বিধান

যে ৫ ধরনের প্রকল্পে জাকাতের অর্থ ব্যবহার বৈধ নয়

বর্তমান সময়ে জাকাতকে এক ধরনের সাধারণ ‘সমাজকল্যাণ তহবিল’ হিসেবে গণ্য করার একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অনেকেই মনে করেন, যেকোনো ভালো সামাজিক কাজ, অবকাঠামো উন্নয়ন বা দাতব্য প্রকল্পেই বুঝি জাকাতের টাকা ব্যবহার করা সম্ভব।

কিন্তু ইসলামে জাকাতের ব্যয়ের খাত সম্পূর্ণ সুনির্দিষ্ট ও নির্ধারিত। পবিত্র কোরআনে জাকাত ব্যয়ের আটটি প্রধান খাত স্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। (সুরা তওবা, আয়াত: ৬০)

জাকাত কোনো সাধারণ কর বা স্বেচ্ছা-দান নয় যে তা দিয়ে যেকোনো সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালনা করা যাবে।

সাহাবি মুআজ ইবনে জাবালকে ইয়ামেনে পাঠানোর সময় মহানবী (সা.) জাকাতের মূল লক্ষ্য স্পষ্ট করে নির্দেশ দিয়েছিলেন, “তুমি তাদের জানিয়ে দাও যে আল্লাহ তাদের ওপর জাকাত ফরজ করেছেন; যা তাদের ধনীদের কাছ থেকে গ্রহণ করা হবে এবং তাদের দরিদ্রদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩৯৫)

অতএব, জাকাতের অর্থের প্রথম ও মূল স্বত্বাধিকারী হলেন দরিদ্র ও নিঃস্ব মানুষ। যেসকল প্রকল্পে দরিদ্রদের সরাসরি অর্থনৈতিক অধিকার, মালিকানা বা মৌলিক প্রয়োজন অর্জিত হয় না, সেসব ক্ষেত্রে জাকাতের অর্থ ব্যবহার করা ইসলামি আইনশাস্ত্রে সম্পূর্ণ অনুচিত ও নাজায়েজ বলা হয়েছে।

এমন কিছু প্রকল্প ও খাত তুলে ধরা হলো:

আলেমদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো, মসজিদ নির্মাণ, সংস্কার বা আনুষঙ্গিক পরিচালন প্রকল্পে জাকাতের অর্থ ব্যবহার করা সঙ্গত নয়।

১. সাধারণ জনকল্যাণমূলক উন্নয়ন প্রকল্প

রাস্তাঘাট নির্মাণ, সেতু বা কালভার্ট তৈরি, সাধারণ পথচারীদের জন্য পানির ব্যবস্থা করা, সড়কবাতি বসানো, ড্রেনেজ সিস্টেম কিংবা সরকারি ও সামাজিক ভবনের উন্নয়ন—এজাতীয় সাধারণ অবকাঠামোগত প্রকল্পে জাকাতের অর্থ ব্যয় করা সম্পূর্ণ অনুচিত।

কারণ এসব উন্নয়নমূলক কাজের সুফল সমাজের ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই সমানভাবে ভোগ করে। এতে জাকাতের হকদার দরিদ্রের জন্য আলাদা কোনো অগ্রাধিকার বা মালিকানা তৈরি হয় না এবং সরাসরি তাদের অধিকার সংরক্ষিত হয় না। (আল-কাসানি, বাদায়িউস সানায়ি ফি তারতিবিশ শারায়ি, ২/৪৫, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত, ১৯৮৬)

২. ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ

প্রায়ই দেখা যায়, মসজিদ নির্মাণ, মিনারের সৌন্দর্যবর্ধন কিংবা মসজিদের এয়ার কন্ডিশনার ও দৈনন্দিন পরিচালনা খরচের জন্য জাকাতের ফান্ড থেকে অর্থ সংগ্রহ বা প্রদান করা হয়। আলেমদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো, মসজিদ নির্মাণ, সংস্কার বা আনুষঙ্গিক পরিচালন প্রকল্পে জাকাতের অর্থ ব্যবহার করা সঙ্গত নয়।

ইমাম নববি উল্লেখ করেছেন যে মসজিদ নির্মাণ, সেতু সংস্কার বা পাবলিক নদীবাঁধ তৈরির কাজে জাকাত প্রদান করা বৈধ নয়; কারণ এগুলো কোনো নির্দিষ্ট দরিদ্র মানুষের অধিকার বা মালিকানায় আসে না। (আন-নাববি, আল-মাজমু শারহুল মুহাজ্জাব, ৬/২২২২, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৬)

মসজিদ আল্লাহর ঘর এবং এটি সর্বসাধারণের ইবাদতের স্থান; ফলে জাকাতের মতো দরিদ্রদের নিজস্ব পাওনাকে এতে ব্যয় করলে দরিদ্রের হক নষ্ট হয়।

দরিদ্র মানুষকে সরাসরি মালিক বানিয়ে না দিলে বা তার নির্দিষ্ট অভাব পূরণ না হলে শুধু খাবারের প্রকল্প বা সাধারণ সেবামূলক আয়োজন পরিচালনা করে জাকাত আদায় হয় না।
ইবনে নুজাইম, বিখ্যাত হানাফি ফকিহ

৩. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশিক্ষণ প্রকল্প

শিক্ষা বিস্তার নিঃসন্দেহে একটি মহৎ কাজ। তবে সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ, সাধারণ স্কুলের ভবন তৈরি, সাধারণ কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, বিদেশি ভাষা শিক্ষার কোচিং কিংবা অসংজ্ঞায়িত কোনো পরামর্শমূলক প্রকল্প চালানোর ক্ষেত্রে সরাসরি জাকাতের অর্থ ব্যবহার করা অনুচিত।

জাকাত দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ভবন তোলা বা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক বেতন-ভাতা মেটানো সম্পূর্ণ নাজায়েজ।

তবে কোনো দরিদ্র শিক্ষার্থী যদি আর্থিক সংকটে থাকে, তবে তাকে জাকাত থেকে সরাসরি উপবৃত্তি বা টিউশন ফি বাবদ অর্থ প্রদান করা যাবে, যাতে সে নিজে তার প্রয়োজন মেটাতে পারে। কিন্তু ঢালাওভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা প্রশিক্ষণ প্রকল্পের তহবিলে জাকাত দেওয়া অনুচিত।

হানাফি ফকিহ ইবনে নুজাইম লিখেছেন, দরিদ্র মানুষকে সরাসরি মালিক বানিয়ে না দিলে বা তার নির্দিষ্ট অভাব পূরণ না হলে শুধু খাবারের প্রকল্প বা সাধারণ সেবামূলক আয়োজন পরিচালনা করে জাকাত আদায় হয় না। (ইবনে নুজাইম, আল-বাহরুর রায়েক শারহু কানযিদ দাকায়েক, ২/ ২৬০, দারুল কিতাবিল ইসলামি, কায়রো)

অনুরূপভাবে, বিধবা বা নিঃস্ব নারীকে সেলাই মেশিন বা ক্ষুদ্র ব্যবসার সরঞ্জাম কিনে দিয়ে স্বাবলম্বী করার প্রকল্প বৈধ। তবে সাধারণ মানসিক পরামর্শ বা অসংজ্ঞায়িত কোনো সেবামূলক কোর্সের নামে জাকাতের তহবিল খরচ করা শরিয়তসম্মত নয়; কারণ এগুলো দরিদ্রকে সরাসরি দারিদ্র্যমুক্ত করে না।

৪. দাফন–কাফন ও কবরস্থান উন্নয়ন

সমাজের কোনো মানুষের ইন্তেকাল হলে তার কাফন-দাফন অত্যন্ত সওয়াবের কাজ হলেও জাকাতের টাকা দিয়ে সাধারণ কবরস্থান ক্রয়, কবরস্থানের সীমানা প্রাচীর নির্মাণ কিংবা মৃত ব্যক্তির বকেয়া ঋণ পরিশোধ করা অনুচিত। কারণ মৃত ব্যক্তি জাকাতের সম্পদের মালিক হতে পারে না।

ফকিহগণ এ বিষয়ে একমত যে জাকাত হলো জীবিত অভাবগ্রস্ত মানুষের অধিকার। দাফনের ব্যবস্থা করা বা মৃতের ঋণ পরিশোধে সরাসরি জাকাত ফান্ড ব্যবহার করা যাবে না। (আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ, ২৩/৩৩০–৩৩১, ওয়াকফ ও ইসলাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, কুয়েত)

যেসকল প্রকল্পে দরিদ্রদের সরাসরি অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা অর্জিত হয় না, সেসব জায়গায় জাকাত ব্যবহার করলে জাকাত আদায় হবে না।

৫. বাণিজ্যিক বিনিয়োগ ও এনজিও প্রকল্প

অনেক সময় দেখা যায় বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা বা এনজিও জাকাত ফান্ড সংগ্রহ করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা বাণিজ্যিক প্রকল্পে বিনিয়োগ করে, অথবা তাদের নিজস্ব প্রশাসনিক খরচ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও অফিস ভাড়ার জন্য জাকাতের টাকা থেকে নির্দিষ্ট অংশ কেটে রাখে।

যদি তারা সরাসরি জাকাত সংগ্রাহক (যাঁদের কথা কোরআনে ‘আমিলিনা আলাইহা’ বলা হয়েছে) না হয়, তবে কোনো বেসরকারি সংস্থা বা ব্যক্তির জন্য জাকাত ফান্ড থেকে নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচালনা খরচ চালানো অনুচিত।

জাকাতের অর্থ দিয়ে এমন কোনো লাভজনক কর্পোরেশন বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রকল্প গড়ে তোলাও নাজায়েজ, যেখানে দরিদ্রদের শুধু পরোক্ষ সুবিধা দেওয়া হয় কিন্তু সরাসরি তাদের হাতে পুঁজি বা সচ্ছলতার মালিকানা হস্তান্তর করা হয় না।

যেসকল প্রকল্পে দরিদ্রদের সরাসরি অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা অর্জিত হয় না, সেসব জায়গায় জাকাত ব্যবহার করলে একদিকে যেমন জাকাত আদায় হবে না, অন্যদিকে সমাজের সবচেয়ে অসহায় মানুষগুলোও তাদের প্রাপ্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।