
কোরবানি ইসলামের একটি মহান ইবাদত, যা মুসলিম উম্মাহর তাওহিদ, আনুগত্য ও আত্মত্যাগের প্রতীক। এটি কেবল পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এর মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং নিজের ভেতরের অহংকার, লোভ ও দুনিয়ামোহকে কুরবানী করা।
আল্লাহ-তাআলা বলেন, “আল্লাহর কাছে কোরবানির গোশত বা রক্ত পৌঁছায় না, বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।” (সুরা হজ, আয়াত: ৩৭)
সম্প্রতি এই মহান ইবাদতের সঙ্গে নতুন একটি ব্যাপার যুক্ত হয়েছে—সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ আলোচিত হতে দেখা গেছে কোরবানির পশুর বিভিন্ন নাম। বিষয়টি ইসলামী দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
পশুর নামকরণ যেহেতু কোরআন ও হাদিসে কোথাও নিষেধ করা হয়নি, সুতরাং এটি বৈধ।
ইসলামে পশু বা কোরবানির পশুর নাম রাখা জায়েজ। মহানবী (সা.) নিজেও তাঁর বাহন ও পশুর নাম রেখেছেন; যেমন তাঁর উট “আল-কাসওয়া” ও “আল-আদবা” এবং তাঁর বাহনের নাম ছিল “দুলদুল”। (ইমাম ইবনুল কাইয়িম, জাদুল মাআদ, ১/১৩১-১৩৪, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৯৮)
এ থেকে বোঝা যায়, পরিচয়, ভালোবাসা ও যত্নের প্রকাশের জন্য পশুর নাম রাখা বৈধ। রাসুল (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ যা হালাল করেছেন তা হালাল, আর যা হারাম করেছেন তা হারাম, আর যেসব বিষয়ে তিনি নীরব থেকেছেন তা ক্ষমাযোগ্য; সুতরাং তোমরা আল্লাহর এই অনুগ্রহ গ্রহণ কর।” (মুসতাদরাক হাকেম, হাদিস: ৩৪১৯)
এই হাদিসের আলোকে বলা যায়, পশুর নামকরণ যেহেতু কোরআন ও হাদিসে কোথাও নিষেধ করা হয়নি, সুতরাং এটি বৈধ। ফিক্হ বিশারদগণ একটি মূলনীতি উদ্ভাবন করেছেন, “শরিয়তে নিষিদ্ধ হবার দলিল না থাকলে প্রতিটি বস্তুর আসল হলো বৈধতা।” (ইমাম শাতেবি, আল-মুয়াফাকাত, ১/৪৪১, দারু ইবনিল আফ্ফান, সৌদি আরব, ১৯৯৭)
তবে নামকরণ অবশ্যই শরিয়তের সীমার মধ্যে হতে হবে।
ইসলামের দৃষ্টিতে পশুর নামকরণে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো অবশ্যই বিবেচ্য:
শিরক ও কুফর থেকে মুক্ত থাকা: কোনো নাম যেন আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত বা অসংগত বিশ্বাসকে নির্দেশ না করে।
অশালীন বা বিদ্রূপমূলক নাম না হওয়া: নাম যেন গালি, অপমান বা কটূক্তির প্রতীক না হয়।
মানুষের সম্মানহানি না করা: কাউকে ছোট করা, উপহাস করা বা ঘৃণা ছড়ানোর উদ্দেশ্যে নাম ব্যবহার করা ইসলামে অনুচিত।
কোরবানি একটি ইবাদত—একে ঠাট্টা-মশকরা, বিনোদন বা বিদ্বেষ প্রকাশের মাধ্যম বানানো ঠিক নয়। আল্লাহ-তাআলা বলেন, “আর যে আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে সম্মান করে তবে তা হৃদয়ের তাকওয়া থেকেই হয়।” (সুরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৩২)
এ জাতীয় নামকরণের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ইসলামের সম্মানিত ব্যক্তি বা স্থানের নামে বিদ্রূপ করার সুযোগ করে দেওয়া হতে পারে।
বর্তমানে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নাম যুক্ত করে কোরবানির পশুর নাম রাখা হচ্ছে। উদ্দেশ্য যদি হয় কেবলই পশুর পরিচয় প্রদান, তবে তা শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ হলেও এ ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বিবেচ্য:
১. রাজনৈতিক ব্যঙ্গের সম্ভাবনা: এই নামগুলো অনেক সময় হাস্যরস বা রাজনৈতিক ব্যঙ্গ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা কোরবানির পবিত্রতা ও গাম্ভীর্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
২. বিদ্বেষ বা ঘৃণা প্রকাশের সম্ভাবনা: যদি উদ্দেশ্য হয় কোনো ব্যক্তিকে হেয় করা, তবে তা কোরবানির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের সঙ্গে যুক্ত করা উচিত নয়।
৩. ইসলামের অবমাননার পথ প্রশস্ত করা: এ জাতীয় নামকরণের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ইসলামের সম্মানিত ব্যক্তি বা স্থানের নামে বিদ্রূপ করার সুযোগ করে দেওয়া হতে পারে। আল্লাহ-তাআলা বলেন, “তারা আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে ডাকে তাদেরকে তোমরা গালি দিও না; তাহলে তারাও অজ্ঞতাবশত সীমালংঘন করে আল্লাহকে গালি দেবে।” (সুরা আনআম, আয়াত: ১০৮)
এই আয়াতে আল্লাহ-তাআলাকে যেন কেউ অশিষ্ট গালমন্দ করতে না পারে, সেই পথ বন্ধ করতে অমুসলিমদের উপাস্যকে গালি দিতে নিষেধ করা হয়েছে। এই শিক্ষাটি কোরবানির পশুর নামকরণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
ইবাদতের মর্যাদা ও পবিত্রতা অক্ষুণ্ণ রাখতে এ জাতীয় নামকরণ এড়িয়ে চলা নৈতিক ও ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে অধিক উত্তম।
পরিশেষে বলা যায়, পশুকে বিশেষ কোনো নাম দেওয়া বা কোনো মানুষের নামে নামকরণ একমাত্র পরিচয় প্রদানের উদ্দেশ্যে বৈধ। তবে এতে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, এই নামকরণের মধ্যে যেন কাউকে তিরস্কার করা না হয়, শির্কের ইঙ্গিত না থাকে অথবা মুসলমানদের সম্মানিত ব্যক্তি ও স্থানের প্রতি বিদ্রূপের সম্ভাবনা তৈরি না হয়।
কোরবানি একটি পবিত্র ইবাদত, যাতে প্রদর্শনী বা প্রচারণার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অন্তরের তাকওয়া ও নিয়তের বিশুদ্ধতা। তাই ইবাদতের মর্যাদা ও পবিত্রতা অক্ষুণ্ণ রাখতে এ জাতীয় নামকরণ এড়িয়ে চলা নৈতিক ও ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে অধিক উত্তম।
শাব্বির খান আযহারী: শিক্ষক, লেখক ও মিডিয়া আলোচক