ইসলামে ‘ফিতনা’ শব্দটি একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে রয়েছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিপদ-মুসিবত, শাস্তি, বিভ্রান্তি ও মতবিরোধ। কোরআনে আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘মানুষ কি মনে করে, আমরা ঈমান এনেছি বললেই তাদেরকে পরীক্ষা না করে ছেড়ে দেওয়া হবে?’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ২)
ফিতনা শুধু কষ্ট বা বিপদ নয়, বরং ভালো অবস্থাও এক ধরনের পরীক্ষা হতে পারে। এর মাধ্যমে মানুষের ইমান, ধৈর্য ও সত্যনিষ্ঠা প্রকাশ পায়।
১. প্রবৃত্তির ফিতনা: যা মানুষের কামনা-বাসনা ও দুনিয়ার আকর্ষণের মাধ্যমে আসে। যেমন—নারী, সম্পদ ও ভোগ-বিলাসের মোহ।
২. সন্দেহের ফিতনা: যা বিভ্রান্তি, ভুল ব্যাখ্যা ও ভুল আকিদার মাধ্যমে আসে। যেমন—বিদআত ও ইসলামের বিকৃতি।
প্রবৃত্তির অনুসরণ: মানুষ যখন নিজের ইচ্ছাকে সত্যের উপরে বসায়, তখন তার বিবেক অন্ধ হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না, তাহলে তা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে।’ (সুরা সদ, আয়াত: ২৬)
ভারসাম্যহীনতা: ধর্মীয় ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কঠোরতা বা শিথিলতা—উভয় চরমপন্থাই বিভ্রান্তি জন্ম দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বাড়াবাড়ি করা থেকে সাবধান করেছেন। (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩০২৫)
অজ্ঞতা ও গুজব: ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই ছাড়া তথ্য ছড়ানো সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। আল্লাহ বলেন, ‘যদি কোনো ফাসিক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা যাচাই করে নাও।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ৬)
দুনিয়ার মোহ: অতিরিক্ত দুনিয়ামুখিতা মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। (সুরা আনফাল, আয়াত: ২৮)
ফিতনা ধীরে ধীরে মানুষের অন্তরকে কালো করে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ফিতনাগুলো মানুষের অন্তরের সামনে চাটাইয়ের কাঠির মতো একটার পর একটা সাজানো হয়। যে অন্তর তা গ্রহণ করে, তাতে একটি কালো দাগ পড়ে যায়। এক সময় অন্তরটি উল্টানো পাত্রের মতো হয়ে যায়, যা ভালোকে ভালো বা মন্দকে মন্দ মনে করে না। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৪)
১. আল্লাহর কাছে আশ্রয়: নামাজের শেষ বৈঠকে ‘জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা এবং দাজ্জালের ফিতনা’ থেকে আশ্রয়ের দোয়াটি পড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫৮৮)
২. কোরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা: সঠিক পথপ্রদর্শনের জন্য আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের সুন্নাহর বিকল্প নেই। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৬৭৬)
৩. সঠিক নেকসঙ্গ: মুসলিম জামাত ও আল্লাহভীরু আলেমদের সংস্পর্শে থাকা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা জামাতের সাথে ঐক্যবদ্ধ থাকো। কারণ, আল্লাহর সাহায্য জামাতের ওপর।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২১৬৫)
৪. ইবাদতে মশগুল থাকা: ফিতনার সময় বেশি বেশি তওবা ও নফল ইবাদত করা হিজরত করার সমতুল্য সওয়াব বয়ে আনে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৪৮)
৫. ধৈর্য ও হেকমত: নানা পরীক্ষা আসবেই, তবে ধৈর্য ও হেকমতের সঙ্গে তা মোকাবিলা করতে হবে।
পরিশেষে, একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো নিজের ইমান রক্ষা করা এবং সব ধরনের বিভ্রান্তি থেকে দূরে থাকা। সচেতনতা ও আল্লাহর ওপর ভরসাই পারে ফিতনার অন্ধকার থেকে আমাদের নিরাপদ রাখতে।
ইসমত আরা: শিক্ষক ও লেখক