ইসলামে জীবিকার মূল মালিক আল্লাহ এবং মানুষ শুধু সেই সম্পদের তত্ত্বাবধায়ক বা আমানতদার। দারিদ্র্য ও ক্ষুধা প্রতিরোধে ইসলাম সামাজিক সংহতিকে অন্যতম প্রধান কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছে।
জাকাতকে করা হয়েছে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি, যার সুরক্ষায় প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.) রাষ্ট্রদ্রোহের সমতুল্য কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
সমাজের অভাবগ্রস্তদের ক্ষুধা নিবারণ ও পারস্পরিক সংহতি রক্ষায় কোরআন ও সহিহ হাদিসের ১০টি দিকনির্দেশনা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
ইসলামি দর্শনে ধনসম্পদের ওপর মানুষের নিরঙ্কুশ বা স্বেচ্ছাচারী মালিকানা নেই। মানুষ শুধু আল্লাহর অর্পিত সম্পদের জিম্মাদার।
কোরআনে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, “তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনো এবং আল্লাহ তোমাদের যে সম্পদের আমানতদার বা প্রতিনিধি বানিয়েছেন, তা থেকে ব্যয় করো। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা ইমান এনেছে ও ব্যয় করেছে, তাদের জন্য রয়েছে মহা পুরস্কার।” (সুরা হাদিদ, আয়াত: ৭)
এই সত্য উপলব্ধি করলে মানুষের ভেতর কৃপণতা দূর হয় এবং অন্যের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া সহজ হয়ে যায়।
যখন তাদের বলা হয়, আল্লাহ তোমাদের যে জীবিকা দিয়েছেন তা থেকে ব্যয় করো, তখন কাফেররা মুমিনদের বলে—আমরা কি এমন কাউকে খাওয়াব, যাকে আল্লাহ ইচ্ছা করলে নিজেই খাওয়াতে পারতেন?সুরা ইয়াসিন, আয়াত: ৪৭
সমাজের সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখা এবং তা আর্তমানবতার কল্যাণে ব্যয় না করাকে ইসলামে চরম অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে।
কোরআনে বলা হয়েছে, “এবং যারা সোনা ও রুপা জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে না, তাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও।” (সুরা তাওবা, আয়াত: ৩৪)
সম্পদের প্রবাহ রুদ্ধ হয়ে গুটি কয়েক মানুষের হাতে বন্দি থাকলেই সমাজে তীব্র ক্ষুধা ও কৃত্রিম দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়।
অনেক স্বার্থপর মানুষ যুক্তি দেখায়—‘আল্লাহ যাকে দরিদ্র বানিয়েছেন, তাকে আমরা কেন খাওয়াব?’
কোরআন এই ধরনের মানসিকতাকে কাফেরদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে, “যখন তাদের বলা হয়, আল্লাহ তোমাদের যে জীবিকা দিয়েছেন তা থেকে ব্যয় করো, তখন কাফেররা মুমিনদের বলে—আমরা কি এমন কাউকে খাওয়াব, যাকে আল্লাহ ইচ্ছা করলে নিজেই খাওয়াতে পারতেন? তোমরা তো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছ।” (সুরা ইয়াসিন, আয়াত: ৪৭)
অভাবীর ক্ষুধা নিবারণ করা বিত্তবানের জন্য আল্লাহর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার অন্যতম মাপকাঠি।
কোনো অঞ্চলে একজন মানুষও যদি অনাহারে থাকে, তবে তার আশপাশের সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের ইমানি দায়বদ্ধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
সামাজিক ভ্রাতৃত্বের এক চূড়ান্ত মানবিক মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছেন মুহাম্মদ (সা.)। তিনি বলেছেন, “সেই ব্যক্তি প্রকৃত মুমিন নয়, যে নিজে পেট পুরে খায় অথচ তার পাশেই তার প্রতিবেশী অভুক্ত থাকে।” (আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ১১২)।
কোনো অঞ্চলে একজন মানুষও যদি অনাহারে থাকে, তবে তার আশপাশের সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের ইমানি দায়বদ্ধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
সামাজিক অনুষ্ঠানে বৈষম্য দূর করতে ইসলাম কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, “সেই ভোজসভার খাবার সবচেয়ে নিকৃষ্ট, যেখানে শুধু ধনীদের আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং সমাজের দরিদ্র ও অভুক্তদের বাদ দেওয়া হয়...।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫১৭৭)
ভোজনোৎসবে সমাজের গরিব-মিসকিনদের সম্মানের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করাই হলো ইসলামি সংস্কৃতির আসল সৌন্দর্য।
সমাজের মানুষের প্রয়োজনে ব্যয় করলে সম্পদ কমে না, বরং বৃদ্ধি পায়। রাসুল (সা.) বলেছেন, “প্রতিদিন সকালে দুজন ফেরেশতা অবতরণ করেন। তাঁদের একজন দোয়া করে বলেন, ‘হে আল্লাহ, যে ব্যক্তি (মানুষের কল্যাণে) ব্যয় করে, আপনি তাকে এর উত্তম প্রতিদান দিন।’
আর অপর ফেরেশতা দোয়া করে বলেন, ‘হে আল্লাহ, যে ব্যক্তি সম্পদ আটকে রাখে বা কৃপণতা করে, আপনি তাকে ধ্বংস করে দিন’।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪৪২)
দানশীলতার ক্ষেত্রে পরিমাণের চেয়ে আন্তরিক সদিচ্ছাই মুখ্য। রাসুল (সা.) বলেছেন, “তোমরা দোজখের আগুন থেকে নিজেদের বাঁচাও, তা একটি খেজুরের অর্ধেক দান করার বিনিময়ে হলেও।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪১৭)
অর্থাৎ অতি সামান্য খাদ্য দিয়েও যদি কারো ক্ষুধা নিবারণ করা যায়, তবে তা মানুষের পরকালীন মুক্তির অন্যতম বড় উসিলা হতে পারে।
আর্তের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার সময় কোনো প্রকার যশ, খ্যাতি বা প্রতিদানের আশা করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
কোরআনে খাঁটি মুমিনদের গুণাবলি তুলে ধরে বলা হয়েছে, “তারা আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার কারণে মিসকিন, এতিম ও বন্দীদের খাবার দান করে। এবং তারা বলে—আমরা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তোমাদের আহার করাচ্ছি; আমরা তোমাদের কাছ থেকে কোনো প্রতিদান কিংবা ধন্যবাদও প্রত্যাশা করি না। আমরা আমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এক ভয়ংকর ও সংকটাপন্ন দিনের ভয় করি।” (সুরা ইনসান, আয়াত: ৮-১০)
তারা আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার কারণে মিসকিন, এতিম ও বন্দীদের খাবার দান করে। এবং তারা বলে—আমরা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তোমাদের আহার করাচ্ছি; আমরা তোমাদের কাছ থেকে কোনো প্রতিদান কিংবা ধন্যবাদও প্রত্যাশা করি না।সুরা ইনসান, আয়াত: ৮-১০
সংকটকালে খাদ্যের সুষম বণ্টন কীভাবে করতে হয়, তার অপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল সাহাবি আবু মুসা আশআরির গোত্র।
রাসুল (সা.) তাদের প্রশংসায় বলেছেন, “আশআরি গোত্রের লোকেরা যখন যুদ্ধে খাদ্যসংকটে পড়ত কিংবা মদিনায় তাদের পরিবারের খাবার কমে যেত, তখন তারা সবার কাছে অবশিষ্ট থাকা খাদ্য একটি চাদরে একত্র করত; অতঃপর তা একটি পাত্র দিয়ে মেপে সবার মাঝে সমানভাবে ভাগ করে নিত। সুতরাং তারা আমার দলের অন্তর্ভুক্ত, আর আমিও তাদের দলের অন্তর্ভুক্ত।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৮৬)
একবার ক্ষুধায় কাতর ব্যক্তি নবীজির দরবারে এসে খাবারের ফরিয়াদ করল। নবীজির ঘরে কোনো খাবার না থাকায় তিনি সাহাবিদের লক্ষ্য করে বললেন, “আজ রাতে কে এই মেহমানের মেহমানদারি করবে?” এক আনসারি সাহাবি (আবু তালহা রা.) তাঁকে নিজ ঘরে নিয়ে গেলেন। কিন্তু ঘরে শুধু সন্তানদের জন্য যৎসামান্য খাবার ছিল।
সাহাবি ও তাঁর স্ত্রী পরামর্শ করে সন্তানদের ঘুম পাড়িয়ে দিলেন এবং বাতি নেভানোর ভান করে মেহমানের সামনে খাবার তুলে দিলেন, যাতে মেহমান মনে করেন গৃহকর্তাও সঙ্গে খাচ্ছেন। নিজেরা সারারাত অনাহারে কাটালেন। সকালে নবীজি (সা.) মুচকি হেসে বললেন, “তোমাদের এই আচরণে আল্লাহ আনন্দিত হয়েছেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৭৯৮)
ঘটনার প্রেক্ষাপটেই কোরআনের আয়াত নাজিল হয়েছিল: “...এবং তারা অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের ওপর অন্যদের অগ্রাধিকার দেয়।” (সুরা হাশর, আয়াত: ৯)