সিরাত

নবীজি (সা.) যেভাবে ইতিকাফ করেছেন

ইসলামের ইবাদতব্যবস্থার অন্যতম গভীর ও আত্মশুদ্ধিমূলক অনুশীলন হলো ইতিকাফ। এটি এমন এক ইবাদত, যার মাধ্যমে বান্দা দুনিয়ার কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একান্তভাবে মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে আত্মনিবেদন করে।

হৃদয়ের শুদ্ধতা ও আল্লাহর পথে দৃঢ়তা নির্ভর করে তাঁর দিকে পূর্ণ মনোযোগী হওয়ার ওপর।

কিন্তু দুনিয়ার নানা ব্যস্ততা, প্রবৃত্তির আকর্ষণ ও অপ্রয়োজনীয় অভ্যাস হৃদয়কে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। হৃদয়কে সঠিক পথে ফেরানোর জন্য প্রয়োজন একাগ্রতা, আত্মসংসংযম ও আল্লাহমুখিতা। ইতিকাফ মূলত সেই আত্মিক সাধনারই এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

মানুষের হৃদয়কে বিক্ষিপ্ত করে দেয় এমন কিছু বিষয় রয়েছে—যেমন অতিরিক্ত খাওয়া-দাওয়া, মানুষের সঙ্গে অহেতুক মেলামেশা, অনর্থক কথাবার্তা ও অতিরিক্ত ঘুম। এসব অভ্যাস আত্মিক শক্তি কমিয়ে দেয়। ইসলাম এই সমস্যার সমাধান হিসেবে আত্মসংযমের বিভিন্ন অনুশীলন নির্ধারণ করেছে, যার মধ্যে রোজা অন্যতম। 

রোজা মানুষের খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করে দেহ ও মনের প্রবৃত্তিগুলোকে সংযত করে। এতে অন্তর পরিশুদ্ধ হয় এবং আল্লাহর স্মরণে নিবিষ্ট হওয়া সহজ হয়।

রোজার সঙ্গেই ইসলামে ইতিকাফের বিধান দেওয়া হয়েছে। ইতিকাফের মূল লক্ষ্য হলো হৃদয়কে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দেওয়া।

রোজার সঙ্গেই ইসলামে ইতিকাফের বিধান দেওয়া হয়েছে। ইতিকাফের মূল লক্ষ্য হলো হৃদয়কে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দেওয়া।

এ সময় মুমিন ব্যক্তি দুনিয়ার সামাজিক ব্যস্ততা থেকে দূরে সরে গিয়ে আল্লাহর স্মরণ, ইবাদত ও ধ্যানে নিজেকে নিমগ্ন রাখেন। তাঁর সমস্ত চিন্তা ও উদ্বেগের স্থানে তখন আল্লাহর ভালোবাসা স্থান করে নেয়। মানুষ তখন সৃষ্টি থেকে মুখ ফিরিয়ে স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে।

ইতিকাফের এই অবস্থা আল্লাহর সঙ্গে এক গভীর সম্পর্ক তৈরি করে। দুনিয়ার নানা সম্পর্কের ভিড়ে মানুষ প্রায়ই একাকিত্ব অনুভব করে, কিন্তু আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপিত হলে সে প্রকৃত প্রশান্তি লাভ করে।

এই আত্মিক সম্পর্ক কেবল ইহকালে নয়, কবরের নিঃসঙ্গ জগতেও মানুষের প্রকৃত সান্ত্বনা ও শান্তির কারণ হবে। তাই ইতিকাফ কেবল একটি ইবাদত নয়; এটি আত্মার এক গভীর প্রশিক্ষণ।

এই মহান উদ্দেশ্যের কারণেই রমজান মাসের শেষ দশকে ইতিকাফ করার বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রমজান মাস নিজেই রহমত ও আত্মশুদ্ধির মাস। এর শেষ দশক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই সময়ের মধ্যেই রয়েছে লাইলাতুল কদর—যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর জীবনের শেষ পর্যন্ত প্রতিবছর রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ পালন করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০২৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৭২)

হাদিসে উল্লেখ রয়েছে যে তিনি কখনো রোজা ছাড়া ইতিকাফ পালন করেননি। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে রোজা ছাড়া ইতিকাফ নেই। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৪৭৩)

কোরআনেও রোজা ও ইতিকাফের প্রসঙ্গ একসঙ্গে এসেছে। এই কারণে অধিকাংশ ইসলামি চিন্তাবিদ ও সালাফে সালেহিনের মতে, ইতিকাফের জন্য রোজা থাকা গুরুত্বপূর্ণ। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহও (রহ.) এই মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, “ইতিকাফের জন্য রোজা রাখা মোস্তাহাব (পছন্দনীয়) নাকি শর্ত (ওয়াজিব)—এই নিয়ে মতভেদ থাকলেও, প্রমাণের দিক থেকে অধিকতর শক্তিশালী মত হলো—রোজা ছাড়া ইতিকাফ নেই। কারণ আল্লাহ–তাআলা কোরআনে রোজা ও ইতিকাফকে একসঙ্গে উল্লেখ করেছেন।" (মাজমুউল ফাতাওয়া, ২৫/৩৩৩-৩৫০)

প্রমাণের দিক থেকে অধিকতর শক্তিশালী মত হলো—রোজা ছাড়া ইতিকাফ নেই। কারণ আল্লাহ–তাআলা কোরআনে রোজা ও ইতিকাফকে একসঙ্গে উল্লেখ করেছেন।
ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.)

ইতিকাফের মাধ্যমে মানুষের অনিয়ন্ত্রিত অভ্যাসগুলো নিয়ন্ত্রণে আসে। যেমন অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা থেকে বিরত থাকা। মানুষের জিহ্বা অনেক সময় এমন কথা বলে, যা দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য ক্ষতিকর। রাসুল (সা.) অনর্থক কথা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।

ইতিকাফের নির্জনতা মানুষের জিহ্বাকে সংযত রাখে। একইভাবে ইতিকাফের মাধ্যমে অতিরিক্ত ঘুমের প্রবণতাও কমে আসে। রাতের নীরবতায় কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদের মাধ্যমে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। এতে মানুষের দেহ ও আত্মা উভয়েরই উপকার হয় এবং জীবনে ভারসাম্য তৈরি হয়।

ইসলামি আধ্যাত্মিক সাধনায় মূলত চারটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়—খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ, মানুষের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা কমানো, অনর্থক কথা পরিহার করা এবং অতিরিক্ত ঘুম থেকে বিরত থাকা। যারা এই বিষয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে রাসুলুল্লাহর (সা.) সুন্নত অনুসরণ করেন, তাঁরাই প্রকৃত সাধক।

রাসুলুল্লাহর (সা.) ইতিকাফের জীবনধারা ছিল অত্যন্ত পরিমিত ও আধ্যাত্মিকতায় ভরপুর। সাধারণত তিনি রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন।

একবার রমজানে ইতিকাফ করতে না পারায় পরবর্তী মাস শাওয়ালের প্রথম দশকে তার কাজা আদায় করেছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০৪৪)

তিনি যখন ইতিকাফের নিয়ত করতেন, তখন ফজরের নামাজ আদায়ের পর মসজিদের ভেতরে একটি পর্দাঘেরা ছোট জায়গায় অবস্থান করতেন। সেখানে তিনি নিরিবিলি পরিবেশে আল্লাহর ইবাদতে নিমগ্ন থাকতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০৩৩)

একবার তাঁর নির্দেশে তাঁর স্ত্রীদের জন্য মসজিদের ভেতরে পৃথক পর্দাঘেরা স্থান প্রস্তুত করা হয়েছিল। কিন্তু পরে যখন তিনি দেখলেন যে অনেকগুলো জায়গা তৈরি হয়ে গেছে, তখন তিনি নিজের ইতিকাফ স্থগিত করে দেন। তিনি চাননি যে ইতিকাফ কোনো সামাজিক জটলার রূপ নিক। পরে তিনি শাওয়াল মাসে সেই ইতিকাফের কাজা আদায় করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০৩৩)

লাইলাতুল কদর অনুসন্ধানের জন্য তিনি একসময় রমজানের বিভিন্ন দশকে ইতিকাফ করেছিলেন। পরে যখন স্পষ্ট হয় যে লাইলাতুল কদর শেষ দশকেই রয়েছে, তখন থেকে তিনি মৃত্যুর আগে পর্যন্ত প্রতিবছর শেষ দশকে ইতিকাফ পালন করতেন। সাধারণত তিনি ১০ দিন ইতিকাফ করতেন, তবে ইন্তেকালের বছরে তিনি ২০ দিন ইতিকাফ করেছিলেন।

ইতিকাফের সময় তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হতেন না। কখনো মসজিদে থাকা অবস্থায় তিনি হজরত আয়েশার কক্ষের দিকে মাথা বাড়িয়ে দিতেন এবং আয়েশা (রা.) তাঁর চুলের পরিচর্যা করে দিতেন।

ইতিকাফের সময় তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হতেন না। কখনো মসজিদে থাকা অবস্থায় তিনি হজরত আয়েশার কক্ষের দিকে মাথা বাড়িয়ে দিতেন এবং আয়েশা (রা.) তাঁর চুলের পরিচর্যা করে দিতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০২৯)

স্ত্রীগণ রাতে দেখা করতে এলে প্রয়োজনীয় কথা শেষে তিনি তাঁদের এগিয়ে দিয়ে আসতেন। একবার সাফিয়া (রা.) তাঁর ইতিকাফের সময় দেখা করতে আসলেন... অতপর তিনি ফিরে যাওয়ার সময় নবীজি তাঁকে এগিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০৩৫)

তবে ইতিকাফ অবস্থায় তিনি সম্পূর্ণভাবে ইবাদতে মগ্ন থাকতেন এবং এমন কোনো আচরণ করতেন না যা ইতিকাফের উদ্দেশ্যের বাইরে। প্রাকৃতিক প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হলেও পথে কোনো অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখলে তিনি দাঁড়িয়ে আলাপ করতেন না, যাতে একাগ্রতা বজায় থাকে।

দুঃখজনকভাবে বর্তমানে অনেকে ইতিকাফের প্রকৃত উদ্দেশ্য ভুলে একে সামাজিক মিলনমেলার রূপ দেন। অনেকে ইতিকাফের স্থানকে আড্ডাখানা বা গল্পগুজবের জায়গায় পরিণত করেন। অথচ রাসুলুল্লাহর (সা.) ইতিকাফ ছিল সম্পূর্ণ নির্জন ও আল্লাহমুখী।

প্রকৃত ইতিকাফ হলো দুনিয়ার কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আল্লাহর সান্নিধ্যে নিজেকে সঁপে দেওয়া। রাসুলুল্লাহর (সা.) এই আদর্শ অনুসরণ করেই আমাদের ইতিকাফ পালন করা উচিত।

আহমাদ সাব্বির : আলেম ও লেখক