
রমজান কোরআন নাজিলের মাস। এ মাসে কোরআন পাঠের ফজিলত অন্য সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।
মহানবী (সা.) রমজান মাসে ফেরেশতা জিবরাইলের (আ.) সঙ্গে কোরআন তেলাওয়াত করতেন। পূর্ববর্তী আলেমরাও এ মাসে অধিক সময় কোরআনের সঙ্গে ব্যয় করতেন।
রমজান শুরু হলে অনেকেরই লক্ষ্য থাকে—এ মাসে অন্তত একবার পুরো কোরআন খতম করা। কোনো কোনো বছর আমরা তা সম্পন্ন করতে পারি, আবার কখনো মাঝপথে গতি হারিয়ে ফেলি।
জীবনের নানা ব্যস্ততা, ক্লান্তি বা অনিয়মের কারণে খতম সম্পন্ন করা হয়ে ওঠে না। এই নিবন্ধে ১০টি কার্যকর পদ্ধতি তুলে ধরা হলো, যা আপনাকে রমজানে কোরআন খতম করতে সহায়তা করবে।
যদি আপনি পুরো মাসে একবার খতম করতে চান, তবে ৩০ দিনের জন্য একটি পরিকল্পনা করতে হবে। প্রতিদিন ১ পারা অর্থাৎ প্রায় ২০ পৃষ্ঠা পড়তে হবে।
রমজানে কোরআন খতমের জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা জরুরি। যদি আপনি পুরো মাসে একবার খতম করতে চান, তবে ৩০ দিনের জন্য একটি পরিকল্পনা করতে হবে। প্রতিদিন ১ পারা অর্থাৎ প্রায় ২০ পৃষ্ঠা পড়তে হবে।
এটি আরও সহজ করতে ২০ পৃষ্ঠাকে ভাগ করে নেওয়া যায়। যেমন—প্রতি নামাজের আগে বা পরে ৪ পৃষ্ঠা করে তেলাওয়াত করা। আবার কেউ চাইলে প্রতিদিন ২৫ পৃষ্ঠা পড়ে দ্রুতও শেষ করতে পারেন। তবে লক্ষ্য নির্ধারণের সময় নিজের সামর্থ্য ও জীবনযাত্রার দিকে খেয়াল রাখা জরুরি।
প্রত্যেক কাজের মূল্য নির্ধারিত হয় নিয়তের ওপর ভিত্তি করে। তাই রমজানে কোরআন খতমের জন্য আন্তরিক নিয়ত করা গুরুত্বপূর্ণ। যতটা সম্ভব বড় লক্ষ্য স্থির করুন এবং তা পূরণের চেষ্টা করুন।
আপনি লক্ষ্য পূরণ করতে পারেন বা না-ও পারেন—আল্লাহ আপনার নিয়ত ও প্রচেষ্টার জন্য অবশ্যই সওয়াব দান করবেন।
নিয়ত করার পর তাতে অটল থাকা জরুরি। রমজানের প্রথম কয়েক দিনে একটু বেশি পড়ে রাখলে পরে কোনো দিন কম পড়লেও তা পূরণ করা সহজ হয়।
সরাসরি কোরআন মাজিদ বা হার্ডকপি থেকে পড়লে মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয়। এতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নোটিফিকেশন বা মোবাইলের অন্য বিভ্রান্তি থেকে দূরে থাকা যায়।
অনেকে ভাবেন—“আগামীকাল থেকে শুরু করব।” এভাবে সময় কেটে গেলে অলসতা এসে পড়ে এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে যায়। তাই আগামীকালের জন্য ফেলে না রেখে এখন থেকেই শুরু করুন। অলসতা কাটিয়ে উঠতে আল্লাহর কাছে দোয়া করা জরুরি।
মহানবী (সা.) অলসতা দূর করার জন্য একটি দোয়া শিখিয়েছেন, “আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজু বিকা মিনাল কাসালি, ওয়াল হারামি, ওয়াল জুবনি, ওয়াল বুখলি, ওয়া ফিতনাতিদ দাজ্জালি, ওয়া আজাবিল কবর।”
অর্থ: “হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে অলসতা, বার্ধক্য, কাপুরুষতা, কৃপণতা, দাজ্জালের ফিতনা এবং কবরের আজাব থেকে আশ্রয় চাই।” (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৫৪৫৭)
সরাসরি কোরআন মাজিদ বা হার্ডকপি থেকে পড়লে মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয়। এতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নোটিফিকেশন বা মোবাইলের অন্য বিভ্রান্তি থেকে দূরে থাকা যায়। হার্ডকপি থেকে পড়লে নিজের অগ্রগতি সহজে বোঝা যায় এবং লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে কি না, তা স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
রমজান শুরু হলে বন্ধু বা পরিবারের কোনো সদস্যের সঙ্গে কোরআন তেলাওয়াত শুরু করা যেতে পারে। প্রতিদিন শেষে একে অপরকে জানানো যায়—কে কতটুকু পড়েছে। এতে একে অপরকে উৎসাহ দেওয়া যায় এবং নিয়মিততা বজায় রাখা সহজ হয়।
বন্ধুদের সঙ্গে মসজিদে বসে একসঙ্গে কোরআন পড়াও একটি কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে।
শুধু দেখে দেখে পড়া নয়, কোরআনের অর্থ ও শিক্ষা বোঝার চেষ্টা করা উচিত। এতে কোরআনের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক আরও গভীর হয়। এ জন্য কোরআনের অনুবাদ পড়া, কোনো একটি সূরার তাফসির জানা বা মুখস্থ আয়াতগুলো বারবার পড়ার অভ্যাস করা যেতে পারে।
আমাদের দেশে তারাবিতে পুরো মাসে একবার কোরআন খতম করা হয়। আপনি যদি দিনে কোরআন পড়েন এবং রাতে তারাবিতে তা শোনেন, তবে এটি কোরআন খতমে অনেক সাহায্য করবে। এতে একদিকে পড়ে এক খতম এবং শুনে আরেক খতমের সওয়াব পাওয়া যাবে।
যদি রমজানে কোরআন খতম করা সম্ভব না হয়, তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। রমজানের পরও নিয়মিত তেলাওয়াত চালু রাখুন।
আজকের যুগে প্রযুক্তি আমাদের ধর্মীয় জীবনেরও একটি সহায়ক মাধ্যম। বিভিন্ন কোরআনের কিছু কার্যকর অ্যাপ আছে, অ্যাপের মাধ্যমে ব্যস্ত জীবনে যাত্রাপথেও কোরআন পাঠ করা সহজ হয়।
যাতায়াতের সময় তেলাওয়াত শোনা বা অবসর সময়ে অনুবাদ দেখে অর্থ বোঝার ক্ষেত্রে স্মার্টফোন দারুণ কার্যকর হতে পারে।
রমজান জার্নাল রাখা কোরআন খতমের একটি কার্যকর পদ্ধতি। প্রতিদিন কত পৃষ্ঠা বা কত পারা পড়েছেন, তা ডায়েরিতে লিখে রাখুন। এতে আপনি প্রতিদিন, প্রতি সপ্তাহে এবং মাস শেষে নিজের অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে পারবেন।
যদি রমজানে কোরআন খতম করা সম্ভব না হয়, তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। রমজানের পরও নিয়মিত তেলাওয়াত চালু রাখুন।
প্রতিদিন কোরআন পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠলে পরবর্তী রমজানে লক্ষ্য পূরণ করা সহজ হবে। মাসের শেষে যদি নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ না হয়, তবে হতাশ না হয়ে নতুন করে শুরু করুন এবং নিয়তকে আবার দৃঢ় করুন।
যুবাইর ইসহাক : আলেম ও লেখক