ইতিহাসে ২৫ রমজানকে বলে ‘বিশ্ব সভ্যতার রক্ষাকবচ’। এই দিনে আরবের বুক থেকে মূর্তিপূজার চূড়ান্ত বিনাশ ঘটে। মঙ্গোল বাহিনীও পরাজিত হয় এই দিন, ফলে মানবসভ্যতা নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়।
একই দিনে অটোমান সাম্রাজ্যের ইউরোপ বিজয়ের দ্বার উন্মোচিত হয় এবং আধুনিক তুরস্কের মহান আধ্যাত্মিক সাধকদের বিদায় জানায় পৃথিবী।
৮ হিজরির রমজান মাসে মক্কা বিজয়ের পর আল্লাহর রাসুল (সা.) আরবের বিভিন্ন স্থানে থাকা প্রধান মূর্তিগুলো ধ্বংসের নির্দেশ দেন। ২৫ রমজানে তিনটি বড় অভিযান পরিচালিত হয়:
উজ্জা ধ্বংস: খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) কোরাইশদের সবথেকে বড় মূর্তি ‘উজ্জা’ ভেঙে ফেলেন।
সুওয়া ধ্বংস: আমর ইবনুল আস (রা.) হুজাইল গোত্রের মূর্তি ‘সুওয়া’ ধূলিসাৎ করেন।
মানাত ধ্বংস: সা’দ ইবনে জায়েদ (রা.) আউস ও খাজরাজ গোত্রের প্রাচীন মূর্তি ‘মানাত’ ভেঙে ফেলেন। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ৪/৪২০, ১৯৫৫)
এই অভিযানের মাধ্যমে আরবের বুক থেকে প্রাতিষ্ঠানিক মূর্তিপূজার অবসান ঘটে।
বাগদাদ পতনের পর মঙ্গোলরা গাজা পর্যন্ত পৌঁছে মিসর আক্রমণের হুমকি দিচ্ছিল। এই ক্রান্তিকালে মামলুক সুলতান সাইফুদ্দিন কুতুজ ও সেনাপতি বাইবার্স ৩ সেপ্টেম্বর ১২৬০ খ্রিষ্টাব্দে (২৫ রমজান ৬৫৮ হিজরি) ফিলিস্তিনের আইন জালুত প্রান্তরে মঙ্গোলদের মুখোমুখি হন। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৩/২২০, ১৯৮৮)
যুদ্ধের এক পর্যায়ে মঙ্গোলদের তীব্র আক্রমণে মুসলিম বাহিনী ছত্রভঙ্গ হওয়ার উপক্রম হলে সুলতান কুতুজ নিজের শিরস্ত্রাণ ছুড়ে ফেলে তরবারি হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং চিৎকার করে বলতে থাকেন, “ওয়া ইসলামাহ! ওয়া ইসলামাহ!” (হায় ইসলাম, রক্ষা করো ইসলামকে!)
তাঁর এই অসীম সাহসিকতা দেখে সৈন্যরা পুনরায় সংগঠিত হয় এবং মঙ্গোল সেনাপতি কিতবুগাকে পরাজিত ও হত্যা করে। এই বিজয় মঙ্গোলদের অজেয় থাকার মিথ ভেঙে দিয়ে বিশ্ব সভ্যতাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছিল।
২৫ রমজান ৯২৭ হিজরিতে (১৫২১ খ্রিষ্টাব্দ) অটোমান সুলতান সুলাইমান আল-কানুনি (সুলাইমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট) দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ‘বেলগ্রেড’ দুর্গ জয় করেন।
বেলগ্রেডকে তখন ‘খ্রিষ্টধর্মের রক্ষাকবচ’ বলা হতো। এই দুর্গটি পতনের মাধ্যমে দানিউব নদীর অববাহিকা এবং হাঙ্গেরি ও অস্ট্রিয়ার দরজা অটোমানদের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়, যা কয়েক শতাব্দী ধরে ইউরোপের রাজনীতি ও মানচিত্র নির্ধারণ করেছিল।
৫৪৪ হিজরির ২৫ রমজানে জন্মগ্রহণ করেন প্রখ্যাত মুফাসসির ও দার্শনিক ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি। তাঁর কালজয়ী তাফসির মাফাতিহুল গায়েব জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক বিশ্বকোষ হিসেবে সমাদৃত। (ইমাম জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২১/৪৮০, ১৯৮৫)
আবার ১৩৭৯ হিজরির (১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দ) এই দিনে আধুনিক তুরস্কের আধ্যাত্মিক চিন্তক বদিউজ্জামান সাইদ নুরসি ইন্তেকাল করেন। তাঁর রচিত রিসালা-ই নূর আধুনিক তুরস্কের মুসলিমদের ইমান রক্ষায় ঢাল হিসেবে কাজ করেছিল।
মৃত্যুর পর তাঁর কবরের প্রতি সাধারণ মানুষের ভক্তি দেখে ভীত হয়ে সামরিক শাসকরা তাঁর মরদেহ অজ্ঞাত স্থানে সরিয়ে নেয়, যা আজও এক রহস্য।