নবীজি (সা.) তখনো মাতৃগর্ভে। একদিন স্বপ্নে তাঁর মা আমেনাকে শুভসংবাদ দিয়ে বলা হলো, ‘আপনি এ উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতাকে গর্ভে ধারণ করেছেন। তিনি যখন ভূমিষ্ঠ হবেন, তখন তাঁর নাম রাখবেন মুহাম্মদ।’ (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/৫৮, দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত)
জন্মের পর পিতামহ আবদুল মুত্তালিব নবজাতককে কাবা চত্বরে নিয়ে আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং তাঁর নাম রাখেন ‘মুহাম্মদ’, যার অর্থ চিরপ্রশংসিত।
মুহাম্মদ ছাড়াও নবীজির একাধিক নাম ও গুণবাচক উপাধি রয়েছে। কোনো কোনো গবেষক তাঁর বহুসংখ্যক নামের তালিকা উল্লেখ করলেও পবিত্র কোরআন ও হাদিসে সুনির্দিষ্ট কিছু মৌলিক নামের সুস্পষ্ট বিবরণ পাওয়া যায়।
পবিত্র কোরআনে ‘মুহাম্মদ’ নামটি সুস্পষ্টভাবে ৪টি স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে:
সুরা আলে ইমরান : ‘আর মুহাম্মদ একজন রাসুল ছাড়া তো কিছু নন! তাঁর পূর্বে বহু রাসুল গত হয়েছেন...’ (আয়াত: ১৪৪)
সুরা আহজাব : ‘মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসুল এবং শেষ নবী।’ (আয়াত: ৪০)
সুরা মুহাম্মদ : ‘আর যারা ইমান এনেছে, সৎকর্ম করেছে এবং মুহাম্মদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তাতে বিশ্বাস স্থাপন করেছে... আল্লাহ তাদের পাপসমূহ মোচন করেছেন।’ (আয়াত: ২)
সুরা ফাতহ: ‘মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল; আর তাঁর সহচরগণ কাফিরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু...’ (আয়াত: ২৯)
‘আহমদ’ নামের উল্লেখ এসেছে ১টি স্থানে। সুরা সাফে নবী ইসার ঐতিহাসিক ভবিষ্যদ্বাণীর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে: ‘...এবং আমি এমন একজন রাসুলের সুসংবাদদাতা, যিনি আমার পরে আগমন করবেন, যাঁর নাম হবে আহমদ।’ (আয়াত: ৬)
ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘মুহাম্মদ’ ও ‘আহমদ’, উভয় নামই আরবি ‘হামদ’ মূলধাতু থেকে উৎপন্ন। আরবিতে কারও উপকার বা উপঢৌকনের বিনিময়ে যে কৃতজ্ঞতা জানানো হয়, তাকে বলা হয় ‘শুকর’।
কিন্তু ‘হামদ’ হলো কোনো শর্ত বা প্রতিদানের প্রত্যাশা ছাড়াই কারও অন্তর্গত সৌন্দর্য, নিখুঁত গুণাবলি ও শ্রেষ্ঠত্বের কারণে নিঃস্বার্থভাবে করা সর্বোচ্চ প্রশংসা।
একই মূলশব্দ থেকে এলেও নাম দুটির অর্থের গভীরতায় সূক্ষ্ম পার্থক্য বিদ্যমান:
মুহাম্মদ: ব্যাকরণগতভাবে এটি কর্মবাচক বিশেষ্য (ইসমে মাফউল)। এর অর্থ, যাঁর প্রশংসা বারবার, ক্রমাগত ও বিপুল পরিমাণে করা হয়। এটি মূলত প্রশংসার সংখ্যার প্রাচুর্যকে নির্দেশ করে। সৃষ্টির শুরু থেকে অনন্তকাল পর্যন্ত কোটি কোটি মানুষ ও ফেরেশতাকুল আজান, সালাত ও দরুদের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্নভাবে তাঁর প্রশংসা করছে।
আহমদ: এটি আধিক্যবাচক বিশেষ্য (ইসমে তাফদিল)। এর অর্থ, যিনি আল্লাহর সর্বাধিক ও সর্বোত্তম প্রশংসা করেন এবং যাঁর প্রশংসার গুণগত মান সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে সর্বোচ্চ।
রাসুল (সা.) নিজেই তাঁর কয়েকটি সুনির্দিষ্ট নামের তাৎপর্য তুলে ধরেছেন। বলেছেন, ‘আমার কয়েকটি নাম রয়েছে—আমি মুহাম্মদ, আমি আহমদ, আমি আল-মাহী, আমি আল-হাশির এবং আমি আল-আকিব।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৮৯৬)
আল-মাহী: অর্থ অন্ধকার দূরকারী। তাঁর আগমনের মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা শিরক ও জাহেলিয়াতের ঘোর অন্ধকার দূরীভূত হয়ে তাওহিদের আলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
আল-হাশির : অর্থ একত্রকারী। কেয়ামতের দিন সমগ্র মানবজাতি তাঁর পদপ্রান্তে বা তাঁর অনুসারী হয়ে হাশরের ময়দানে জমায়েত হবে এবং তাঁর শাফায়াতের মাধ্যমেই হিসাব-নিকাশ শুরু হবে।
আল-আকিব: অর্থ সর্বশেষ আগমনকারী। তাঁর আগমনের মধ্য দিয়ে নবুয়তের দীর্ঘ ধারার চিরসমাপ্তি (খতমে নবুয়ত) ঘটেছে।
আবু মুসা আশআরি (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল আমাদের কাছে তাঁর নাম উল্লেখ করে বলতেন, ‘আমি মুহাম্মদ, আহমদ, আল-মুকাফফা (পূর্ববর্তী নবীদের পদাঙ্ক অনুসরণকারী ও তাঁদের ধারার সমাপ্তকারী), নাবিয়্যুত তাওবাহ (তওবার নবী), নাবিয়্যুর রাহমাহ (রহমতের নবী) এবং নাবিয়্যুল মালাহিম (অন্যায় ও মিথ্যার বিরুদ্ধে সংগ্রামের নবী)।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৩৫৫)।
তিনি সেই তওবার নবী, যাঁর সুন্নাহ অনুসরণের মাধ্যমেই মানুষ আল্লাহর ক্ষমা লাভ করে। তিনি সেই রাহমাতুল্লিল আলামিন, যাঁর অপার মায়া ও ক্ষমা শত্রুদেরও ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে টেনে এনেছিল।
নবীজির পবিত্র নাম ও উপাধিগুলো শুধু কোনো ডাকনাম নয়; এগুলো তাঁর আলোকিত চরিত্র, আসমানি মিশন ও বিশ্বমানবতার প্রতি তাঁর অনন্য অবদানের এক চিরভাস্বর রূপরেখা।