারস্পরিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ইসলাম একটি চমৎকার মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছে। সেটি হলো—আমি অন্যের কাছ থেকে যেমন ব্যবহার আশা করি, ঠিক তেমন ব্যবহার অন্যের সঙ্গে করা।
আমরা সবাই চাই অন্য মানুষ আমাদের সঙ্গে সত্য কথা বলুক, আমাদের বিপদে পাশে দাঁড়াক, আমানত রক্ষা করুক এবং ইনসাফ করুক। হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী, পরকালে মুক্তি পেতে হলে আমাদেরও মানুষের সঙ্গে ঠিক এই কাজগুলোই করতে হবে।
যিনি পরকালে মুক্তি চান, তার জন্য কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত যথেষ্ট নয়। বরং তাকে ব্যবসায় সততা বজায় রাখতে হবে, কথা দিয়ে কথা রাখতে হবে এবং অন্যের বিপদে সহযোগিতা করতে হবে।
কারণ, মানুষের অধিকার বা ‘হক্কুল ইবাদ’ নষ্ট করলে কেবল ইবাদত দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব না-ও হতে পারে।
মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা বা তাদের পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া কেবল ভদ্রতা নয়, বরং এটি জাহান্নাম থেকে দূরে থাকার অন্যতম চাবিকাঠি।
ইবাদত ও আচরণের সমন্বয়
পবিত্র রমজান মাসে আমরা ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। দীর্ঘ সময় নামাজ পড়ি মুক্তির আশায়। কিন্তু এই সব ইবাদত তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন আমাদের আচার-আচরণে মানুষের জন্য কল্যাণ থাকবে।
আমরা যদি নিজের জন্য দয়া ও ক্ষমা আশা করি, তবে আমাদেরও অন্যকে ক্ষমা করার মানসিকতা রাখতে হবে। মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা বা তাদের পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া কেবল ভদ্রতা নয়, বরং এটি জাহান্নাম থেকে দূরে থাকার অন্যতম চাবিকাঠি।
শেষ কথা
পরকালের মুক্তি কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এটি আমাদের বিশ্বাস ও আচরণের এক সমন্বিত রূপ। ইবাদতের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর হক আদায় করি, আর ভালো আচরণের মাধ্যমে বান্দার হক।
এই দুইয়ের সমন্বয় হলেই কোরআনে বর্ণিত সেই কাঙ্ক্ষিত মহাসাফল্য অর্জন সম্ভব। সুতরাং জান্নাত পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকলে আমাদের প্রতিদিনের ব্যবহারে মানুষের প্রতি ইনসাফ ও সদাচার নিশ্চিত করা জরুরি।