একসময় মানুষের বন্ধুত্ব টিকে থাকত মুখোমুখি দেখা-সাক্ষাৎ, একসঙ্গে সময় কাটানো এবং হৃদয়ের আন্তরিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে। আজ সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে একটি ছোট্ট যন্ত্র—মুঠোফোন। আমরা যেন ধীরে ধীরে মুঠোফোনের মুঠোয় বন্দী হয়ে পড়ছি।
এখন বন্ধুত্বের সূচনা হয় ফেসবুকের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট দিয়ে, পরিচয় গড়ে ওঠে মেসেঞ্জারের কথোপকথনে, আর সম্পর্কের গভীরতা মাপা হয় লাইক, কমেন্ট কিংবা রিঅ্যাকশনের মাধ্যমে।
আমরা প্রতিদিন বহু মানুষের সঙ্গে অনলাইনে যুক্ত থাকি, অথচ বাস্তব জীবনের অনেক মানুষ আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। একসময় যাদের সঙ্গে নিয়মিত দেখা না হলে বন্ধুত্বে ভাটা পড়ত, আজ তাদের সঙ্গে মাসের পর মাস দেখা না হলেও অনলাইনে দু-একটি ইমোজি বিনিময় করেই আমরা মনে করি সম্পর্ক ঠিক আছে।
সমাজের রীতিনীতি সময়ের সঙ্গে বদলায়। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা আমাদের এমন কিছু নীতিমালা দিয়েছে, যা যুগে যুগে প্রাসঙ্গিক।
একটু ভেবে দেখুন, কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে গেলে আজকাল কী দৃশ্য দেখা যায়? একই টেবিলে বসে থাকা কয়েকজন মানুষ নিজেদের মধ্যে কথা বলার পরিবর্তে মুঠোফোনের স্ক্রিনে চোখ গুঁজে থাকে। কেউ ছবি তুলছে, কেউ স্ট্যাটাস দিচ্ছে, কেউ আবার অনলাইনে অন্য কারও সঙ্গে চ্যাট করছে।
আমরা যখনই একটু ফাঁকা সময় পাই, তখনই ফোনের স্ক্রিনে ডুবে যাই। বাসে পাশে বসা যাত্রী, চুল কাটতে থাকা নাপিত, দোকানের বিক্রেতা কিংবা দাওয়াতের অন্য অতিথিদের সঙ্গে সামান্য সৌজন্যমূলক কথোপকথনের আগ্রহও আমাদের কমে গেছে।
আগে কারও সঙ্গে কথা বলার সময় ঘড়ি দেখাকে অনেকেই অসম্মানজনক মনে করত। কারণ, এতে বোঝা যেত যে আপনি হয়তো তার কথায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। অথচ আজ আমরা কারও সঙ্গে কথা বলার মাঝখানেই বারবার ফোন চেক করি, বুঝতেই পারি না, এতে সামনের মানুষটি কষ্ট পেতে পারেন।
সমাজের রীতিনীতি সময়ের সঙ্গে বদলায়। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা আমাদের এমন কিছু নীতিমালা দিয়েছে, যা যুগে যুগে প্রাসঙ্গিক।
মানবিক অনুভূতির প্রতি ইসলামের সংবেদনশীলতার একটি অনন্য উদাহরণ পাওয়া যায় একটি হাদিসে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যখন তিনজন লোক একত্র হবে, তখন একজনকে ফেলে বাকি দুজন গোপন আলাপে মেতে উঠবে না; বরং আরও মানুষের জন্য অপেক্ষা করো, যেন তৃতীয় ব্যক্তি কষ্ট না পায়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১৮৪)
যখন তিনজন লোক একত্র হবে, তখন একজনকে ফেলে বাকি দুজন গোপন আলাপে মেতে উঠবে নাসহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১৮৪
প্রায় চৌদ্দ শ বছর আগে বলা এই শিক্ষার মধ্যে আজকের ডিজিটাল যুগের জন্যও দিকনির্দেশনা রয়েছে। ধরুন, কয়েকজন বন্ধু একসঙ্গে বসে আছে। তাদের মধ্যে দুজন নিজেদের ফোনে মেসেজ আদান-প্রদান করছে, অথচ তৃতীয় ব্যক্তি কিছুই জানে না। সে স্বাভাবিকভাবেই নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে করতে পারে।
বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে, মহানবী (সা.) যখন কারও সঙ্গে কথা বলতেন, তখন সম্পূর্ণ শরীর তার দিকে ফিরিয়ে মনোযোগ দিয়ে কথা বলতেন। কাউকে সম্বোধন করলে কেবল ঘাড় ঘুরিয়ে নয়, বরং পুরো মুখমণ্ডল তার দিকে ফিরিয়ে দিতেন। (শামায়েলে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫১)
সম্মান শুধু কথায় নয়, মনোযোগেও প্রকাশ পায়। যখন আমরা কারও সঙ্গে কথা বলি, তখন তার দিকে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া উচিত। কথার মাঝখানে অন্যরা বারবার ফোনের স্ক্রিন দেখলে কথোপকথনের সৌন্দর্য নষ্ট হয় এবং সম্পর্কের বা উষ্ণতাও কমে যায়।
এ জন্য কিছু বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।
১. পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা বন্ধুদের আড্ডায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফোন দূরে রাখা যেতে পারে। অনেক জায়গায় দেখা যায়, কোনো অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে সবাই নিজেদের ফোন সাইলেন্ট করে আলাদা স্থানে রেখে দেয়। এতে উপস্থিত মানুষগুলো একে অপরের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়।
কথা বলার সময় ফোন থেকে দূরে থাকি। মানুষটি মুদিদোকানদার হোক কিংবা রিকশাচালক, শিক্ষক হোক কিংবা সহকর্মী—সকলেই সম্মান পাওয়ার যোগ্য।
২. পরিবারে ‘ফোন-মুক্ত সময়’ নির্ধারণ করাও কার্যকর হতে পারে। যেমন খাবার টেবিলে কেউ ফোন ব্যবহার করবে না, কিংবা প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসবে কোনো ডিভাইস ছাড়া।
৩. বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে রেস্তোরাঁয় গেলে মজার ছলে একটি নিয়ম করা যেতে পারে—যে সবার আগে ফোন হাতে নেবে, সে-ই বিল দেবে। এ ধরনের ছোট ছোট উদ্যোগ মানুষকে বাস্তব জগতে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমরা যেন মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় ফোন থেকে দূরে থাকি। মানুষটি মুদিদোকানদার হোক কিংবা রিকশাচালক, শিক্ষক হোক কিংবা সহকর্মী—সকলেই সম্মান পাওয়ার যোগ্য।
কয়েক মিনিটের জন্য ফোন সরিয়ে রেখে মনোযোগ দিয়ে কথা বলা শুধু ভদ্রতাই নয়, বরং একটি মানবিক গুণ।