পাথেয়

মাথার ভেতরে চিন্তার ঝড়: কোরআনের সমাধান কী

রাত তিনটা বাজে। সারা বাড়ি নিঝুম। ফ্যানের শব্দ ছাড়া কিছু নেই। কিন্তু আপনি শুয়ে আছেন চোখ মেলে। মাথার ভেতরে একটার পর একটা চিন্তা আসছে—কাল অফিসে বসের সামনে কী বলব? পরীক্ষায় কেমন করব? চাকরিটা থাকবে তো?

একটা চিন্তা শেষ হয় না, আরেকটা শুরু হয়। এই অবস্থার নাম ‘ওভারথিংকিং’। আজকের পৃথিবীতে লাখো মানুষ প্রতি রাতে এই যন্ত্রণায় ভোগে। কোরআন কি এই যন্ত্রণার কোনো সমাধান দিয়েছে? দিয়েছে। এবং সেটা বিজ্ঞানও এখন স্বীকার করছে।

বিজ্ঞান কী বলছে

গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সকে (Prefrontal Cortex) অকেজো করে দেয়। ফলে যত বেশি চিন্তা করেন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তত কমে যায়। শরীরে কর্টিসল হরমোন বেড়ে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়। (নোলেন-হোকসেমা, সুসান; উইস্কো, বি. ই. এবং লিউবোমিরস্কি, এস., পারসপেক্টিভস অন সাইকোলজিক্যাল সায়েন্স, ৩/৫, সেজ পাবলিকেশনস, ক্যালিফোর্নিয়া, ২০০৮)

অর্থাৎ বেশি চিন্তা করলে সমস্যার সমাধান হয় না, বরং সমস্যা আরও বাড়ে।

মুমিনের ব্যাপারটি বিস্ময়কর, তার প্রতিটি বিষয়ই কল্যাণকর।
সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৯৯

কোরআনের নির্দেশনা

আল্লাহ–তাআলা সুরা রাদে বলেন, ‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা রা’দ, আয়াত: ২৮)

এই আয়াতে তিনটি গভীর বার্তা আছে। প্রথমত, ‘আলা’ (জেনে রাখো)—এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নিশ্চিত ঘোষণা। দ্বিতীয়ত, ‘আল্লাহর স্মরণে’—এর অর্থ হলো মনে মনে অনুভব করা যে আমার সব বিষয়ের মালিক আল্লাহ। তিনি সামলাবেন। তৃতীয়ত, ‘প্রশান্তি’—এর অর্থ সম্পূর্ণ স্থির ও নিরাপদ বোধ করা।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের ব্যাপারটি বিস্ময়কর, তার প্রতিটি বিষয়ই কল্যাণকর।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৯৯)

আপনি যে বিষয়টি নিয়ে রাত তিনটায় জেগে কাঁদছেন, সেটাও আপনার জন্য কোনো না কোনোভাবে কল্যাণ বয়ে আনবে—যদি আপনি মুমিন হন।

কোরআনের শিক্ষা

১. তাওয়াক্কুল বা ভরসা: আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর যখন তুমি সংকল্প করবে, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯)

ইসলামের সূত্র সহজ—আপনার কাজ চেষ্টা করা, ফলাফল আল্লাহর হাতে। চেষ্টার পর ভরসা করতে না পারলে ওভারথিংকিং যাবে না।

২. দুশ্চিন্তার বদলে দোয়া: আল্লাহ বলেন, ‘আমি তো কাছেই আছি। যখনই কেউ ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৬)

চিন্তা করলে সমাধান আসে না, দোয়া করলে আসে। দুই ঘণ্টা মাথা ঘামালে যা হয় না, দুই মিনিট হাত তুলে কাঁদলে আসমান থেকে তার সমাধান আসতে পারে।

আমি তো কাছেই আছি। যখনই কেউ ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই।
কোরআন, ’সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৬

৩. অতীত ও ভবিষ্যতের ফাঁদ: আল্লাহ বলেন, ‘পৃথিবীতে বা তোমাদের নিজেদের ওপর যে কোনো বিপদ আসে, তা আমি সৃষ্টি করার আগেই একটি কিতাবে লেখা আছে।’ (সুরা হাদিদ, আয়াত: ২২)

যা হওয়ার তা আগেই লেখা আছে। আপনার কাজ সাধ্যমতো চেষ্টা করা এবং নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়া—পরের অধ্যায় আল্লাহ লিখে রেখেছেন।

৪. শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞতা: অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার বড় কারণ হলো যা নেই তা নিয়ে ভাবা। আল্লাহ বলেন, ‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বেশি দেব।’ (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৭)

আধুনিক গবেষণা বলছে, কৃতজ্ঞতার অভ্যাস মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ বাড়ায় এবং উদ্বেগ কমায়। (এমনস, রবার্ট এবং ম্যাককুলফ, মাইকেল, জার্নাল অব পারসোনালিটি অ্যান্ড সোশ্যাল সাইকোলজি, ৮৪/২, আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, ওয়াশিংটন ডিসি, ২০০৩)

আমরা কী করতে পারি

  • জিকির: ঘুমানোর আগে পড়ুন—‘হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকিল’ (আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট)।

  • লিখে ফেলা: চিন্তাকে কাগজে নামিয়ে আনলে মাথার ভার হালকা হয়।

  • আশ্রয় চাওয়া: ঘুমের আগে সুরা ফালাক ও সুরা নাস পড়ুন। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও রাতে এই দুটি সুরা দিয়ে আশ্রয় চাইতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০১৭)

  • কৃতজ্ঞতা: প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে তিনটি জিনিসের কথা ভাবুন যার জন্য আপনি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ।

রাত তিনটায় যখন ঘুম আসে না, মনে করুন এই মুহূর্তে আল্লাহ জেগে আছেন। আপনার চিন্তার বোঝা তিনি জানেন। সেই মুহূর্তে একটি আয়াত পড়ুন বা দোয়া করুন; দেখবেন মাথার ভেতরের ঝড় থামতে শুরু করেছে।

muhsin.du@gmail.com 

মুহাম্মাদ মুহসিন মাশকুর: খণ্ডকালীন শিক্ষক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়